‘অপারেশন তিতাস’ থেকে ‘আলাল ও দুলাল’
আজম খান এক দ্বৈত মহাকাব্যের নাম
ফেরদৌস আরেফীন
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম
১৯৭১ সালে বাবার অনুপ্রেরণায় মাত্র ২১ বছর বয়সে আজম খান ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। ছবি: সংগৃহীত
ছিলেন একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, গেরিলা কমান্ডার, ক্রিকেটার, অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী; কিন্তু তাঁর সবচেয়ে পরিচিতি ছিল ‘পপগুরু’ বা ‘পপসম্রাট’ নামে। আজ ৫ জুন বাংলাদেশের পপ ও রক সঙ্গীতের কিংবদন্তি বীর মুক্তিযোদ্ধা আজম খানের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী।
পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান, যিনি আজম খান নামে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুর সরকারি কলোনির ১০ নম্বর কোয়ার্টারে জন্মগ্রহণ করেন পপগুরু। তিনি শুধু একটি প্রতিভার নাম নন, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তাঁর স্কুলজীবন শুরু হয় আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে, ১৯৫৬ সালে কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে, এবং পরে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগে পড়াশোনা শেষে ১৯৭০ সালে টিঅ্যান্ডটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। বাবা আফতাবউদ্দিন আহমেদের চাকরির সুবাদে তাঁরা কমলাপুরে স্থায়ী হন এবং সেখানেই আমৃত্যু বসবাস করেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’র সক্রিয় সদস্য হিসেবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণসংগীত প্রচার করেন আজম খান। ১৯৭১ সালে বাবার অনুপ্রেরণায় মাত্র ২১ বছর বয়সে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। প্রথমে পায়ে হেঁটে আগরতলা যান, সেখানে ভারতের মেলাঘর শিবিরে প্রশিক্ষণ নেন, তাঁরপর সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কুমিল্লার সালদায় ছিল তাঁর প্রথম সম্মুখযুদ্ধ। পরে দুই নম্বর সেক্টরের সেকশন ইনচার্জ হিসেবে ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন, যেখানে তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত হয় ‘অপারেশন তিতাস’। যুদ্ধকালীন একটি অভিযানে তা*র বাম কানে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। ‘পপগুরু’ আজম খান সেই পথিকৃৎদের একজন, যিনি একইসঙ্গে অস্ত্র ও গিটার দুটোতেই দক্ষ ছিলেন।
যুদ্ধ শেষে গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ও ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি প্রচারের পর ব্যাপক প্রশংসিত হন। ১৯৭৪-৭৫ সালে ‘রেল লাইনের ওই বস্তিতে’ গানটি দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই গানের কথার সূত্রপাত হয়েছিল রেললাইনের পাশের বস্তির এক অসহায় মায়ের অশ্রু দেখে। দেশের সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে নিজের গানের বিষয়বস্তু করেছিলেন তিনি।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গানের তালিকায় রয়েছে ‘আমি যারে চাইরে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘অ্যাক্সিডেন্ট’, ‘পাপড়ি’সহ অসংখ্য কালজয়ী গান। ১৯৯৯ সালের ৩ মে বের হয় তাঁর প্রথম সিডি।
এক সাক্ষাৎকারে কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, তাঁর আগের ও পরের প্রজন্মের অনেক শিল্পী আজম খান দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং দর্শক মাতাতে মঞ্চে এখনো আজম খানের গান গাইতেই হয়।
আজম খান শুধু গানই গেয়েছেন; তিনি বদলে দিয়েছেন বাংলা গানের ভাষা, পশ্চিমা ধাঁচের পপকে মিশিয়েছেন দেশীয় সুরে। তাঁর সহজ-সরল জীবনযাপন আর নাগালের সহজতা ভক্তদের মুগ্ধ করেছিল। তিনি ‘পপগুরু’, ‘পপসম্রাট’ নানা উপাধিতে ভূষিত, কিন্তু তিনি নিজে পছন্দ করতেন ‘আজম ভাই’ নামেই পরিচিত হতে।
বাংলাদেশের সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয় তাঁকে। ২০২৫ সালে, মৃত্যুর ১৪ বছর পর, তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে অন্তর্বর্তী সরকার। পাশাপাশি, কোকাকোলা গোল্ড বটল অ্যাওয়ার্ডসহ আরও নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১১ সালের ৫ জুন, ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৬১ বছর।
এখনো প্রতি বছর ৫ জুন অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী, বন্ধু-স্বজন মিলে স্মরণ করেন এই কিংবদন্তিকে। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে টেলিভিশন চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ আয়োজন, আলোচনা, স্মৃতিচারণ, আর তাঁর গান নিয়ে নানা অনুষ্ঠান হয়। ‘পপগুরু’ আজম খানকে ঘিরে প্রতিবছর শ্রদ্ধার এই আয়োজন যেন প্রমাণ করে- যে শিল্পী দেশের মাটি ও মানুষের গান গেয়েছেন, তিনি চিরকাল বেঁচে থাকেন ভক্তের হৃদয়ে।
আজম খানের জীবন এমন একটি প্রতীক, যেখানে অস্ত্রের জয়গান আর গিটারের সুর একসঙ্গে বেজে ওঠে। তিনি রণাঙ্গনের যোদ্ধা, আবার সংগীতাঙ্গনের বিপ্লবী। মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা কমান্ডার, তিনিই বাংলা পপসংগীতের অগ্রদূত। তিনি প্রমাণ করেছিলেন সত্যিকারের শিল্পীর পরিচয় তাঁর সৃষ্টিতে, আর সৃষ্টির মূল উৎস হলো দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা। আজম খানের মৃত্যুবার্ষিকীতে এই নিবেদন তাঁর অমূল্য অবদানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক: সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আজীবন সদস্য
