ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ

আগের সংবাদ

ছাত্ররাজনীতি হঠাৎ উত্তপ্ত কেন > জাতীয় রাজনীতির ষড়যন্ত্রের অংশ : ক্ষমতাসীন দল > নির্বাচনের পথ পরিষ্কার করতেই এই হামলা : বিএনপি

পরের সংবাদ

‘ইভিএম’ রেখেই ভোটের ছক!

প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ২৬, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

এন রায় রাজা : বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন ইভিএমে (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) করার পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। এ কারণে ভোটের প্রস্তুতিতে ইভিএমকে গুরুত্ব দিচ্ছে নির্বাচন কমিশনও (ইসি)। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই গতকাল ইভিএম বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেছে ইসি। যদিও দেশের ৩০০ আসনে ইভিএমে ভোট করার মতো সক্ষমতা নেই বলে এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। আউয়াল কমিশন ইতোমধ্যে ছয়টি বৈঠক করেছে, সেখানে ইভিএমে ভোট করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে। আবার সরকার চাইলে ইভিএম কেনার জন্য নতুন প্রকল্প নিতে হবে বলেও জানিয়েছেন ইসির ইভিএম-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কর্মকর্তারা।
এদিকে আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন ইভিএমে করা সম্ভব কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সরকার প্রধান শেখ হাসিনার মন্তব্য ঘিরে। গত ৭ মে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, ইভিএমের মাধ্যমেই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন চায় আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ সব দলই অংশ নেবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। অবশ্য দলটির সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পরদিনই দলীয় প্রধানের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, ৩০০ আসনেই ইভিএমে ভোট চায় আওয়ামী লীগ। যদিও ভোট কীভাবে হবে, সে সিদ্ধান্ত নেবে ইসি। এরপরই রাজনৈতিক আলোচনায় ইভিএম নিয়ে ঝড় ওঠে। ইসিও তার অবস্থান তুলে ধরে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি দেখে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইভিএমে ভোট করার চিন্তা সামনে রেখেই ছক কষছে সরকার পক্ষ। সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসিও।
এদিকে ইভিএমে জাতীয় নির্বাচন করা সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছে বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তার শরিকরা। দীর্ঘদিন ধরে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি ছাড়াও বরাবরই ইভিএমের বিরোধিতা করে আসছে দলটি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখন থেকেই নানা ‘কলাকৌশল’ ও ‘ফন্দিফিকির’ শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম

আলমগীর। তিনি জানান, তারা বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন না। আর ইভিএমে ভোট কারচুপি হয় মন্তব্য করে ইভিএমে ভোটের প্রবল বিরোধিতা করেন তিনি। বিএনপি নেতারা বলেছেন, এটা আওয়ামী লীগের ‘নির্বাচনী কারচুপির নীল নকশা’।
এদিকে ইভিএমে সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ছিল বিগত ইসি কে এম নুরুল হুদার মুখ রক্ষার নির্বাচন। আর এ নির্বাচন খুবই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয় বলে সব দল, প্রার্থী ও পর্যবেক্ষকরা মেনেও নেন। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম তেমন ব্যবহার না হলেও স্থানীয় সরকারের সব সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব নির্বাচন নিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আসন্ন ১৫ জুন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমে ভোট নেয়া হবে।
এদিকে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে গতকাল বুধবার দেশের খ্যাতনামা প্রযুক্তিবিদ বা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় করে নির্বাচন কমিশন। সেখানে দেশের ৩০ জনের মত বিশেষজ্ঞ অংশ নিয়ে তাদের মতামত দেন। অধিকাংশই ইভিএমের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করে বলেন, আমাদের ইভিএম অত্যন্ত কার্যকর, এ মেশিনে ভোট কারচুপির কোনো সুযোগ নেই। যদিও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ইভিএমে ভোটের আগে মেশিন কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথাও বলেছেন।
সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, ইভিএমে কীভাবে ভোট নেয়া হবে, ব্যালটে কীভাবে হবে, কতটা ব্যালটে হবে, কতটা ইভিএমে হবে- এসব ব্যাপারে ইসি এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। সময় হলে সিদ্ধান্ত হবে। ভোট আমরা পরিচালনা করব, এটা আমাদের এখতিয়ার, পদ্ধতিও আমাদের এখতিয়ারভুক্ত। তবে গণমাধ্যমে বিভিন্ন দলের বক্তব্য আসছে। আওয়ামী লীগ সভাপতির বলা আর বিএনপি প্রধানের বলা, জাসদের কথা বলা- এটা ভিন্ন জিনিস। অনেকে তাদের ইচ্ছে ব্যক্ত করতে পারেন।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত একশর মতো আসনে ইভিএমে ভোট করার সক্ষমতা ইসির আছে। তবে ৩০০ আসনে ইভিএমে ভোট নেয়ার সামর্থ্য এখনো নেই। ৩০০ আসনের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
গতকাল বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার পর সিইসি আরো বলেন, আমরা কিন্তু কারো মতামতকে উপেক্ষা করিনি। বিরোধী দল থেকে যে মতামত এসেছে, আমরা তা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিইনি। আমরা অনেকগুলো বৈঠক করেছি। আজও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে বসেছি। যারা প্রযুক্তিবিদ, তাদের সঙ্গে বসেছি। এই মেশিনের (ইভিএম) ব্যাপারে তাদের বক্তব্যের পর কোনো কিছু বলতে চাচ্ছি না। আমি শুধু বলতে চাই, এই মেশিনের বিষয়ে আরো কয়েকটা বৈঠক করব। রাজনৈতিক দলগুলোকে এ মেশিনের কারিগরি দিকগুলো খতিয়ে দেখতে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন একজন ব্যক্তি পারবেন ইভিএম নিয়ে মূল্যায়ন করতে। আমরা সেই লক্ষ্য থেকেই কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ডেকেছি। রাজনৈতিক দলগুলোকেও আমরা অনুরোধ করব, তাদের যে টেকনিক্যাল টিম আছে কিংবা যদি থাকে, তাদের যাচাই করার জন্য।
বৈঠকের পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল ইভিএম মেশিনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এটি বেশ কার্যকরী ও চমৎকার মেশিন। এ মেশিনে ভোট কারচুপির কোনো সুযোগ নেই।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এম কায়কোবাদ বলেন, কোনো মেশিনকে শতভাগ বিশ্বাস করা যাবে না। তবে এখানে যেটা করা হয়েছে, এর প্রতিটি অংশ এমনভাবে কাস্টমাইজড করা হয়েছে, একজন ইচ্ছে করলেই সেটাকে পরিবর্তন করতে পারবেন না। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট দক্ষ এবং তারা যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এটা তৈরি করেছে, আমি নিশ্চিত হয়েছি। খুবই একটা ভালো মেশিন তৈরি করা হয়েছে। আমি আশা করি, এটা প্রদর্শন করা হবে এবং যে কেউ পরীক্ষা করতে পারবে।
এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান না দলীয়প্রধান হয়ে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের কথা বলেছেন এটা দেখতে হবে। কোনো দল ইভিএম চাইতেই পারে। অন্য দিকে বিএনপি ভোট কারচুপি হয় মন্তব্য করে ইভিএমে না করছে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে।
তিনি জানান, আগে ইসিকে মেশিন নিয়ে দলগুলোর আস্থা অর্জন করতে হবে, দলগুলো কী চাইছে তাও আমলে নিতে হবে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী বললেও ৩০০ আসনে ইভিএমে ভোট করতে গেলে যে পরিমাণ মেশিন লাগে, আমার জানা মতে ততটা মেশিন ইসির হাতে নেই। তাছাড়া ইভিএমের সঙ্গে আরো একটি মেশিন লাগে, সেটিও প্রস্তুত করতে হবে। প্রশিক্ষিত লোকবলও দরকার। এত দ্রুত এত লোককে প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হবে না। তাছাড়া ইভিএমে অনেক সময় আঙুলের ছাপ মেলে না। এটির জন্য অত্যাধুনিক মেশিন দরকার। এটা ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জও বটে।
আরেক সাবেক ইসি মো. শাহনেওয়াজ মনে করেন, সব দল- বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলগুলো ইভিএমে একমত হবে কিনা, সেটাও ইসির দেখার বিষয়। দলগুলোর মতামত নিতে হবে, তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। তাছাড়া জাতীয় নির্বাচনে সব আসনে ভোট করার মতো মেশিন তো ইসির হাতে নেই বলে জানি। তবে ইভিএম কেনা হলেও লোকবলকে প্রশিক্ষণ দিয়ে চালানোর মতো দক্ষ করে তুলতে হবে। এটা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন সাবেক এ কমিশনার।
এ বিষয়ে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সভায় প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে ইভিএমে। তবে কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে, সেই আলোচনা ওই সভায় কতটা প্রাসঙ্গিক সে বিষয়ে মতভেদ আছে। নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব মূলত নির্বাচন কমিশনের। তিনি বলেন, নিরক্ষরতার জন্য আমাদের দেশে এখনো প্রার্থীর নামের পাশে প্রতীক ব্যবহার করতে হয়। এমন বাস্তবতায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট নেয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে।
এদিকে নতুন কমিশনের আহূত সংলাপে বিশিষ্টজনরাও ইভিএমের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। সংলাপের সময় অনেকেই দাবি করেন ইভিএম দিয়ে কারচুপি করা যাবে না- এটি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়