নাসির-তামিমার বিয়েকাণ্ডে মামলা : অভিযোগ গঠনের আদেশ ৯ ফেব্রুয়ারি

আগের সংবাদ

ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন চূড়ান্ত : যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন তথ্য, আইসোলেশনের সময়সীমা ৫ দিনের বেশি চান বিশেষজ্ঞরা

পরের সংবাদ

আইভী পারলে অন্যরা কেন নয়?

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৬, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২৬, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সম্ভবত প্রত্যাশিত ফলই হয়েছে। তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করছেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী ছিলেন বিএনপি থেকে অব্যাহতি পাওয়া তৈমূর আলম খন্দকার। নির্বাচনে আরো ৫ প্রার্থী থাকলেও তারা সবাই মিলে যে ভোট পেয়েছেন, তার চেয়ে বেশি ভোটে জিতেছেন আইভী। আইভী জিতবেন না, সেটা চরম আওয়ামী লীগ ও আইভী বিদ্বেষী ছাড়া আর কেউ ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সম্পন্ন হয় তার জন্য নির্বাচনের সব অংশীজনের ভূমিকা ছিল ইতিবাচক।
২০০৩ সালে বিএনপি-জামায়াত আমলে পৌরসভা নির্বাচনে ৩৭ বছরের আইভী যখন প্রথম পৌরসভা নির্বাচনে বিজয়ী হন; তখন চুনকার মেয়ে, রাশিয়া ফেরত ডাক্তার, শহর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদিকা- এমনটাই ছিল নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে তার পরিচয়। ছিলেন নিতান্তই তৃণমূলের এক নেতা। কিন্তু এর মধ্যে ১৮ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। শীতলক্ষ্যায় বয়েছে অনেক পানি। নারায়ণগঞ্জেও ঘটেছে অনেক পরিবর্তন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিও নারায়ণগঞ্জে একমুখী নয়। সেখানে আইভীর পথচলাও মসৃণ ছিল না। প্রবল প্রতাপশালী ঘরের শত্রæ বিভীষণকে মোকাবিলা করেই তাকে চলতে হয়েছে। মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসাকে সম্বল করে দৃঢ় পায়ে হেঁটেছেন বলেই আইভী হয়েছেন নারায়ণগঞ্জবাসীর আস্তাভাজন। তিনি এবার বিজয়ের পর এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, নানামুখী ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হয়েছি, ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেছি। আপনারা আমার পাশে ছিলেন। এভাবে সব সময় পাশে থাকবেন।
দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যখন অনেকের মধ্যেই হতাশা, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পারা নিয়ে যখন মানুষের মনে সংশয়, সন্ত্রাস-সহিংসতা যখন নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন নারায়ণগঞ্জের সিটি করপোরেশন নির্বাচন হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে। এতটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ছিল প্রায় সবার কাছেই অপ্রত্যাশিত।
নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন নিয়ে রাজনীতি আগ্রহী অনেকের মধ্যেই নানা কারণে বাড়তি কৌতূহল থাকে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরোধ নতুন নয়। এখানে প্রভাবশালী ওসমান পরিবার ও চুনকা পরিবারের বিরোধও পুরনো। ১৯৭৩ সালে আলী আহমদ চুনকাকে পৌরসভা নির্বাচন বিজয়ী হতে হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল প্রার্থীকে পরাজিত করে। বাপকা বেটি আইভী ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল প্রার্থী ক্ষমতাধর শামীম ওসমানকে পরাজিত করে সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত বিজয়ী হয়ে তাক লাগিয়েছিলেন। গণতন্ত্রের পতাকাকে অগ্রসর করছেন। নারায়ণগঞ্জ সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত। সাত খুন, ত্বকী হত্যাসহ আলোচিত অনেক অঘটনের জন্ম হয়েছে নারায়ণগঞ্জে। কেউ কেউ এটা বলেন যে, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে আলো-অন্ধকারের দুই ধারাই পাশাপাশি বিরাজমান। আলো যত উজ্জ্বল, অন্ধকার ততই নিকষ কালো। কালোকে সরিয়ে আলো হাতে এগিয়ে চলছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। ২০১৬ সালে এবং এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভী আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমর্থন পেয়েছেন স্থানীয় সব বিরোধিতা সত্ত্বেও।
নারায়ণগঞ্জে আইভীর বিজয় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। ভালো প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কা এক হলে সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনেরও এই দলকে পরাজিত করা এখনো অসম্ভব। আওয়ামী লীগ হারে দলের ভেতরে ‘সাইজআপ’ করার অপসংস্কৃতি এবং একেবারে জনবিচ্ছিন্ন, মন্দ-নিন্দিত প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ায়। মনোনয়নে যদি গলদ না থাকে কিংবা সাইজআপ করার প্রবণতা যদি না থাকে, তবে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী জামানত হারায় কীভাবে?
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেখিয়ে দিয়েছে, আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা নির্বাচনে গলদ রয়েছে। এটা অবশ্য শুধু আওয়ামী লীগের নয়, সামগ্রিকভাবে আমাদের দেশের রাজনীতির সমস্যা। রাজনীতিকে অর্থ ও অস্ত্রের নর্দমা থেকে ঐতিহ্যের ভূমিতে টেনে আনার ক্ষেত্রের সমস্যা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার সমস্যা। আওয়ামী লীগের সাবেক জনপ্রিয় সাধারণ সম্পাদক, প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলতেন, আওয়ামী লীগ পাল্টালে দেশে পাল্টাবে। কথাটা কেবল বর্তমান বাস্তবতার কারণেই নয়, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সত্য। ধারণা করি বর্তমান সাধারণ সম্পাদক দলে ‘কাউয়া’ শব্দটা এ কারণ বিবেচনায় নিয়েই উচ্চারণ করে থাকেন। বাস্তবেই তা সত্য। স্বাধীনতার পর ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ও ক্যু-পাল্টা ক্যু, হত্যা-ক্যুয়ের ভেতর দিয়ে দেশের ত্যাগ ও সংগ্রামের গৌরবমণ্ডিত রাজনীতি যখন অর্থ-অস্ত্রের কাছে বন্দি হয়ে অনেকটাই নর্দমায় নিপতিত; তখন জাতীয় রাজনীতির মূল ধারার প্রধান দল আওয়ামী লীগ দেশের গণতন্ত্রকে উদ্ধারের পথ দেখাক, এটাই কি আইভীর বিজয়ের ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সামনের দিকনির্দেশনা নয়?
ভালো প্রার্থী, যোগ্য প্রার্থী বলতে কী বুঝায়, তাও কিন্তু আইভীর বিজয় দেখিয়ে দিল। সৎ ও জনদরদি হলেই ভালো প্রার্থী এমন একটা ধারণা রাজনীতির অঙ্গনে রয়েছে। এটা সর্বাংশে ঠিক নয়। এ দুই গুণের সঙ্গে প্রার্থীকে বাস্তববাদী, কার্যকর, দূরদর্শী, জনগণের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হতে হবে। আইভীর এসব গুণ থাকায় তার বিজয় সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের মনে তেমন সংশয় ছিল না। আইভী জনগণের সঙ্গে থাকেন এবং বোঝেন শহর ও শহরবাসী কী অবস্থায় রয়েছে এবং কোথায় নিয়ে যেতে হবে শহরকে, শহরবাসীকে। সেই সঙ্গে তার রয়েছে সাহস, ধৈর্য। তার হাত ধরেই নারায়ণগঞ্জ সিটিতে হয়েছে দৃশ্যমান উন্নয়ন। আইভী ব্যক্তিস্বার্থ পেছনে ফেলে অগ্রাধিকার দেন নিজ দলকে, শহরবাসীকে, দেশকে।
নির্বাচনী প্রচারের সময় আইভী কখনো এমন কোনো বক্তব্য দেননি যা উসকানিমূলক। পাওয়ার পার্টির নমিনি হয়েও তিনি ছিলেন একেবারেই সাধারণ ও স্বাভাবিক। উত্তেজনা তৈরি হয় এমন কোনো আচরণ তিনি করেননি। কাউকে ভয় দেখানো, হুমকি দেয়া তার রীতিবিরুদ্ধ। তিনি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মানুষ যাতে ভোটাধিকার প্রযোগ করতে পারে, সেটাই ছিল তার চাওয়া। মানুষের সঙ্গে থাকলেই মানুষের প্রতি আস্থা তৈরি হয়।
ভোটে জিতেও আইভী প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের সঙ্গে তিনি যে সৌজন্য দেখিয়েছেন, তাতে চমৎকৃত না হয়ে পারা যায় না। তৈমূর আলমের বাসায় মিষ্টি নিয়ে গেছেন, তাকে মিষ্টিমুখ করিয়ে বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে কাজ করতে গেলে তার কাছ থেকে পরামর্শ নেব। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা থাকবে।’ পরাজিত প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারও বলেছেন, ‘আপনারা সবাই আইভীকে সহযোগিতা করবেন। …আইভীর পাশে বিপদে-আপদে আছি।’ একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বর্ষীয়ান নেতা তৈমূর ভুল করেননি। মানুষের একাংশ তার সঙ্গেও আছেন। ভুল করেছে তার সাবেক দল ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বিএনপি।
বিএনপি মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে গণতন্ত্র চর্চার প্রমাণ পাওয়া যায় না। গণতন্ত্রের রীতিনীতির প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিএনপি প্রতিদ্ব›দ্বী দল আওয়ামী লীগের জন্য মাঠ ফাঁকা করে দিয়েছে। বিএনপি দলের প্রবীণ নেতা তৈমূর আলম খন্দকারের পাশে না দাঁড়িয়ে কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। একদিকে তাকে দলীয় বিভিন্ন পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে, আবার দল থেকে বহিষ্কারও করেনি। আশায় ছিল ‘যদি জিতে যান, তাহলেই বরণ’। তা না হওয়ায় ভোটের পর তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির এতসব নাটক সত্ত্বেও তৈমূর আলম খন্দকার প্রায় ১ লাখ ভোট পেয়েছেন। বিএনপির কমিশনার পদ পেয়েছে ১০টি। এভাবে পলায়ন মনোভাব দেখিয়ে বিএনপি শুধু সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, দেশের নির্বাচনী রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই কার্যত দুর্বল করছে। নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন থেকে বিএনপিরও অনেক কিছু শেখার আছে।
আমাদের দেশে একশ্রেণির পণ্ডিত আছেন যাদের ‘কিছু ভালো লাগে না’। সব কিছুর মধ্যে খুঁত খোঁজা তাদের স্বভাব। এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাহলে নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন কি সুষ্ঠু হয়নি? হয়েছে। কারণ এটা সরকার বদলের জাতীয় নির্বাচন নয়। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন যে ভূমিকা পালন করছে, জাতীয় নির্বাচনে তা করবে না বলে এরা মনে করেন। বিএনপির নারী সাংসদ রুমিন ফারহানা বলেছেন, ‘এই নির্বাচন যতটা না দলীয়, তার চেয়ে অনেক বেশি একটি বিশেষ গোষ্ঠী, পরিবার বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নির্বাচন। আইভী কোন প্রতীকে দাঁড়াচ্ছেন বা কোন দলের প্রার্থী হচ্ছেন তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটা প্রতীক হয়ে উঠেছেন। নিজের দলের অতি প্রভাবশালী সাংসদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান। এটাকে আমরা দলীয় নির্বাচন না বলে অনেকটা ব্যক্তি বনাম সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নির্বাচন বলতে পারি।’
যদি রুমিন ফারহানার বক্তব্য সত্য বলে ধরে নেয়া হয়, তাহলেও এই কৃতিত্ব তো আইভী এবং তার দলের। দল যদি সুযোগ না দিত তাহলে আইভী কি এই ‘প্রতীক’ হতে পারতেন? রুমিন এবং তার দল কেন কোনো মডেল তৈরি করতে পারে না? এ প্রশ্ন করাই যেতে পারে। আন্তরিক চেষ্টা থাকলে সারাদেশে নারায়ণগঞ্জ মডেল হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়