অধ্যাপক সাইদা হত্যা : গ্রেপ্তার আনারুলের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

আগের সংবাদ

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংলাপ : নির্বাচন কমিশন গঠনে ৪ প্রস্তাব

পরের সংবাদ

স্বস্তির ভোটে আইভীর হ্যাটট্রিক : সব শঙ্কা উড়িয়ে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট, শামীম ওসমানের কেন্দ্রে হেরেছে নৌকা

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৭, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৭, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

কামরুজ্জামান খান, এস এম মিজান ও অনতু রেজা, নারায়ণগঞ্জ থেকে : ভোটের গতিপ্রকৃতি দেখে আইভীর জয়ের ব্যাপারে সংশয় ছিল না কারোরই। সেই ধারণার প্রতিফলন ঘটল ফলাফলেও। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে প্রত্যাশিত জয় পেলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী। পরপর তিন বার ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’ খ্যাত এই মহানগরীর উন্নয়নের দায়িত্ব পেলেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী বিএনপির পদচ্যুৎ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকে ৬৯ হাজার ১০২ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন তিনি। আইভীর প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৬১ হাজার ২৭৩। আর তৈমূর পেয়েছেন ৯২ হাজার ১৭১ ভোট। আইভীর এই হ্যাটট্রিক জয়ের পেছনে তার পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি ইমেজের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী শিল্পনগরীর উন্নয়নে ভোটারদের প্রত্যাশা নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
অঘটনের সব আশঙ্কাকে ছাপিয়ে গতকাল রবিবার উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয় নাসিক নির্বাচন। ইভিএম পদ্ধতিতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এই ভোট শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা পরই বুথ থেকে ফলাফল প্রকাশ পায়। এতে শুরু থেকেই ১৯২টি কেন্দ্রের প্রায় সবকটিতে এগিয়ে থাকে আইভীর ‘নৌকা’। বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে তৈমূরের ‘হাতি’। তবে নিজ কেন্দ্রের পাশাপাশি আলোচিত সংসদ সদস্য শামীম ওসমান যে কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন সেখানেও বড় ব্যবধানে জয় পান তৈমূর। শামীম ওসমানের কেন্দ্রে ৪৫৫ ভোটে হেরে যায় নৌকা।
এদিকে মেয়র পদে প্রতিদ্ব›দ্বীদের পাশাপাশি কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীরাও জয়ের আশায় উদগ্রীব হন। সদ্য সাবেকদের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে জয় পেতে চান নতুরাও। মূলত কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্ব›দ্বীরা ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে মরিয়া ছিলেন। পাড়া-মহল্লায় তারা ঘরে ঘরে লোক পাঠিয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে চেষ্টা করেন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত। গতকাল সকাল ৮টায় ১৯২টি কেন্দ্রে শুরু হয় ভোটগ্রহণ। শান্তিপূর্ণভাবে চলা ভোট শেষ হয় বিকাল ৪টায়। সকাল সাড়ে ৮টায় নারায়ণগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা কেন্দ্রে ভোট দেয়া শেষে স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার নির্বাচনে লক্ষাধিক ভোটে জয়

পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর তিনি বলেন, দৃশ্যমান কোনো কারচুপি না হলে জনগণের রায় মেনে নেব।
অন্যদিকে বাবার কবর জিয়ারত করে বেলা ১১টার দিকে নগরীর শিশুবাগ বিদ্যালয়ের নারী কেন্দ্রে ভোট দেয়া শেষে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, নারায়ণগঞ্জের মানুষ নির্ধারণ করে ফেলেছেন আমাকেই ভোট দেবেন। ইনশাআল্লাহ নৌকার জয় হবেই হবে, আইভীর জয় হবেই হবে। বিকালে প্রায় শেষ সময়ে রিকশাযোগে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শ স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টা আগে বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে তিনি ভোট দিতে আসেন। আদর্শ স্কুল কেন্দ্রের ৩০১ নম্বর কক্ষে তিনি ভোট দেন। নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ‘আদর্শ স্কুল, নারায়ণগঞ্জ’ কেন্দ্র পর্যবেক্ষণে এসে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিদায়লগ্নে একটি ভালো নির্বাচন দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। নির্বাচন কমিশনের সচিব হুমায়ুন কবীর খন্দকার বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে ভোট পড়েছে ৫০ শতাংশ।
নারায়ণগঞ্জ শহরে ২৭টি ওয়ার্ডে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৭ হাজার ৩৬১ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৪৬ জন পুরুষ ও ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১১ জন নারী ভোটার এবং ৪ জন ট্রান্সজেন্ডার ভোটার। শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শেষে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার অস্থায়ী কার্যালয় থেকে প্রচার করা হয় নির্বাচনের বেসরকারি ফল। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শ স্কুল কেন্দ্রে বিকালে ভোট দিয়েছে সাংসদ শামীম ওসমান। সেখানে নৌকা পেয়েছে ৫২৭ ভোট। তৈমূর আলম খন্দকার হাতি প্রতীকে পেয়েছেন ৯৮২ ভোট। এতে আইভী ৪৫৫ ভোট কম পেয়েছেন। তৈমূর ভোট দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল এমএ মাদ্রাসা কেন্দ্রে। সেখানে নৌকা ৫০৬ ও হাতি পেয়েছে ৭৭৪ ভোট। আইভী দেওভোগ শিশুবাগ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন। সেখানে নৌকা পেয়েছে ১৪৩৫, হাতি পেয়েছে ৫৩০ ভোট।
সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ভোটে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোস্তাইন বিল্লাহ। কিছু কিছু জায়গায় ভোটে ধীর গতির অভিযোগ স্বীকার করেন তিনি। রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তার বিকালে বলেন, ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে বিকাল ৪টায়। তারপর থেকে অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত ফলাফল রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে ফলাফল ঘোষণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়াই সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভোটগ্রহণে ধীরগতির অভিযোগ মানতে চাননি তিনি। এর আগে দুপুরে রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তার জানান, ১৯২টি ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে একজন এসআইয়ের নেতৃত্বে রয়েছে পাঁচজন করে পুলিশ সদস্য। এছাড়া আটজন পুরুষ ও চারজন নারী আনসার সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন। নির্বাচনে পুলিশের ২৭টি ইউনিট স্ট্রাইকিং ফোর্স, পুলিশের মোবাইল টিম ৬৪টি, প্রতি টিমে সদস্য পাঁচজন। এছাড়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১৪ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন আছে। নির্বাচনে সহিংসতা রোধে ১৪ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পেনাল কোডের অধীনে তারা মামলা নিয়ে সংক্ষিপ্ত বিচারকাজ পরিচালনা করতে পারবেন।
পৌষের কনকনে শীতের মধ্যে সকালেই কেন্দ্রগুলোতে ছিল ভোটারদের লক্ষণীয় উপস্থিতি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রগুলোতে তা আরো বাড়ে। শেষ সময়ে এসেও প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। কোথাও কোথাও ছিল ভোটারদের উপচে পড়া ভিড়। কিছু কেন্দ্রে ভোটগ্রহণে ধীর গতি লক্ষ্য করা গেছে। ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং অফিসাররা বলেছেন, ইভিএমে ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে ভীতি থাকায় ভোট দিতে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সময় লেগেছে। আর এতে তৈরি হয় ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। সকাল ৮টার দিকে দুই বছরের ছেলেকে কোলে করে বন্দর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিনগর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে যান আসমা বেগম। সাড়ে ছয় ঘণ্টার ক্লান্তিকর অপেক্ষা শেষে দুপুর আড়াইটার দিকে তিনি ভোট কক্ষে প্রবেশ করেন। আরো ২০ মিনিট অপেক্ষার পর দুই দফার চেষ্টায় ভোট দিতে পারেন তিনি। আসমার অপেক্ষা ফুরালেও অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ভোট দিতে পারেননি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে এলে তাদের অনেকেই বিরক্ত হয়ে ভোট না দিয়ে বাড়ি ফিরে যান। সোনারগাঁ থেকে বন্দরের মদনগঞ্জে ভোট দিতে যান গৃহিণী উর্মিলা আক্তার। বেলা ১১টায় এসে দুপুর দেড়টার দিকে ভোট কক্ষে ঢুকতে পারলেও ভোট দিতে পারেননি তিনি। দুপুর ২টার দিকে কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে ভোট না দিতে পারার কারণ সম্পর্কে বলেন, ‘আমার আঙুলের ছাপ নেয়ার পর ছবিও আসছে। কিন্তু ভোট দিতে পারিনি। কেন পারিনি তা বুঝি নাই।’ তার ভোটকক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেনের কাছে কারণ জানতে চাইলে বলেন, অনেকের এমন হচ্ছে। আরো পাঁচজনের এমন হয়েছে।
তৈমূর আলমের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মহানগর বিএনপির সেক্রেটারি এটিএম কামাল দুপুরে অভিযোগ করেন, বন্দরের সোনাকান্দায় যুবদল নেতা মনোয়ার হোসেন শোখনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। হাজীগঞ্জে আইটি স্কুলের সামনে থেকে হাতির ব্যাজ পরা জামাল ও শাহ আলমকে নিয়ে গেছে পুলিশ। সেখানে নৌকার লোকজন প্রভাব বিস্তার করেছে। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার হাউস কেন্দ্রে হাতির এজেন্টকে বের করে দিয়েছে। শহরের মরগ্যান ও শিশুবাগ স্কুলে হাতি প্রতীকের লোকজনদের থাকতে দেয়া হচ্ছে না। প্রায় বেশির ভাগ কেন্দ্রে এ সমস্যা হচ্ছে। তৈমূর আলম খন্দকার অভিযোগ করেন, বন্দরে সুফিয়ান নামের একজন ঠিকাদারের নির্দেশে যুবদল নেতা শোখনকে আটকে রেখেছে পুলিশ।
প্রসঙ্গত, নির্বাচনে মেয়র পদে প্রধান দুই প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থী নৌকা প্রতীকের সেলিনা হায়াৎ আইভী ও হাতি মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার কেউই বড় ধরনের কোনো অনিয়মের অভিযোগ করেননি। তবে ইভিএমে ভোট হওয়ার কারণে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটারদের আঙুলের ছাপ মেলাতে সমস্যা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আইভী ও তৈমূর আলম ছাড়া মেয়র পদে অপর প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীরা হলেন- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এ বি এম সিরাজুল মামুন (দেয়াল ঘড়ি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাছুম বিল্লাহ (হাতপাখা), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির রাশেদ ফেরদৌস (হাতঘড়ি), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. জসিম উদ্দিন (বটগাছ) ও স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী কামরুল ইসলাম (ঘোড়া)। এছাড়া সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন এবং সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ৩৪ জন প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়