চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা : চালকের সহকারী শাহীরুল এখন কোটিপতি

আগের সংবাদ

তিস্তার তাণ্ডবে লালমনিরহাটে পথে বসেছে হাজারো পরিবার

পরের সংবাদ

সড়কে নেই ‘ডিজিটাল’ ছোঁয়া

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৫, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

** ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে ** বেহাল যানজটে নাকাল নগরবাসী ** কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসছে না **
দেব দুলাল মিত্র ও আজিজুর রহমান জিদনী : করোনা সংকট কাটিয়ে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হলেও যানজট ঢাকাবাসীর পথের কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি সড়কেই তীব্র যানজটে নাকাল হচ্ছে নগরবাসী। সমন্বয়ের অভাবে যানজট নিরসনে পরিকল্পনা ও মহাপরিকল্পনা কাজে লাগছে না। এক সময় বলা হলো ফ্লাইওভার নির্মাণ হলে যানজট সমস্যা কমবে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিচ্ছবি দেখা যায়নি। দিন যত যাচ্ছে, যানজট নিয়ে হতাশাও বাড়ছে। নগরবিদ, গবেষক, পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা দায়িত্বে রয়েছে সমস্যা সমাধানে তাদের সমন্বয়হীনতার কারণে রাজধানীর যানজট নিরসন হচ্ছে না। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য ডিজিটাল সিগন্যাল বসানো হলেও পুলিশ ম্যানুয়ালি হাতের ঈশারায় সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করছে। ফুটপাথ দখল ও পার্কিং ব্যবস্থাপনায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। চালকরা লাইন-লেন না মেনেই গাড়ি চালাচ্ছে, যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। এছাড়া দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের ঘুষ বাণিজ্যের কারণে চালকরাও বেপরোয়া হওয়ায় কোনো পরিকল্পনা যেমন কাজে আসছে না, তেমনি বিশৃঙ্খলাও কমছে না। এই পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে এই শহর অচল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম ভোরের কাগজকে গতকাল বলেন, আমরা রাস্তায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা করি। ট্রাফিক আইন মানার ক্ষেত্রে মানুষ বিশৃঙ্খল। পুলিশ সব সময় ট্রাফিক আইন মানানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ আইন মানছে না। রাস্তায় কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশকে জনগণ সহযোগিতা করছে না। এই শহরের রাস্তার অবস্থা দ্রুত পরিবর্তন হয়। সকালে এক রকম, বিকালে অন্যরকম। বারবার রাস্তার চরিত্র বদলায়। এক রাস্তার সিগন্যাল সিস্টেম অন্যদিকের রাস্তায় কাজ করে

না। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সিগন্যাল বাতি জ¦ালিয়ে সুষ্ঠুভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ট্রাফিক সিগন্যালের দায়িত্ব সিটি করপোরেশন ছাড়তে আগ্রহী নয়। তাছাড়া বেশির ভাগ ট্রাফিক সিগন্যাল অকেজো হওয়ার কারণে ট্রাফিক পুলিশকে হাতের ইশারায় সিগন্যাল দিতে হচ্ছে। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, ডিজিটাল সিস্টেমের সিগন্যাল লাইট লাগানো হোক, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশকে দিতে হবে। তাহলে যে রাস্তায় বেশি যানবাহনের চাপ থাকবে ও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হবে তা কন্ট্রোল রুম থেকে ট্রাফিক পুলিশ জেনে নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চলাচলের ব্যবস্থা করবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রবণতা সৃষ্টি করা, রাস্তার ডিজাইন করা, টার্নিং পয়েন্ট কীভাবে হবে তা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে। সবকিছু সমন্বয় করে রাস্তার চরিত্র বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. শিপন নেওয়াজ ভোরের কাগজকে বলেন, করোনার সময় সড়কে গণপরিবহন চলাচল প্রায় বন্ধ ছিল। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকেই সড়কের চেহারা আগের মতোই পরিলক্ষিত হচ্ছে। কারণ আমরা সিস্টেম সারানোর ব্যবস্থা করছি না। এখনো রাস্তার পাশে সার্ভিস রোড নেই, বিভিন্ন গতির গাড়ি চলছে সড়কে ও গণপরিবহন এখনো যুগোপযোগী করা যায়নি। মূলত সামগ্রিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করা না গেলে দুর্ঘটনা রোধসহ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ১১১টি সুপারিশ বাস্তবায়ন ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন গতকাল এ প্রতিবেদককে বলেন, সড়ক নিরাপদ রাখাসহ চলাচলের জন্য যুগোপযোগী রাখার মূল দায়িত্ব সরকারের। এ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সঠিকভাবে কাজ করে তাহলে অনেক কিছুই কিন্তু রোধ করা সম্ভব। আর তা না হলে এমন পরিস্থিতি চলতেই থাকবে। তবে এর সঙ্গে পরিবহন মালিক, চালক ও যাত্রীদেরও ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা যে সুপারিশগুলো অনেক দিন ধরেই করে আসছি তার বাস্তবায়ন করা না গেলে পরিস্থিতি উন্নয়ন সম্ভব নয়।
কী কারণে ঢাকার রাস্তায় এত যানজট- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বহুবিধ সমস্যাসহ চরম সমন্বয়হীনতা নজরে পড়েছে। পরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও যানজট নিরসনে খুবই জরুরি। এ লক্ষ্যে ২০১৩ সালে ঢাকার রাস্তায় ‘ডিজিটাল সিগন্যাল সিস্টেম’ স্থাপন করা হয়। কিন্তু তা কাজে আসেনি। পুলিশ ম্যানুয়ালি হাতের ঈশারায় সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করছে। ভুটান ও কম্বোডিয়ার কিছু রাস্তা ছাড়া উন্নয়নশীল কোনো দেশেই হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করার নজির নেই। কিন্তু ঢাকায় হাতের ইশারায় চলছে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ। সড়কে ডিজিটাল বাংলাদেশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ঢাকার রাস্তার ধারণক্ষমতা কতটা আছে, কত সংখ্যক যানবাহন চলতে পারবে অথবা ভারী যানবাহন চালানোর মতো চালক আছে কিনা, এসব না দেখেই চলাচলের অনুমতি দেয়া হচ্ছে- এটা যানজটের অন্যতম কারণ।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) যানজট কমাতে ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা, বনানী ও মহাখালী হয়ে উত্তরার হাউজবিল্ডিং এলাকা পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন নির্মাণ করে। বলা হয়েছিল এগুলো চালু হলে যানজট সহনীয় পর্যায়ে আসবে। কিন্তু তারপরও অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। এছাড়া নৌবাহিনী সদর দপ্তরের কাছের রাস্তা, বনানী ২৭ নম্বর রোড, বনানী কাকলী, বনানী ১১ নম্বর রোড, মহাখালী আমতলী মোড়, তেজগাঁও কোহিনুর মোড়, লাভ রোড মোড় এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ও সুষ্ঠু যানবাহন চলাচলের জন্য ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সহযোগিতায় রাইট টার্নিং (ডানে মোড়) বন্ধ রাখা হয়েছে। তারপরও যানজট কমছে না।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের কারণে মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কের এখন বেহাল দশা। এতে প্রায় অর্ধেক রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সংকীর্ণ রাস্তা ব্যবহার করেই যানবাহন ধীরগতিতে চলার কারণেও যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত সড়কে যানজট লেগে থাকে। একই সঙ্গে প্রায় সারা বছরই সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা তিতাস, ওয়াসা, বিটিআরসি, ডেসা, ডেসকো, সিটি করপোরেশন অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে। রাস্তা সংস্কারে মাসের পর মাস লেগে যায়। এখানে একটি সংস্থার সঙ্গে অন্যটির সমন্বয় ছাড়াই কাজ চলছে। যে যার মতো রাস্তা খুঁড়ে কাজ করে চলে যাচ্ছে। রাস্তা থাকছে বেহাল অবস্থায়। এসব রাস্তার পাশেই আবার যে যার মতো গাড়ি পার্কিং করছে। এই অবস্থায় রাস্তার ৭৫ শতাংশ বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন এবং বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক দলের নেতারা ঢাকার রাস্তায় পার্কিং ব্যবসা চালাচ্ছে। সিটি করপোরেশন রাস্তার অবস্থা যাচাই না করেই পার্কিংয়ের অনুমোদন দিচ্ছে। তখন পুলিশের আর কিছুই করার থাকে না। প্রধান সড়কের পাশে পার্কিংয়ের কারণে যানজট হচ্ছে। ফুটপথ দখল এবং রাস্তার ওপরের দোকান সরানোর উদ্যোগ বহু চেষ্টা করেও সফল হয়নি। সব এলাকার রাস্তা দখল হয়ে যাওয়ায় অর্ধেক রাস্তায় যানবাহন চলাচলের সুযোগ পায়। যে কোনো আধুনিক শহরে মোট আয়তনের ২০-২৫ শতাংশ রাস্তা থাকে। এই হিসাবে ঢাকায় মাত্র ৮ শতাংশ রাস্তা আছে। প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ রাস্তায় যানবাহন চলায় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। উপরন্তু বাসস্ট্যান্ড ও বাস টার্মিনাল ছাড়াও শহরজুড়েই রাস্তায় গণপরিবহনের চালকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো থামিয়ে রাখছে এবং যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে।
একই রাস্তায় বহুবিধ যানবাহন চলাচলের নজির ঢাকায় রয়েছে। বাস, মিনিবাস, ট্রাক, মিনিট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা, অ্যাম্বুলেন্স, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, ব্যাটারি চালিত মিশুক, রিকশা ভ্যান, ঠেলাগাড়ি, হিউম্যান হলার, লেগুনা ও কোনো কোনো রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ি চলে। ধীরগতি ও উচ্চ গতির এত যানবাহনের একত্রে চলাচলের ব্যবস্থা পৃথিবীর অন্য কোনো রাজধানী শহরে নেই। গতির তারতম্যের কারণেও ঢাকার সড়কগুলোতে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। পিক আওয়ারে ঢাকার রাস্তায় যানজটের কারণে দ্রুতগামী যানবাহনের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। একই সময়ে পায়ে হেঁটে চলার গড় গতিও ৫ কিলোমিটার।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতউল্ল্যা বলেন, রাজধানীর যানজট সমস্যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী পরিবহন সেক্টরের মানুষ। আমাদের গাড়িগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে। এতে আমরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হই। মিরপুর থেকে গুলিস্তান যেতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। এতে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। যানজট সমস্যা নিরসনে আমরা বিভিন্ন সময়ে সরকারের নেয়া উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে আসছি। সড়কে যানজট না থাকলে আমাদের গাড়িগুলো আরো সুন্দরভাবে চলাচল করতে পারবে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়