সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেড : বড় মুনাফা এনেছিলেন আতাউর রহমান প্রধান

আগের সংবাদ

ভরা মৌসুমেও চালে অস্থিরতা : খুচরা বাজারে মোটা চাল ৫০ টাকা, পিছিয়ে নেই সরু চালও > কুষ্টিয়া ও নওগাঁয় বাড়ছে দাম

পরের সংবাদ

সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই

প্রকাশিত: মে ২৭, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ২৭, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

শিরোনামটি দেখলে মনে হবে, আমি বুঝি বিজেপির মতো রাম রাজত্ব স্বর্গধাম অযোধ্যা এমন সব অভিধা উল্লেখ করে তাদের হিন্দুত্ববাদী উগ্র ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ নেতৃত্বের অভাবে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে না এমন কোনো অভিযোগ প্রমাণের লক্ষ্যে এই নিবন্ধ লিখতে বসেছি বা এমন একটা শিরোনাম দিয়ে বসেছি। না, তা মোটেই নয় সবাই খুব ভালোভাবেই জানেন বলে বিশ্বাস করি, কদাপি হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান বা অপরাপর কোনো সাম্প্রদায়িকতায় আমি সামান্যতম বিশ্বাস করি না বা আস্থা রাখি না, বরং প্রায় প্রতিটি নিবন্ধেই ওই নোংরা মধ্যযুগীয় মতবাদের বিরুদ্ধেই কলম ধরে থাকি।
বস্তুত শিরোনামটির সঙ্গে বিজেপি বা সাম্প্রদায়িকতার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। এটি একটি পুরনো প্রবচন- মুরব্বি যারা তারাই জানেন। হাল আমলে এই প্রবচনটির প্রচলন নেই।
প্রবচনটি আয়োগমূলক। রামকে এখানে অতি সাহসী ন্যায়-যোদ্ধা এবং অযোধ্যাকে ‘দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। এক কথায়, উপযুক্ত এবং সাহসী নেতৃত্ব না থাকায় ন্যায়ের পক্ষে লড়াই হচ্ছে না- এমন আক্ষেপ করা হয়েছে।
আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতায় বলে, অন্যায় যেহেতু সাধারণত সরকার পক্ষের লোকেরাই করে থাকেন, তাই বিরোধী পক্ষের শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় নেতার পক্ষেই প্রয়োজনীয় প্রতিবাদ করা সম্ভব। সাম্প্রতিককালে অবশ্য তেমন প্রতিবাদ করার মতো জনপ্রিয় নেতা বাংলাদেশে অন্তত দেখা যায় না। কিন্তু অতীতের কথা ভাবলে দিব্যি মনে পড়ে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কথা। কোনো গুরুতর অন্যায়, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি দেখলে তিনি জনসভা করে তার ভাষণের এক পর্যায়ে বলে উঠতেন, ‘খামোশ’।
ওই খামোশ শুনে সব অন্যায়কারীর বুক কেঁপে উঠত যদিও মওলানা ভাসানী ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা। ‘খামোশ’ শব্দটি সব শক্তি দিয়ে উচ্চারণ করে তিনি একটি স্বল্পমেয়াদি সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বলতেন, ‘তোমরা যারা অন্যায় করছ তাদের সবার নামের তালিকা আমার পকেটে। তাই ওই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যদি অন্যায়-দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ না কর তবে মিছিল নিয়ে গিয়ে আমি তোমাদের আস্তানা ঘেরাও করব।’ অন্যায়কারীদের বুকের কাঁপন আরো ত্রাসের সৃষ্টি করত তাদের মনে এবং দৃশ্যতই কিছু না কিছু ফল ফলত। মানুষ সাময়িকভাবে হলেও যথেষ্ট উপকৃত হতো।
মনে আছে, খবরের কাগজ বিলম্বে বিলি করায় পাবনায় একদিন এক ডিএসপি অর্থাৎ ডেপুটি সুপারিনটেন্ট অব পুলিশ এক হকারের গালে থাপ্পড় মেরে যথেষ্ট আহত করেছিলেন। সাংবাদিকরা এ খবরটি ঢাকার কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ করেন। মওলানা ভাসানীর চোখে খবরটা পড়ে। তিনি বিষয়টা মনে রাখেন। কিছুদিনের মধ্যে নানা ইস্যুতে ডাকা ঢাকার পল্টন ময়দানের এক বিশাল জনসভায় বিষয়টি উল্লেখ করে পুলিশের আইজিকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, পাবনার ওই ডিএসপির বিরুদ্ধে যদি এই মুহূর্তে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তবে আমি নিজে গিয়ে মিছিল নিয়ে তার অফিসে গিয়ে ওই বেয়াদব ডিএসপির গালে থাপ্পড় মারব। তোমরা পারলে আমাকে গ্রেপ্তার করো।
পরদিনই সংশ্লিষ্ট ডিএসপিকে পোটলাপুঁটলি গুটিয়ে পাবনা ছেড়ে যেতে দেখা গেল। আজ কত হাজার হাজার হকার ও গরিব লোককে পুলিশ নানা অজুহাতে ধমক তো দিচ্ছেই, লাঠি পেটা করছে, রিকশা শ্রমিকদের পিটুনি দিয়ে রিকশাটা ভেঙে ফেলছে; কিন্তু তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কেউ নেই।
শুধু তাই বা কেন দুর্নীতিবাজরা হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ দিব্যি বিদেশে পাচার করে চলেছে, টাকা ছাড়া চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না। নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া যাচ্ছে না, কন্ট্রাক্টারি পেয়ে দুর্নীতি করে নিম্নমানের নির্মাণকাজ করে চলেছে ইত্যাদি। সাংবাদিকরা খবরটি পেলে নানা সূত্র থেকে যাচাই করে পত্রিকার পৃষ্ঠায় ছেপে দিচ্ছেন কিন্তু তার বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। অথচ এর প্রতিবাদ করার মতো জনপ্রিয় কোনো নেতা গড়ে উঠছে না।
শিক্ষাক্ষেত্রে ন্যায়-নীতির বালাই সম্পূর্ণ অবলুপ্ত। পাঠ্যপুস্তক থেকে দিব্যি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ দিকপালের কবিতা-প্রবন্ধ-গল্প বাতিল করে সাম্প্রদায়িক বিবেচনায় পাঠপুস্তক সরকারি তহবিল থেকে ছেপে বিনামূল্যে বিলি করে শিশুকাল থেকেই শিক্ষার্থীদের মনে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে দিয়ে তাদের আজীবন সাম্প্রদায়িক চিন্তার আচ্ছন্ন করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে সংবাদপত্র এবং কিছু বামদল ছাড়া কেউ সামান্যতম প্রতিবাদ করছেন না। উদার গণতন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ বুদ্ধিজীবী এবং ছাত্র-যুবসমাজ কোথায়? কোথাও কোনো প্রতিবাদ নেই যেন এটাই স্বাভাবিক। এতে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠছে, অসাম্প্রদায়িক শক্তিশালী কতটা দুর্বল হয়ে পড়ছে তা নিয়ে কাউকে ভাবতে দেখা যায় না। এমনকি প্রতি বছর শত শত জায়গায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দির-গির্জা পোড়ানো হচ্ছে- দেখেও সব ‘অসাম্প্রদায়িক’ শক্তি দিব্যি চুপচাপ। পুলিশ নির্বাক, সরকার চুপচাপ। ফলে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো, জঙ্গিবাদী শক্তিগুলো ভয়াবহভাবে যে পরিমাণ বেপরোয়া হয়ে উঠছে তার পরিণতিতে জাতীয় পর্যায়ে মারাত্মক দুর্যোগ বয়ে আনতে পারে।
মওলানা ভাসানীর ‘খামোশ’-এর পুনরুচ্চারণ আজ আবার প্রয়োজন। প্রয়োজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, কমরেড মনি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ প্রমুখ নেতা যারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা সহিংসতা শুরু হওয়ামাত্র বিশাল বিশাল সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী, দাঙ্গাবিরোধী সেøাগান দিয়ে দেশে ঝড় তুলতেন- দাঙ্গাবাজদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিতেন। এদেশেই তো আমির হোসেন দাঙ্গাবিরোধী মিছিল করতে গিয়ে দাঙ্গাবাজদের হাতে ঢাকায় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। আজ ওইসব নেতার উত্তরসূরিরা কেউ ছুটে যান না ঘটনাস্থলে। কোনো এমপি, মন্ত্রীরা নেতাকে (বাম নেতারা বাদে) ছুটে গিয়ে প্রতিবাদ জানাতে বা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় না। সরকারিভাবে কিছু রিলিফের চাল, গম কখনো কখনো ভিক্ষার আকারে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিলি করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়। এতে দিনে দিনে দেশটি কোথায় যেতে চলেছে- তার প্রতিরোধে কী করা দরকার- তেমন ভাবনায় ভাবিত হতেও দৃশ্যত কাউকে দেখা যায় না। অথচ দিব্যি বক্তৃতায়-ভাষণে নেতারা দিব্যি বলে চলেছেন ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ’। সত্যিকারেরই যদি আজকের বাংলাদেশ তেমনটি হতো তবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে জিয়াউর রহমানের বিসমিল্লাহ, ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোর বৈধতা, এরশাদের ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ প্রভৃতি বাহাত্তরের সংবিধানের সম্পূর্ণবিরোধী, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বিষয়গুলো এই সরকার জনমত উপেক্ষা করে স্থায়ী রূপ দিতে পারতেন। দেশটা আজ দুঃখজনকভাবে চলছে জিয়া, এরশাদ, মুশতাক প্রমুখের নীতিতে আদর্শিকভাবে। এর পরিণতি কোনো না কোনো দিন ভয়াবহ হতে বাধ্য। মুজিব শতবর্ষ ও মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী সেই ২০২০ থেকে পালিত হলেও এবং এই দীর্ঘ সময় কালে কয়েকটি সংসদ অধিবেশন বসলেও বঙ্গবন্ধুর বাহাত্তরের সংবিধান পুনরুজ্জীবন করে তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখানো হলো না। বস্তুত প্রকৃত বঙ্গবন্ধুকে যেন আমরা ভুলিয়ে দিয়ে ঝাড়বাতির চাকচিক্য দিয়ে নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে চাইছি।
সমাজে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক বৈষম্য যেমন সমানে বেড়ে চলেছে তেমনই আবার অর্থনৈতিক বৈষম্য দিব্যি পাহাড় প্রমাণ করে গড়ে তোলা হচ্ছে। উচ্চ সরকারি, আধা সরকারি কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য, মন্ত্রীদের গাড়ি-বাড়ি, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অকল্পনীভাবে বাড়ানো হলেও নিম্ন কর্মচারী শ্রমিক কৃষকদের বেলায় বা বেকার-দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের বেলায় উপহার হিসেবে জুটছে দ্রব্যমূল্যের আকাশচুম্বী বৃদ্ধি, বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাসের দাম, জ¦ালানি হু হু করে প্রতিরোধহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে তাদের জীবনে নেমে আমছে সীমাহীন বৈষম্য। এ ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক প্রতিকূলতা দূর করতে শ্রমিকদের নিম্নতম বেতন ২৫ হাজার টাকা, তাদের বাসস্থান ও সন্তানদের শিক্ষা-চিকিৎসা প্রভৃতির ব্যবস্থা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা, বেকার-ভাতা উপযুক্ত পরিমাণে চালু করা না হলে এ সমাজ দিনে দিনে ভেঙে পড়তে বাধ্য।
ব্যবসায়ীরা পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করে যেভাবে লাভবান হচ্ছেন তাদের কর্মচারীরা নিম্নহারে বেতন পেয়ে তেমনই দুরবস্থার ক্রমবর্ধমানতার অসহায় শিকারে পরিণত হচ্ছেন।
সমাজব্যবস্থার এই হাল শেষ বিচারে শোষণভিত্তিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রচলনের মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছে। বাহাত্তরের সংবিধানে সমাজতন্ত্রের যে কথা লিখিত আছে তা পরিত্যাগ করায় এই বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই প্রয়োজন ‘খামোশ’ বলার মতো দৃঢ়তা।

রণেশ মৈত্র : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়