×

উদ্ভাবন

এআই দিয়ে তৈরি বিশ্বের প্রথম ভ্যাকসিন

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:০১ পিএম

এআই দিয়ে তৈরি বিশ্বের প্রথম ভ্যাকসিন

ছবি : সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিশ্বের প্রথম ভ্যাকসিন তৈরি করেছেন গবেষকরা। তাদের দাবি, এই ‘মৌলিকভাবে নতুন’ ধরনের টিকা একাধিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে সক্ষম এবং ভবিষ্যৎ মহামারী প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল জানিয়েছে, এই প্রথম কোনো ভ্যাকসিনের মূল উপাদান সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় নকশা করে মানুষের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছে।

টিকাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি সব ধরনের করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। এর মধ্যে কোভিড-১৯ এর বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট ছাড়াও প্রাণীদেহে থাকা এমন করোনাভাইরাস অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো ভবিষ্যতে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে নতুন মহামারীর কারণ হতে পারে।

গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও দলটি ইতোমধ্যে ফ্লু ও ইবোলার জন্য পৃথক টিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে।

সাধারণভাবে ভ্যাকসিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সংক্রমণ শনাক্ত করতে শেখায়, ফলে শরীর রোগের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। তবে কিছু ভাইরাস খুব দ্রুত রূপ পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটাতে সক্ষম। ফলে সময়ের সঙ্গে অনেক ভ্যাকসিন কার্যকারিতা হারায়। এ কারণেই কোভিড ও মৌসুমি ফ্লুর টিকা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হয়।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন হিনি বলেন, “আমরা সবসময় ভাইরাসের পেছনে ছুটছি। আমাদের লক্ষ্য হলো ভাইরাসের চেয়ে এগিয়ে থাকা এবং ভবিষ্যতের প্রাদুর্ভাব কিংবা মহামারীর আগেই সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা।”

তিনি বলেন, মহামারীর সময় ভ্যাকসিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে তখন নতুন ভাইরাসের জন্য সম্পূর্ণ নতুন টিকা তৈরি করতে হয়েছিল এবং ভাইরাসের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো হালনাগাদও করতে হয়েছে।

কীভাবে কাজ করে এই ভ্যাকসিন?

সাধারণত বিদ্যমান কোনো ভাইরাসের স্ট্রেইন ব্যবহার করে ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়। কিন্তু কেমব্রিজের গবেষকরা বিভিন্ন করোনাভাইরাসের জিনগত তথ্য সংগ্রহ করেন, যেগুলো সম্ভাব্য ভাইরাসজনিত হুমকি পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে আগে থেকেই নথিভুক্ত ছিল।

পরে এসব জিনগত তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এআই একটি ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’ তৈরি করে, যা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয় যাতে তা পুরো করোনাভাইরাস পরিবারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এমনকি ভাইরাস রূপান্তরিত হলেও বা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে নতুন সংক্রমণ ছড়ালেও এই সুরক্ষা কার্যকর থাকতে পারে।

অ্যান্টিজেন হলো ভ্যাকসিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা মূলত এটিকেই শনাক্ত ও আক্রমণ করতে শেখে।

আরো পড়ুন : এআইয়ের সম্পর্কে ভাঙছে সংসার

অধ্যাপক হিনি বলেন, এই প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কোনো অ্যান্টিজেন মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে। তার ভাষায়, এই প্রযুক্তি “আমাদের সবাইকে বিস্মিত করছে” এবং “মানবকল্যাণে এর সম্ভাবনা সত্যিই অসাধারণ”।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই প্রযুক্তির লক্ষ্য শুধু বর্তমানের ভাইরাস থেকে নয়, ভবিষ্যতে নতুন মহামারীর কারণ হতে পারে এমন ভাইরাস থেকেও মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। মহামারীর প্রস্তুতি নেওয়ার পদ্ধতিতে এটি একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

মানুষের ওপর পরীক্ষায় যা পাওয়া গেছে

বাদুড়কে করোনাভাইরাসের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই বিবেচনায় ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার লক্ষ্যও এই গবেষণার অংশ। প্রথম ধাপে ৩৯ জন মানুষের ওপর পরীক্ষাটি চালানো হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল ভ্যাকসিনটি নিরাপদ কি না তা যাচাই করা।

এ ছাড়া প্রায় ২০০ জনকে নিয়ে দ্বিতীয় একটি গবেষণা চলছে, যার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এটি কতটা কার্যকরভাবে প্রশিক্ষণ দিতে পারে, সে বিষয়ে আরো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

জার্নাল অব ইনফেকশনে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর ভ্যাকসিনটির প্রভাব এখন পর্যন্ত সামান্য দেখা গেছে। তবুও গবেষণাটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সল ফাউস্ট গবেষণার কিছু পরীক্ষা পরিচালনা করেছেন। তিনি বলেন, এআই-নির্ভর এই নকশার নিঃসন্দেহে সম্ভাবনা রয়েছে এবং এটি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ একটি অগ্রগতি।

তিনি বলেন, ভাইরাস যখন ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন সম্ভাব্য মহামারীর জন্য আগাম ভ্যাকসিন তৈরি করার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করছে।

ফ্লু, বার্ড ফ্লু ও ইবোলার টিকাও তৈরি হচ্ছে

কেমব্রিজের গবেষক দল বর্তমানে এমন একটি সার্বজনীন মৌসুমি ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়ে প্রাণীদের ওপর গবেষণা করছে, যা প্রতি বছর নতুন করে পরিবর্তন করার প্রয়োজন হবে না। এ ছাড়া তারা এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লুর টিকাও তৈরি করছে, যাতে ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লে তা মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।

গবেষকরা ভাইরাল হেমোরেজিক ফিভারের জন্যও একটি টিকা তৈরির পরিকল্পনা করছেন, যার আওতায় ইবোলার বিভিন্ন ধরন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বর্তমানে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে যে প্রাদুর্ভাব চলছে, তার জন্য এখনো কোনো কার্যকর টিকা তৈরি হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের পরিচালক অধ্যাপক অ্যান্ডি পোলার্ড এই গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও এর ফলাফলকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় তথ্য। মানুষ হয়তো আগে কল্পনাও করেনি যে এ ধরনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব।

তবে তার মতে, প্রকৃত মূল্যায়ন হবে মানবদেহে পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ফলাফলের মাধ্যমে। কারণ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরীক্ষাগারের ইঁদুরের তুলনায় অনেক বেশি জটিল এবং বিভিন্ন সংক্রমণের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠে।

তিনি বলেন, ভ্যাকসিন গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে। এআই ভবিষ্যতে অনুমান করতে পারবে কোনো ভ্যাকসিনের প্রতি শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে। ফলে টিকা তৈরির প্রক্রিয়া আরো দ্রুত হবে এবং অসংখ্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চের বৈজ্ঞানিক পরিচালক অধ্যাপক মারিয়ান নাইট বলেন, এআই-নকশাকৃত এই সুপার-অ্যান্টিজেনের সফল পরীক্ষা ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী ভাইরাস সুরক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি।

ব্রিটিশ বিজ্ঞানমন্ত্রী লর্ড ভ্যালান্স বলেন, এটি ব্রিটিশ বিজ্ঞানের আরেকটি সাফল্যের গল্প। গবেষণা দক্ষতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একত্র করে কীভাবে নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা যায়, এটি তার উজ্জ্বল উদাহরণ।

প্রথম মানব পরীক্ষায় ইতিবাচক ফলাফল পাওয়ায় গবেষকরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন উন্নয়ন ও সরবরাহ প্রক্রিয়াকে আরো দ্রুত ও কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

অটোরিকশায় পিকআপের ধাক্কা, মা-ছেলেসহ নিহত ৩

অটোরিকশায় পিকআপের ধাক্কা, মা-ছেলেসহ নিহত ৩

আমেরিকা যেতে চাইলে সোশ্যাল প্রোফাইল উন্মুক্ত থাকা চাই

আমেরিকা যেতে চাইলে সোশ্যাল প্রোফাইল উন্মুক্ত থাকা চাই

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস নদীতে পড়ে গেলেও প্রাণহানি হয়নি

মন্ত্রণালয় দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস নদীতে পড়ে গেলেও প্রাণহানি হয়নি

তীব্র গরমে বাড়ছে রক্তচাপ, যেভাবে স্বাভাবিক থাকবেন

তীব্র গরমে বাড়ছে রক্তচাপ, যেভাবে স্বাভাবিক থাকবেন

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App