র‌্যাব মহাপরিচালক : নাশকতার তথ্য নেই তবুও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছি

আগের সংবাদ

বাংলাদেশের গর্ব, বিশ্বের বিস্ময় : জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে যেভাবে ডানা মেলল স্বপ্নের পদ্মা

পরের সংবাদ

সুনামগঞ্জে যেন সুনামির ছোবল! : পুরো জেলা লণ্ডভণ্ড, দুঃসহ সংকটে মানুষ > খাবার ও ওষুধ নেই > ২৬ জনের মৃত্যু

প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৪, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য ও জয়ন্ত কুমার সরকার, সুনামগঞ্জের বন্যাদুর্গত এলাকা থেকে : যে হাওরের জলের ওপর নৌকা ভাসিয়ে সুনামগঞ্জবাসী চাঁদের আলোয় ভিজে জীবনকে নিয়ে মহাকাব্য রচনা করতেন, সেই হাওরে এখন জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়েছে। চলমান বন্যায় জেলার ১২টি উপজেলার সবকটিই প্লাবিত হয়ে পুরো এলাকাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ উপজেলা- শাল্লা, দিরাই, মধ্যনগর, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি এবং খাবারের অভাবে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়কর অবস্থা চলছে। এমনকি কবর দেয়ার মতো জমি না থাকায় ৫ দিন ধরে লাশ নিয়ে ঘুরে গত বুধবার একজনের এবং গতকাল বৃহস্পতিবার আরেকজনের লাশ দাফন করা হয়েছে। সবমিলিয়ে এই জেলায় এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২৬ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
তবে সেনাবাহিনীর সদস্যরা বলেছেন, তারা এখন থেকে ক্রমান্বয়ে দুর্গম অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ বিলি করার ব্যবস্থা করবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের মঈনপুর গ্রামে বন্যা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শেষে সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদও বলেছেন, বন্যার্তদের যত দিন প্রয়োজন তত দিন সেনাবাহিনী সুনামগঞ্জে থাকবে। পাশাপাশি এদিন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন ও বানভাসি মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দিতে সুনামঞ্জের তাহিরপুরে আসেন বাংলাদেশ পুলিশের প্রধান বেনজীর আহমেদ ও র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
সুনামগঞ্জের দিরাই পৌরশহরের নিকটবর্তী সুজানগর নতুনহাটির সালাম মিয়া সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে দিরাই-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে ত্রিপল টানানো ঘরে বসবাস করছেন। ঘরের একপাশে ৪টি ছোট-বড় গরু বাঁধা। সড়ক থেকে অল্প দূরেই পানিতে তলিয়ে যাওয়া তার নিজের বসতবাড়ি। কথা বলছেন, আর বাড়ির দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন। কাছে যেতেই বললেন, দেখতে আইছইন? সালাম মিয়া জানালেন, আজ চারদিন হয় আইছি, রাস্তার পাশেই ‘রান্দাবাড়া’ করতাছি। খাওয়ার কুন্তা নাই। এখনো পর্যন্ত কেউ আইছইন না দেখাত। ত্রাণ পেয়েছেন কিনা প্রশ্ন করলে, একবাক্যের উত্তর ‘না’। তিনি জানান, ত্রাণ শুধু শহরের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেই বিতরণ করা হচ্ছে। বন্যায় বসতঘরে পানি ওঠায়

কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা না পেয়ে আঞ্চলিক সড়কে এমনই মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারমতো শতাধিক পরিবার।
সরজমিন দেখা গেছে, বানের পানিতে দিরাই-মদনপুর সড়কের অন্তত তিন জায়গা ভেঙে গেছে। এর ফলে দিরাইয়ের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিছিন্ন হওয়ায় দিরাই ও শাল্লায় ত্রাণবাহী ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানগুলো ঢুকতে পারছে না। বিপাকে পড়েছেন ত্রাণদাতারাও। এর ফলে তারা শহরের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ত্রাণ দিয়ে দিচ্ছেন। তবু যারা একটু কষ্ট করে দুর্গম অঞ্চলে গিয়ে ত্রাণ দিতে চাচ্ছেন তাদের কাছ থেকে যন্ত্রচালিত নৌকাগুলো কয়েকগুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে। দিরাইয়ের ভাটির জনপদ শ্যামারচর থেকে গনিগঞ্জনামক জায়গার ভাঙা অংশে এসেছেন রনি তালুকদার। তিনি জানালেন, ঢাকা থেকে ত্রাণবাহী পিকআপ এসেছে। সড়কপথে ঢুকতে না পেরে শ্যামারচর থেকে চড়াদামে নৌকা ভাড়া করে প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণ দিয়ে এসেছেন।
নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার অধীর দাস উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট গিয়েছিলেন, চিকিৎসা শেষে অসুস্থ শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। সিলেট থেকে বাড়তি ভাড়া দিয়ে গনিগঞ্জ এসে পৌঁছালেও, গনিগঞ্জ থেকে কীভাবে বাড়ি পৌঁছবেন সে চিন্তায় পড়েছেন তিনি। বলছেন দিরাই রাস্তা থেকে ৮ কিলোমিটার রাস্তা এসেছেন ৯০ টাকা দিয়ে। ভাঙা অংশ পার হয়ে দিরাই পৌঁছাতে মোটরসাইকেলে ভাড়া দিতে হবে আরো ১০০ টাকা। এত টাকা তার কাছে নেই। স্থানীয় আকামত মিয়া জানান, শুরুতে যদি এই ভাঙা অংশে বস্তা ফেলা হতো তবে এই রাস্তার এমন দশা হতো না। এসময় পাশে থেকে অন্য একজন বললেন, বস্তাতো দূরের কথা এখানো পর্যন্ত কেউ দেখতেই আসেনি। শুধু দিরাই নয়, পার্শ্ববর্তী উপজেলা ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে বন্যার পানি নামতে শুরু করার পর সেখানেও ক্ষতচিহ্নগুলো ভেসে উঠছে। বন্যায় এই দুই উপজেলার বহুগ্রাম প্লাবিত হয়েছে। মধ্যনগরের রাস্তাটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গত ৫ দিন ধরে ধর্মপাশা ও নেত্রকোনার সঙ্গে যোগাযোগ বিছিন্ন রয়েছে।
মধ্যনগর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সঞ্জীব রঞ্জন তালুকদার টিটু বলেন, স্মরণাতীতকালের মধ্যে মধ্যনগরে এতবড় দুর্যোগ কেউ দেখেনি। প্রতিটি ইউনিয়নে ত্রাণের জন্য দেড় টন চাল পেয়েছি। এগুলোই বিতরণ করছি। ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসীর হাসান পলাশ বলেছেন, বানের পানিতে ডুবে প্রতিবন্ধী এক যুবক মারা গেছে। গতকাল তার লাশ ভেসে ওঠে। তিনি বলেন, মধ্যনগর বাজারের প্রধান রাস্তাগুলো থেকে পানি নেমে গেলেও গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা এখনো পানিতে ডুবে আছে।
সুনামগঞ্জ জেলার সবচেয়ে নিচু এলাকা শাল্লা। বারোমাসই যোগাযোগ বিছিন্ন থাকে। এবার এই নিচু এলাকাও বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। উপজেলার ৭৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে বানভাসিরা পরিবারসমেত আশ্রয় নিয়ে জীবন বাঁচালেও সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ন প্রকল্পের ১০৫টি ঘর দিয়ে শাল্লা উপজেলার শাল্লা ইউনিয়নে ‘মুজিবনগর’ নামকরণ হয়েছিল। সেই মুজিবনগরও অন্তত ৫ ফুট পানির নিচে রয়েছে। সবকিছু হারিয়ে বানভাসিরা দুচোখে শুধু অন্ধকার দেখছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, বন্যার কারণে এখনো ওই এলাকায় বিদ্যুৎ দেয়া হয়নি। ফেরেনি মোবাইলের নেটওয়ার্কও। সবমিলিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন উপজেলার বানভাসিরা। আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা না থাকায় সিংহভাগ মানুষ অবস্থান করছেন আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে। অনেকে আবার সড়কেও আশ্রয় নিয়েছেন। যে কারণে অনেকই ত্রাণ পাননি। ত্রাণ না পেয়ে চরম হতাশ। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে একমাত্র বোরো ধান গোলায় তুললেও, শেষরক্ষা হয়নি। এমনিতেই ঋণে জর্জরিত কৃষক। তার ওপর এমন বন্যা, মানুষকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরজমিন দেখা যায়, উপজেলার বহু গ্রামে শতশত কৃষকের গোলার ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। টানা কয়েক দিন পানির নিচে থাকায় সেই ধান থেকে গজিয়েছে চারাও। উপজেলার হবিবপুর ইউপির নারায়ণপুর গ্রামের রন্টু কুমার দাস প্রায় ২০ কিমি দূর থেকে নৌকা দিয়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়া ১০০ মণ ধান দিরাই-শাল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের ভালো অংশে শুকানোর জন্য নিয়ে এসেছেন। সেই ধানে চারা গজানোর পাশাপাশি বিদ্ঘুটে দুর্গন্ধ বেরিয়েছে। তিনি বলেন, ১০০ মণ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এখন এগুলো শুকিয়ে গরু ও হাঁসের খাবার তৈরি করবেন। তিনি আরো জানান, নারায়ণপুর নয়াহাটি, আগুয়াই গ্রামের অনেক কৃষকের গোলার ধান পানিতে ডুবে গেছে। একই ইউপির বাসিন্দা রামপুর গ্রামের নিশিকান্ত দাস বলেন, আমার ৬০০ মণ ধানের গোলা এখনো পানির নিচে। হয়তো পুরো ধানই নষ্ট হয়ে যাবে। আনন্দপুর গ্রামের সূর্যকান্ত রায় বলেন, দেড়শ মণ ধানের মধ্যে কিছু ধান আশ্রয়কেন্দ্রে আনতে পারলেও বাকি সব ধান পানির নিচে। মুক্তিযোদ্ধা রবীন্দ্র দাস বলেন, বন্যায় ৫০ মণ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা দর্শন বিশ্বাস জানান, তার দেড়শ মণ ধানসহ ভিটা তলিয়ে গেছে। এখন তিনি পরিবার নিয়ে রবীন্দ্র রায়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়াও বাহাড়া নতুনহাটি, সুখলাইন নতুনহাটি, নতুন যাত্রাপুর, পোড়ারপাড়, হরিনগর, শান্তিপুর, তাজপুর, মন্নানপুর, মেঘনাপাড়া, খল্লি, ভেড়াডহর, প্রতাপপুর, নাসিরপুর, ডুমরা, আঙ্গারোয়া নতুনহাটি, নোয়াগাঁও, ভাটগাঁও, মুছাপুর, মির্জাপুর নতুনহাটি, হরিপুর নতুনহাটি, শাল্লা ইউপির দামপুর নতুনহাটি, মনুয়া নতুনহাটি, হোসেনপুর, কাদিরপুর নতুনহাটি, আদিলপুর, রাজনগর, শান্তি নগর, চব্বিশা নতুনহাটি, দেয়ালেরকান্দা, গোবিন্দপুর নতুনহাটি, রৌয়া নতুনহাটি, সীমেরকান্দা, গ্রাম শাল্লা নতুনহাটি, হবিবপুর ইউপির আগুয়াই, শাসখাই, মৌরাপুর, মার্কুলী, টুকচাঁনপুর, রামপুর, নিয়ামতপুর, চরগাঁও, নোয়াগাঁও, হবিবপুর-ধীতপুর, আনন্দপুর, চাকুয়া, আটগাঁও ইউপির মির্জাপুর, দাউদপুর, রাহুতলা, মামুদনগর, শরীফপুর, সরমা, বাজারকান্দি নতুনহাটি, ইয়ারাবাদ, নিজগাঁও, সোনাকানিসহ উপজেলার আরো অনেক গ্রামের কৃষকের গোলার ধান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। সবমিলিয়ে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করে প্রণোদনা দেয়ার দাবি জানান। শাল্লা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান দিপু রঞ্জন দাস বলেন, এই মহাদুর্যোগে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ধানের ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা প্রস্তুত করে কৃষকদের প্রণোদনা দেয়ার জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে প্রস্তাব করেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, উপজেলায় কৃষকের কী পরিমাণ ধানের ক্ষতি হয়েছে তা আমরা এখনো জানি না। তবে এ নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করে ঢাকায় পাঠাবেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে সুরমা তীরবর্তী জামালগঞ্জ উপজেলায় সবকটি ইউনিয়নই প্লাবিত হয়েছে। অপেক্ষাকৃত দুর্গম অঞ্চল হওয়াতে মানবেতর জীবনযাপন করছে উপজেলার বেহেলী ও ফেনারবাক ইউনিয়নের অন্তত ৩০টি গ্রামের মানুষ। জেলার আরেক উপজেলা তাহিরপুরেও বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওপার থেকে পাহাড়ি ঢল এবং বন্যার পানির সঙ্গে বালি এসে ফসলি জমি, পুকুর ও বাড়িঘর ভরে গেছে। বাড়িঘর যেন মরুভূমি। রাস্তাঘাটও ভেঙে গর্তে পরিণত হয়েছে। বহু পুকুর ডুবে কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। সীমান্ত এলাকাসহ উপজেলাজুড়ে এখন চরম খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় বসতঘর থেকে পানি নিচে নামলেও, বাড়ির উঠানে এখনো হাঁটু পানি। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে কিছু ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের লোকজন তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। তাহিরপুর সীমান্তের বীরেন্দ্রনগর থেকে লামাকাটা, জঙ্গলবাড়ি, কলাগাঁও, চারাগাঁও, বাসতলা, লালঘাট, ট্যাকেরঘাট, বড়ছড়া, রজনী লাইন, চাঁনপুর, লাউরেরগড় পর্যন্ত প্রায় ১৭টি পাহাড়ি ছড়া রয়েছে। এসব ছড়ার ওপারে ভারতের মেঘালয় পাহাড়। বৃষ্টি হলেই এসব পাহাড়ি ছড়া দিয়ে প্রবল বেগে পানি এসে সীমান্তের বাড়িঘর লণ্ডভণ্ড করে দেয়। গত দুদিনে বন্যার পানি একটু কমলেও এখনো উজান থেকে আসছে প্রবল পাহাড়ি ঢল। এর ফলে জাদুকাটা, পাটলাই ও রক্তি নদীর তীরবর্তী এলাকার বাড়িঘর এখনো পানিতে ভাসছে। হুমকিতে পড়েছে লাউরেরগড় বিজিবি ক্যাম্প, স্কুল, মাদ্রাসা, বাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। উপজেলাবাসী গত এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি হয়ে আছেন। একজনের সঙ্গে আরেকজনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কিছু অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও পুরো উপজেলা গত এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ নেই। মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। এক দুর্বিসহ জীবনযাপন করছেন উপজেলাবাসী।
সীমান্তবর্তী লালঘাট গ্রামের সরাফত আলি জানান, পাহাড়ি ঢলে সীমান্ত এলাকা তছনছ হয়ে গেছে। যেখানে কোনোদিন পানি ওঠেনি এবারের বন্যায় সেখানেও পানি উঠেছে। খাবার, বিশুদ্ধ পানি, মোমবাতি ও সিলিন্ডার গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। বাজারে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছেন। চাড়াগাঁও গ্রামের সাবেক মেম্বার হাসান মিয়া জানান, একদিকে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে পাহাড়ি ঢলে সীমান্তের লোকজনকে শেষ করে দিয়েছে। লাকমা গ্রামের সাফিল মেম্বার জানান, বন্যার্তরা বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকলেও খাবারের অভাবে মানবেতন জীবন পার করছেন। তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির বলেন, সরকারিভাবে ত্রাণসামগ্রী আসতে শুরু করেছে। পর্যায়ক্রমে দেয়া হবে। সেখানকার একাধিক বানভাসি বলেছেন, গত কয়েক দিন ধরে সেনাবাহিনী এবং বিজিবির সদস্যরা হেলিকপ্টারে করে ত্রাণ বিলি করছেন। গতকালও হেলিকপ্টারে করে প্যারাসুটের মাধ্যমে ত্রাণ উপর থেকে নিচে রেখেছেন তারা। পরে সেই ত্রাণ নেয়ার জন্য কাড়াকাড়ি লেগে গিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সেনাবাহিনীর একটি দল গত দুদিন আগে থেকে তাহিরপুরের নির্বাচন অফিসে ক্যাম্প করেছে। ক্যাম্পের একজন সৈনিক বলেছেন, তারা ক্রমান্বয়ে নি¤œাঞ্চলের দুর্গম এলাকায় ত্রাণ বিলি করবেন।
দোয়ারাবাজার উপজেলায় বানের পানিতে সড়ক ভেঙে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। এদিকে বিশুদ্ধ পানির অভাবে পানিবাহিত রোগবালাইয়ের প্রকোপ বেড়েছে। বন্যার কবল থেকে প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে বজ্রপাতসহ এ পর্যন্ত ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। বানভাসি মানুষের মধ্যে চরম খাদ্য সংকটে উপজেলাজুড়ে হাহাকার শুরু হয়েছ। বানের তোড়ে সহস্রাধিক বসতঘর বিধ্বস্ত এবং অন্তত শতাধিক বসতঘর ভেসে গেছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক দোয়ারাবাজার উপজেলার বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি উপজেলা সদরে অবস্থান করলে হাজারো বানভাসি মানুষ ত্রাণের জন্য ভিড় জমায়। খাবার সংকটে চারদিকে যেন হাহাকার বিরাজ করছে। উপজেলার বোগলাবাজার ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মিলন খাঁন বলেন, বোগলাবাজার ইউনিয়নের অন্তত দুই শতাধিক বাড়িঘর বিধ্বস্ত এবং অর্ধশত ঘর পানির স্রোতে ভেসে গেছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়