ভালোবাসা এখন ‘ভার্চুয়াল’, আবেগেও পড়েছে টান : তবুও বসন্ত জেগেছে বনে

আগের সংবাদ

সংস্কৃতির চর্চা জোরদারের তাগিদ > বাঙালির প্রাণের মেলার উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী : হাতে নিয়ে বই পড়ার আনন্দ অনেক

পরের সংবাদ

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

শোষণ-নিপীড়নের সীমা যখন ছাড়িয়ে যায় তখনই মুক্তির দূত হিসেবে আবির্ভূত হন এমন কোনো মহানায়ক যিনি দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে প্রতিষ্ঠা করেন সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থা। বিশ্ব ইতিহাসের তেমনি একজন মহানায়ক হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি নিপীড়নের দুর্ভেদ্য দেয়াল ভেদ করে বাঙালিদের জন্য নিয়ে এসেছিলেন মুক্তির বারতা এবং স্বৈরাচারের নাগপাশ থেকে দেশকে মুক্ত করে বাঙালিদের উপহার দিয়েছিলে বহু বছরের কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র। তিনি ছিলেন এমনই একজন নেতা যার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের স্ফুলিঙ্গে তিমিরাচ্ছন্ন গগনে উদিত হয়েছিল স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য এবং যার একটি ভাষণই ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, একনায়কতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র এবং কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে এক মহাপ্রলয় সৃষ্টি করেছিল, যা এখন রীতিমতো বিশ্ব ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। একটি বদ্ধ প্রকোষ্ঠে আটকে পড়া জাতিকে উদ্ধার করার জন্য এমন ভাষণ বিশ্বে বিরল। কৃমি কীটে খাওয়া দগ্ধ শাসন ব্যবস্থার বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়েছিল বাঙালি জাতি, আর এমনই এক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি কালো অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে আলোর স্ফূরণ ছড়িয়ে ছিল এবং বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার স্বাদ পেতে ঝংকার তুলেছিল। অর্ধশত বছর আগে দেয়া সেই কালজয়ী ভাষণেই মুক্তির আস্বাদন পেয়েছিল বাঙালি জাতি। ঐতিহাসিক সেই ভাষণটি বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং এমনই অনুপ্ররণামূলক ভাষণ ছিল সেটি, যা মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছিল এবং বুকের তাজা রক্ত দিতে বাঙালি ন্যূনতম কুণ্ঠাবোধ করেনি। বাংলাদেশ আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে গর্বের সাথে। ৫০ বছর আগে সেই ভাষণটি না দিলে আমরা সুবর্ণজয়ন্তী করতে পারতাম না। মুজিব শতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এমন একজন মানুষকে নিয়ে দু-কলম লেখার সাহস করছি যাকে হিমালয়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর এই তুলনাটি কোনো সাধারণ লোকে করেননি। এই তুলনাটি করেছিলেন কিউবা নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। হিমালয় তুল্য এই মানুষটি হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি শুধু একজন মহানায়কই নন, তিনি নিজে একটি প্রতিষ্ঠান এবং একটি ইতিহাস।
যুগে যুগে যখন শোষণ-জুলুমের সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন কোনো ক্ষণজন্মা পুরুষের আবির্ভাব ঘটে। এমনই এক ক্ষণজন্মা পুরুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার শাসন ব্যবস্থার যখন কৃমি কীটে খাওয়া দগ্ধ লাশের চেহারা ঠিক তখনই জন্ম নিলেন এই কালজয়ী নেতা। খুব ছোট থেকে আন্দাজ করা গিয়েছিল যে এই শিশুটি একদিন বড় কিছু হবে। সবার ধারণা সত্য প্রমাণিত হলো। সেই ছোট খোকা ধীরে ধীরে কালের আবর্তে ইতিহাসের মহানায়কে পরিণত হলেন যেটা মোটেও সহজ ছিল না। জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে তাকে মোকাবিলা করতে হয় অত্যাচার, নির্যাতন আর ষড়যন্ত্রের বিষাক্ত ছোবল। প্রকাণ্ড ঝড়ের মাঝে উত্তাল সাগরে টিকে থাকা তরীর মতো তার জীবন। পাহাড়সম ঢেউ এসেও তার ইচ্ছা তরীকে ডুবাতে পারেনি। এমনটি শুধু কোনো মহাবীরের পক্ষেই সম্ভব। সীমাহীন সাহস, অসীম আত্মবিশ্বাস, উপস্থিত বুদ্ধি, প্রজ্ঞা এবং মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে নক্ষত্রে পরিণত করেছে।
ক্ষণজন্মা এই মহানায়কের জীবন ও কর্ম তুলে ধরা এত ছোট পরিসরে অসম্ভব। পাঠকদের কথা মাথায় রেখে তার সংক্ষিপ্ত জীবনী ও কর্ম তুলে ধরার চেষ্টা করছি। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তার জন্ম। ১৯২৭ সালে সাত বছর বয়সে তিনি গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। এ সময় তার চোখে কিছুটা সমস্যা দেখা গেলে লেখাপড়ায় কিছুটা গ্যাপ পড়ে যায়। ১৯৩৭ সালে তিনি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হন। স্কুল থেকেই তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৩৯ সালে অসীম সাহসিকতার জন্য শেরে বাংলা তাকে বুকে টেনে নেন। তিনি তার স্কুলের ছাদ মেরামতের দাবিটি শেরে বাংলার কাছে বলিষ্ঠভাবে পেশ করেছিলেন।
১৯৪০ সালে তিনি মেট্রিক পাস করেন এবং কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। এ সময় তিনি বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ইসলামিয়া কলেজে পড়া অবস্থায় তিনি সক্রিয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। এই কলেজে তিনি জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে তিনি এখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এ সময় কলকাতার দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তি হন। এ বছর তিনি মুসলীম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পাঁয়তারা চলছিল তখন। তরুণ মুজিব তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। তার নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এ সময় আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তাদের নায্য দাবি আদায়ে ধর্মঘট আহ্বান করলে তরুণ মুজিব তাতে সমর্থন দেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাশন তাকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠিত হয়। এ সময় তিনি জেলে থাকা অবস্থায় দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে জেলখানায় অনশন শুরু করেন এবং একটানা ১৭ দিন অনশন করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো। এ সময় তিনি ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয় হলে তিনি কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করলে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৫৫ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবি করে ২১ দফা দাবি পেশ করে আন্দোলন চালাতে থাকেন। এ বছরেই আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ গঠন করা হয় এবং তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৬ সালে তিনি কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রী হন। ১৯৫৭ সালে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন চালাতে থাকেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান কর্তৃক মার্শাল ল জারি করা হলে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় জেল খাটেন। ১৯৬১ সালে তার নেতৃত্বে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। তিনি আবারো গ্রেপ্তার হন। ১৯৬২ সামরিক শাসন অবসান হলে তিনি কারামুক্ত হন।
১৯৬৩ সালে তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি করেন। ১৯৬৫ সালে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা করা হয় এবং তিনি দীর্ঘ সময় জেল খাটেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ৬ দফা পেশ করেন। এর প্রথম দফাটি ছিল স্বায়ত্তশাসন। এটি ছিল মুক্তির সনদ। এ সময় তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৮ সালে তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয় এবং গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৯ সালে তিনি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে কারামুক্ত হন। এ বছর তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে। ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা শুরু হলে তিনি আন্দোলনের ডাক দেন।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চে তিনি বাংলার মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে কালজয়ী ভাষণ দেন। ২৫ মার্চ রাতে নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হায়েনার দল। এই রাতেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এর পর তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৭২ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং সরকারপ্রধান হন। ১৯৭২ সালে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সংবিধান কার্যকর হয়। ১৯৭৪ সালে তিনি জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের হাতে তিনি সপরিবারে নিহত হন। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যার কাছে নিজের সুখ ছিল খুব তুচ্ছ। তার মতো দূরদর্শী নেতা বিশ্বে বিরল। তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের পুজারি এক নির্ভীক দুর্জয় সাহসী জাতীয়তাবাদী নেতা। অমানিশার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত দাসত্বের করাল গ্রাসে নিপতিত একটি জাতির জন্য তিনি এলেন আলোর দিশারী হয়ে।
ছোট থেকে বৃহৎ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে পারতেন। সমাজের কোথায় গলদ এবং সেটা সারানোর উপায়টিও তিনি জানতেন। অতি দৃঢ়চেতা এই মহাবীর বাল্যকালেই প্রমাণ করেছিলেন যে তার জন্ম শুধু দুটো ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচার জন্য হয়নি। সমাজ বদলে তার করণীয় অনেক কিছু আছে। স্কুলে পড়া অবস্থায় দাবি-দাওয়া নিয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলার সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানো সহজ কোনো বিষয় ছিল না। শেরে বাংলার বুঝতে মোটেও সময় লাগেনি যে কী সুপ্ত শক্তি সেই বালকটির মাঝে লুকিয়ে ছিল। তিনি সেই বালককে কাছে টেনে নিলেন। সেই বালক হয়ে গেল বিশ্ব আইকন, নেতৃত্বের জাদুকর, ইতিহাসের এক বিরাট মহিরুহ। তিনি ছিলেন সৎ, বলিষ্ঠ, অদম্য, দুর্বার ও বিদ্রোহের অগ্নিশিখা। কিংবদন্তি কালজয়ী এই নেতার কণ্ঠে ছিল ইন্দ্রজাল। যার বজ্রকণ্ঠের ভাষণ ইতিহাসের বড় দলিল হয়ে গেছে। ক্ষণজন্মা এই পুরুষ ছিলেন মুক্তির দিকপাল, এক মহা কাণ্ডারি এবং মানবতাবাদের ক্যানভাসে গণতন্ত্রের দিশারী।
তিনি ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা, এক বিরাট বটবৃক্ষ এবং বাতিঘর, যিনি ছিলেন স্বৈরাচার শাসনের বিরুদ্ধে এক প্রবল ঝড়। সাত কোটি বাঙালির প্রাণের প্রদীপ বিশ্ববরেণ্য এই নেতা ছিলেন দেশ প্রেমের এক মূর্ত প্রতীক। রাজনীতির এই মহাকবি ছিলেন তিমিরাচ্ছন্ন গগনের এক দীপ্ত রবি। শোষণের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক মহা স্ফুলিঙ্গ যিনি মহাপ্রাচীর ভেঙে ছিনিয়ে এনেছেন পতাকা এবং একটি মানচিত্র। বাংলার নৃপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু ছিলেন অকুণ্ঠ, সদাশয় ও দূরদর্শী। জননন্দিত, অবিসংবাদিত, অসাম্প্রদায়িক, সেক্যুলার, আপসহীন এই বিশ্বনেতার চলার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না।
তার স্বর্ণালি দিনগুলো কেটে গেছে রাজপথ, আন্দোলন-সংগ্রাম আর কারাগারের অন্ধ কুঠিরে। স্বপ্নের কারিগর, অনলবর্ষী এই বক্তা তার সহজাত গুণের কারণে ঘুমন্ত বাঙালিকে জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলেন। বিশ্বের বহু নেতা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু ফসল ঘরে তুলতে পেরেছেন এমন নজির খুব কম। বঙ্গবন্ধু ছিলেন এমন এক ব্যক্তি তিনি যা ভেবেছেন তা শুরু করেছেন, সেটাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং সেটার ফসল ঘরে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছেন। আর তার শ্রেষ্ঠত্ব ঠিক এখানেই। ধারাবাহিক সংগ্রামের বলিষ্ঠ এই বীর হিমালয়ের মতো প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, যা ভেদ করা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। যার মহান নেতৃত্বে মাত্র ৯ মাসে পরাক্রম একটি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাঙালিরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল।
মানব প্রেম, দয়া, ক্ষমা ও দানশীলতা তাকে ধীরে ধীরে কালজয়ী ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। তিনি এমন এক ক্যারিশমেটিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন যার কথায় ও ভালোবাসার টানে বাঙালিরা জীবন দিতে রাজি ছিল। বাঙালি জাতির মুক্তির দূত, নীতিতে অবিচল, উজ্জীবনী শক্তির ধারক আপন শক্তি বলে প্রকাণ্ড প্রতিবন্ধককে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলেছিলেন। টর্নেডোর মতো ক্ষিপ্রগতিতে তিনি হাজার বছরের বদ্ধ খাঁচার দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন। পরাধীনতার লৌহ শিকলে আটকে থাকা একটি জাতিকে তিনি মুক্ত করেছিলেন। কোনো ভয়, কোনো ষড়যন্ত্র, কোনো ফাঁদ, কোনো হুমকি তার এগিয়ে যাওয়ার পথকে প্রতিহত করতে পারেনি।
তার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ঘটেছিল মুক্তির সমর। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের যে নেতৃত্ব তিনি দিয়েছিলেন তা বিশ্বে বিরল। ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল দেশকে ভালোবেসে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। আজ আমাদের স্বাধীনতা ৪৯ পেরিয়ে ৫০-এ পদার্পণ করল। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে আজো আমরা পরাধীন থাকতাম। স্বাধীন দেশে বাস করে মুক্ত বায়ুতে শ্বাস নিতে পারছি এই মহান মানুষটির জন্য। স্বাধীনতার স্বাদ যে জাতি এখনো পায়নি তারা বোঝে স্বাধীনতার মূল্য কত। আজ বাংলাদেশে যোগাযোগ ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটেছে। জিডিপিতে আমরা ভারতকে পিছে ফেলে দিয়েছি। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ নির্মাণ স্বঅর্থায়নে করা সম্ভব হয়েছে। আজ এসব কিছুই অধরা থেকে যেত যদি বঙ্গবন্ধু দেশটিকে স্বাধীন না করে দিতেন। বিশ্বের বুকে আজ আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছি বঙ্গবন্ধুর কারণে। মুজিব শতবর্ষে সমগ্র বিশ্ব তাকে বিরল সম্মান দিচ্ছে। আমরা জাতির জনকের প্রতি চির কৃতজ্ঞ।
তিনি তার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখতেন না। তার গগনচুম্বী স্বপ্ন ছিল বদ্ধ প্রকোষ্ঠে আটকে থাকা অসহায় মানুষগুলোকে মুক্ত করে স্বাধীনতার স্বাদ দেয়া। বাঙালি জাতি যে শিকলে বাঁধা পড়েছিল সেটা ভেঙে দেয়াই ছিল তার মহা ব্রত।
তিনি তার মূল স্বপ্নটি পূরণ করতে পেরেছিলেন। মুক্তির পরম স্বাদ তিনি বাঙালিদের দিয়েছিলেন। বিশ্বের একজন ত্যাগী সংগ্রামী নেতা হিসেবে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। অসীম সাহসিকতার জন্য ব্রিটিশ রাজকবি টেড হিউজ বঙ্গবন্ধুকে ‘টাইগার অব বেঙ্গল’ বলে অভিহিত করেছেন।
কবিতার মতো করে বলতে ইচ্ছা করে :

তিনি ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি। বাঙালিয়ানার প্রবাদ পুরুষ এই মানুষটির শিল্প সাহিত্যের প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা। রবীন্দ্রনাথের একটি গানকে তিনি জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দিয়েছিলেন। নজরুলের একটি গানকে তিনি রণসংগীত হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন এবং নজরুলকে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অংশগ্রহণ করেছিল। নারীদের বিশেষ মর্যাদা বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন। ’৭২-এর সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতার বিধানটি যুক্ত করেন। নারীর ক্ষমতায়নের ভিত রচিত হলো ’৭২-এর সংবিধানের মাধ্যমে। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নারীদের তিনি বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়েছেন। যুদ্ধ শিশুর সামাজিক পরিচয়ের বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর মাথায় ছিল। বিশাল হৃদয়ের এই মহান নেতা জাতীয় মহিলা সংস্থার এক ভাষণে বললেন আজ থেকে যুদ্ধ শিশুদের সামাজিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে তাদের পিতার নামের জায়গায় শেখ মুজিবুর রহমান লিখবে এবং ঠিকানা লিখবে ধানমন্ডি ৩২। যুদ্ধে যেসব নারী নির্যাতিত হয়েছিল তাদের তিনি বিশেষ মর্যাদা দেয়াসহ পুনর্বাসন করেন। সরকারি চাকরিতে নারীদের জন্য ১০ ভাগ কোটা সংরক্ষণ করেন।
কিন্তু যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটিকে তিনি যখন নতুনভাবে সাজানো শুরু করলেন ঠিক তখনই কতিপয় জঘন্য কুচক্রী কিছু অমানুষ তার বুকে গুলি চালাল নির্মমভাবে। বিশ্বাসঘাতকদের হাতে প্রাণ হারালেন তিনি ও তার পরিবার। সৃষ্টি হলো ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য কলঙ্কিত অধ্যায়। কবির ভাষায় বলা যায়-

হিমালয়তুল্য এই মহান নেতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষ হাতে দেশ পরিচালনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। দেশের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত নানা পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক রোল মডেল।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়