মোটরসাইকেল ধাক্কায় রমনায় নারী নিহত

আগের সংবাদ

উল্লাপাড়ার শুঁটকি মাছে সমৃদ্ধ হবে রাজস্ব খাত

পরের সংবাদ

ই-কমার্স গ্রাহকের টাকার কী হবে

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৪, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ৪, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

** লাখ লাখ গ্রাহক বিপাকে ** দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মার্চেন্ট গ্রহীতারা ** টাকা ফেরতে কাজ করছে সরকার **
মরিয়ম সেঁজুতি : চটকদার মূল্যছাড়ের অফারে ই-কমার্সভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আগাম অর্থ পরিশোধ করে এখন আহাজারি করছেন লাখ লাখ গ্রাহক। যেসব মার্চেন্ট পণ্য ডেলিভারি দিয়েছেন, অর্থ পাওয়ার জন্য তারাও এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। সর্বশেষ এ তালিকায় যোগ হয়েছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলেশা মার্ট। গত বুধবার রাত থেকে নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত দেখিয়ে অফিশিয়াল সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে আলেশা মার্ট। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোম্পানির কোনো কর্মকর্তাকে। এর আগে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকাসহ অন্তত এক ডজন প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নিয়েছে গ্রাহকের শত শত কোটি টাকা। লাখ লাখ নিঃস্ব গ্রাহক টাকা ফেরত পাওয়ার ধরনা দিতে দিতে এখন ক্লান্ত। টাকা ফেরতে সরকার ব্যবস্থা নেবে, সেই আশায় রয়েছেন তারা। অনেকেই আবার পণ্য কিংবা অর্থ ফেরত পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আরো আগেই ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ ছিল। এক বছর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্ত কমিটি করলেও অদৃশ্য চাপে থেমে যায় তদন্ত। ফলে নির্দেশনা আসতেও সময় লেগেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর লোপাট করা অর্থের ভাগ পেয়েছে অনেক নীতিনির্ধারক ও ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ইউনিপে টু’র ক্ষেত্রে এমন একটা রায় হয়েছিল। তবে তাতে কেউ টাকা পেয়েছে কিনা জানা নেই। বিতর্কিত এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরো বেশি সতর্ক থাকা দরকার ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে শুধু ভোক্তারা আছেন, তা নয় কিছু ব্যবসায়ীও আছেন। যারা পণ্য কিনে আবার বিক্রি করেছেন। ইনভেস্ট করেছেন বলা যায়। সবার উচিত ছিল বুঝেশুনে কাজটি করা। কিছু আইনগত সীমাবদ্ধতাও ছিল। এখন সরকার কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।
এদিকে ই-কমার্সের প্রতারিত গ্রাহকদের টাকা তিন উপায়ে ফেরত দেয়ার কথা ভাবছে সরকার। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার একটি বৈঠক করেছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকে জমা টাকা ছাড় করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি। যেসব ই-কমার্স কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা নেই, এস্ক্রো সেবা চালুর পর ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়েতে তাদের গ্রাহকদের আটকে পড়া টাকা আগে ফেরত দেয়া হবে। আর যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, তাদের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে টাকা ফেরত দেয়া হবে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আলেশা মার্টের একটি ক্যাম্পেইনে গত জুলাই মাসে আর১৫ ইয়ামাহা মোটরসাইকেল ও গিফট কার্ড অর্ডার করেছিলেন কমলাপুরের বাসিন্দা আসাদুর রহমান ও তার বন্ধুরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ই-কমার্স নীতিমালা জারির পর তিনি আশা করেছিলেন, আলেশা মার্ট নিয়ম মেনে যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ করবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি পড়ে। এখনো পাননি পণ্য কিংবা টাকা বুঝে তিনি। গত এক মাসে অসংখ্যবার আলেশা মার্টের বনানীর প্রধান কার্যালয় ও তেজগাঁওয়ের নাসরিন টাওয়ারের অফিস গিয়ে ধরনা দিয়েও পণ্য কিংবা অর্থ ফেরত পাননি।
১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা আটকে থাকা আসাদুর রহমান জানান, গত নভেম্বরে একটি চেক দেয়া হয়েছে। এতে ৬ জানুয়ারি ব্যাংকে চেক জমা দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এর আগেই আলেশা মার্টের সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণায় মহাদুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। আসাদুর রহমানের মতো এমন গ্রাহকের সংখ্যা কয়েক লাখ। তার হিসাবে আলিশা মার্টে ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ছাড়াও ই-ভ্যালিতে ২০ লাখ টাকা আটকে আছে তার বন্ধু সুমনের। দুই কোম্পানি মিলে তারা বন্ধুরা প্রায় ৫০ লাখ টাকা পাওনা।
জানা গেছে, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি অনলাইনে পণ্য বিক্রির কার্যক্রম শুরু করে আলেশা মার্ট। ই-কমার্স এ প্রতিষ্ঠানে বিশেষ মূল্যছাড়ে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির ৫ দফা ক্যাম্পেইন চালানো হয়। এসব ক্যাম্পেইনে ৪৫ হাজার গ্রাহক পণ্যের অর্ডার দেন। চার দফায় ক্যাম্পেইনের পণ্য ডেলিভারিও দেয়া হয়। তবে পঞ্চম দফায় ৭ হাজার ৩০০ গ্রাহকের অর্ডারের মোটরসাইকেল দিতে পারেনি আলেশা মার্ট। এসব অর্ডারের বিপরীতে গ্রাহকদের অন্তত ২০০ কোটি টাকা আটকে গেছে এ প্রতিষ্ঠানে। উত্তরা মোটরসের তেজগাঁও এলাকার ডিলার এসকে ট্রেডার্সের কাছ থেকে মোটরসাইকেল সংগ্রহ করে গ্রাহকদের দিয়েছে আলেশা মার্ট। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে নজরদারি এবং বকেয়া বাড়ায় আগস্ট থেকে আলেশাকে মোটরসাইকেল দেয়া বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ইভ্যালিসহ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এরই অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা অনুসন্ধান শুরু করলে ক্রেতাদের টাকা ফেরত দিতে সময় নেয় আলেশা মার্ট। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বনানীর প্রধান কার্যালয়ে কাস্টমার কেয়ার কার্যক্রম বন্ধ হলে শীর্ষ কর্তারা গা ঢাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আরো আগে ব্যবস্থা নিলে গ্রাহকের লোকসান কম হতো, এটা যেমন সত্য, তেমনি এক বছর আগে কমিটি করলেও কমিটিকে কাজ করতে দেয়া হয়নি, এটাও সত্য। ওই সময় ব্যবস্থা নিতে পারলে ভালো হতো।
টাকা ফেরতে উদ্যোগ : ই-কমার্স থেকে প্রতারিত গ্রাহকদের অর্থ ফেরতে গঠিত কমিটি এরই মধ্যে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহস্পতিবার এক বৈঠকে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো হচ্ছে শুধু ই-কমার্স নয়; দেশের সব ধরনের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে ইউনিক বিজনেস আইডেন্টিফিকেশনের (ইউবিআইডি) আওতায় আনা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকারের পক্ষে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটর করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ইউবিআইডির ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ইস্যু করা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) নেয়া বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ইউবিআইডির সঙ্গে বিআইএন ও ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বরও (টিআইএন) সংযুক্ত করা হবে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে রাজস্ব আদায় সহজ হবে। ইউবিআইডির রূপরেখা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি প্রণয়ন কমিটির প্রধান ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, এরই মধ্যে রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়েছে।
এছাড়া যেসব ই-কমার্স কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা নেই, এস্ক্রো সেবা চালুর পর ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়েতে তাদের গ্রাহকদের আটকে পড়া টাকা আগে ফেরত দেয়া হবে। আর যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, তাদের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে টাকা ফেরত দেয়া হবে। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি চিঠি পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়