সিদ্ধান্ত পরিবর্তন : শতভাগ যাত্রী নিয়ে চলবে গণপরিবহন

আগের সংবাদ

উৎসব-উৎকণ্ঠার ভোট আজ : সবার দৃষ্টি নারায়ণগঞ্জে > আইভী-তৈমূরের লড়াইয়ে বাড়তি মাত্রা শামীম ওসমান

পরের সংবাদ

সামরিক শাসন ইসলামি পাকিস্তানকে বাঁচাতে পারেনি

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৫, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৫, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

দ্বিতীয় সামরিক আইন বলবৎ হয় ২৫ মার্চ ১৯৬৯-এ, যখন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তার নিজের সংবিধান রদ করে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খান জনদাবি মেনে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট পদ্ধতি বাতিল করেন এবং এক মানুষ এক ভোট নীতিমালার ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
জেনারেল ইয়াহিয়ার রাজত্বে সংবিধান প্রণয়নের কোনো চেষ্টা হয়নি। প্রত্যাশা ছিল, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদ গঠিত হবে। সেখানেই প্রণীত হবে সংবিধান। প্রস্তাবিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ৩০ মার্চ ১৯৭০-এ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার ঘোষণা করলেন। প্রস্তাবিত সংবিধানের মৌল নীতিমালা প্রকাশ করলেন এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের কাঠামো ও গঠনপ্রণালি জানিয়ে দিলেন।
১৯৭০-এর ডিসেম্বরে যুগপৎ জাতীয় ও পাঁচটি প্রাদেশিক পরিষদের (পূর্ব পাকিস্তান, পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। যে কোনো মানদণ্ডেই বিচার করা হোক না কেন ১৯৭০-এর নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলতেই হবে। সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ হয়নি। কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান না নিয়ে সরকার কঠোর নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করেছে। শাসকমণ্ডলীর সদস্যদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য করে রাখা হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নির্বাচনে কারচুপির যে অভিযোগ উঠেই থাকে, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে সে ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি।
কিন্তু অখণ্ড পাকিস্তানের প্রথম ও শেষ সাধারণ নির্বাচনের ফল জাতীয় ঐক্যের দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে রীতিমতো ধ্বংসাত্মক এবং এ ফল জাতীয় অখণ্ডতার প্রশ্ন ঢাক-পেটানো ব্যর্থতার শামিল। দেশে একটি রাজনৈতিক দলও ছিল না, যা একই সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উভয় অংশের মানুষের এতটুকু আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়েছে। দুটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল- পূর্ব পাকিস্তানে (এখন বাংলাদেশ) শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টির অধিকারী হয়; কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে একটি আসনও পায়নি। পশ্চিম পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোটের হার : পাঞ্জাবে ০.০৭, সিন্ধুতে ০.০৭, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে ০.০২ এবং বেলুচিস্তানে ১.০।
পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩৮ আসনের ৮১টি জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি অধিকার করে নেয়। বাকি ৫৭ আসনের ১৫টি পান স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এবং অন্য সব আসন সাতটি দলের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। সিন্ধু ও পাঞ্জাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতাসহ পাকিস্তান পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। রাজনৈতিক মিত্রদের নিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে এবং এককভাবেই মাওলানা মুফতি মাহমুদের জামিয়াত-উল-উলামা-ই-ইসলাম বেলুচিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো রাজনৈতিক দল এমনকি পিপিপিও পূর্ব পাকিস্তানে কোনো আসন পায়নি। এই নির্বাচনে ধর্মীয় প্রশ্ন কোনো ভূমিকা রাখেনি, যদি কোনো ভূমিকা থেকে থাকে তা অতি সামান্য। কোনো সন্দেহ নেই, পূর্ব পাকিস্তানে বিজয়ী হয়েছে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে সেখানকার জনগণের ঐক্য।
আওয়ামী লীগ ছয় দফার ভিত্তিতে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামে। এই দল প্রতিশ্রæতি দেয়, পূর্ব পাকিস্তানে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক শাসন নিশ্চিত করার জন্য বিরাজমান ফেডারেল পদ্ধতি পুনর্গঠন করবে। নতুন ফর্মুলায় পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি প্রদেশগুলোর জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দিলেও কেন্দ্রের কর্তৃত্ব এতটা বিলীন করতে ইচ্ছুক ছিল না। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও জামিয়াত-উল-উলামা-ই-ইসলাম এক হয়ে আওয়ামী লীগের দাবিকে সমর্থন জানায়। তারা তাদের প্রদেশ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের জন্য সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন চায়। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টির অধিকারী হয়, সংরক্ষিত আসনসহ ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭।
নির্বাচনের ফলাফলে একটি বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটে : ভোটারদের আঞ্চলিক সীমারেখা বরাবর সম্পূর্ণ বিভক্তি, পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমে রাজনৈতিক মেরুকরণ। রাজনৈতিকভাবে বলতে গেলে পাকিস্তানের তেইশ বছরের অস্তিত্বের ইতিহাসের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল দেশটিকে স্পষ্ট দুই ভাগ করে দেয়।
১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন রাজনৈতিক ক্ষমতার তিনটি কেন্দ্র স্পষ্ট দৃশ্যমান করে তোলে : (১) পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ (২) সিন্ধু ও পাঞ্জাবে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (৩) বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে ন্যাপ ও জামিয়াত। এই তিনের কেন্দ্রে সবার ওপরে আছে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী আর তাদের মুখপাত্র হিসেবে ইয়াহিয়া খান।
বাহ্যত মুজিবের অধিকতর আগ্রহ ছিল বাঙালিদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক এলিটদের প্রতি তার কোনো বিশ্বাস ছিল না। পাকিস্তানের প্রতি ভারতের লাগাতার ও সঙ্গতিপূর্ণ বৈরী মনোভাবকে ধন্যবাদ, পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে মুজিবের পরিকল্পনায় সহায়তা করতে তাদের সানন্দ সম্মতি ছিল।
অন্যদিকে ভুট্টোর আগ্রহ ছিল ক্ষমতা গ্রহণ। তা অখণ্ড পাকিস্তানেই হোক কী খণ্ডিত পাকিস্তানে- তাতে কিছু এসে যায় না। আসলে তিনি স্পষ্টই বুঝতে পেরেছিলেন, অখণ্ড পাকিস্তানে তার প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। জি ডব্লিউ চৌধুরীর মতে- ভুট্টোর সঙ্গে ১৯৭০-এর নির্বাচনের আগে ও পরে আলোচনায় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাকে যদি দুটি ‘পি’-এর মধ্যে একটিকে (পাওয়ার না পাকিস্তান) বেছে নিতে বলা হয় তিনি পছন্দ করবেন প্রথমটি। পাকিস্তানের ঐক্য ধরে রাখার চেয়ে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ২১ বার গানস্যালুট গ্রহণ করতে তার আগ্রহ ছিল বেশি।
১৯৭১-এর জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে দুজন আঞ্চলিক নেতা মুজিব ও ভুট্টো এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকারের মধ্যে সমঝোতা বৈঠক হয়। ত্রিপক্ষীয় দর কষাকষিতে একটি ফেডারেশন এমনকি কনফেডারেশন সংবিধান প্রণয়নের সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে নাকচ হয়ে যায়। বৈঠক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এখন এটা স্পষ্ট, ঢাকায় মুজিবের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠক ছিল একটি অন্তরাল তৈরি করে সেখানে আকাশপথে সৈন্য ও রসদ সরবরাহ করতে ইয়াহিয়া খানের জন্য সময় বের করে নেয়া- পরবর্তী সামরিক অপারেশনগুলো এটাই প্রমাণ করে।
লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের আওতায় পরিষদ অধিবেশন ডাকার কথা প্রেসিডেন্টের। অধিবেশন শুরু হলে ১২০ দিনের মধ্যে পরিষদ নতুন সংবিধান উপস্থাপন করবে অথবা পরিষদ বাতিল হয়ে যাবে। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিলেন, ৩ মার্চ ঢাকায় পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসবে। ততদিনে প্রধান দলগুলোর মধ্যে দ্ব›েদ্বর স্ফটিকীকরণ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরীহ জনগণের ওপর নির্মম সহিসংতা চালায়। বেসামরিক জনগোষ্ঠীর এ আইন অমান্য আন্দোলন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমর্থনে জাতীয় স্বাধীনতাযুদ্ধে পরিণত হয়। ফলে পাকিস্তানি বাহিনীকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ যুদ্ধবন্দি পাকিস্তানি সেনাসদস্যের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৯৩ হাজার। এভাবেই সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ একটি নতুন ও অপেক্ষাকৃত ছোট পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। মনোবল হারিয়ে, নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা অর্পণ করলেন। ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে শপথ নিলেন। পরবর্তী করণীয় কী হবে এ নিয়ে জেনারেলদের মধ্যে গভীর মতদ্বৈধতা দেখা দেয়। ইয়াহিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জেনারেলরা চেয়েছেন তিনি যেন কমান্ডার ইন চিফ জেনারেল আবদুল হামিদ খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করেন। অন্যদিকে সুযোগসন্ধানী জেনারেল যেমন- গুল হাসান, এয়ার মার্শাল রহিম খান ইয়াহিয়া খানকে বন্দুকের মুখে ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য করেছেন বলে গুজব রয়েছে- ভুট্টো এভাবেই হলেন পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম বেসামরিক প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট।
১৯৭১-এ পাকিস্তানের রাজনৈতিক পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় মূলত (১) স্থিতিশীল একটি রাজনৈতিক অবস্থা সৃষ্টিতে আবশ্যক জাতীয় সংবিধান প্রণয়নে ক্ষমাহীন বিলম্ব, (২) (সামরিকতন্ত্রের কাছে) গণতন্ত্রের ঢাকা পড়ে যাওয়া, (৩) পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে গভীরে প্রোথিত অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও দ্ব›দ্ব।
ডক্টর মুনিস আহমার লিখেছেন, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানকে তার পূর্বাঞ্চল হারাতে হয় যদিও বিরোধের বীজ অনেক আগেই বপন করা হয়েছিল। কেন পাকিস্তান টুকরো হয়ে গেল তা সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। যে বাঙালিরা পাকিস্তান আন্দোলনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছিল তারা কেন বিচ্ছিন্নতার পথ বেছে নিল সে ব্যাপারেও একই কথা। সামরিক অপারেশনের পর জিন্নাহর পাকিস্তানের খণ্ডীকরণ ঠেকানোর আশা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। দুই অংশের সম্পর্কে ভাঙন ও বৈরিতা থেকে একাত্তরের মার্চের ঘটনা প্রবাহ এবং পাকিস্তানের সহিংস ভাঙনের পর ৪৭ বছর (এখন ৫০) পেরিয়ে গেছে। পাকিস্তানের ভাঙন ত্বরান্বিত করতে একপক্ষীয় সিদ্ধান্তে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল করা অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে এ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ভাবনা প্রক্রিয়া (থট-প্রসেস) কী ছিল তা উত্তরহীন প্রশ্নই রয়ে যায়।
১৯৭১-এর জানুয়ারিতেই এটা বেশ স্পষ্ট হয়ে যায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব, সেনাবাহিনীর পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃত্ব কিংবা জুলফিকার আলী ভুট্টো সকলকে ধারণ করে সংকটের সমাধান কেউ চাননি। ছয় দফা নিয়ে অনমনীয়তার সূত্র ধরে সেনাশক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্তটি আরো অনেক আগেই হয়। সৈন্যবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ার একটি কন্টিনজেন্সি প্ল্যান তৈরি করা ছিল কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস এডমিরাল এস এম আহসান কিংবা পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান সেনা অপারেশনে সমর্থন দেননি, তারা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের ওপর জোর দেন। দুজনকেই একই কারণে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং ইয়াহিয়া সরকার লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর নিয়োগ করেন, বাকিটুকু ইতিহাস। সত্তরের নির্বাচনের ফলাফল সেই দ্ব›দ্বকে স্পষ্ট করে তোলে যা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে ভেঙে টুকরো দেয় যার মূল নিহিত বাংলায় ও পাঞ্জাবে। বাংলা ভোট দিয়েছে আওয়ামী লীগকে আর পাঞ্জাব পিপিপিতে সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রে নেতৃত্বে পাঞ্জাবিরা। এখানে ভুট্টোর ব্যাপক বিজয় আওয়ামী লীগকে জানিয়ে দেয় সামরিক বেসামরিক চক্র কখনো বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। আসলে পাঞ্জাব বাংলা দ্ব›দ্বই পূর্ব পাকিস্তানে গণযুদ্ধের সূচনা করে এবং এর ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
হামুদুর রহমান কমিশনকে দেয়া বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত পশ্চিম পাকিস্তানি বেসামরিক কর্মকর্তাদের মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফের কথায় : ১৯৭১-এর সেপ্টেম্বরে বেসামরিক গভর্নরকে গদিতে বসানো হয় আসলে দেশি ও বিদেশিদের চোখে ধুলা দেয়ার জন্যই। বেচারা ডক্টর মালিক ও তার মন্ত্রীরা ছিলেন কেবল শিখণ্ডী মাত্র। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা রয়ে যায় সেনাবাহিনীর হাতেই। নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম ছবিটা আমার মনে পড়ছে, যদিও মন্ত্রিসভার কেউ নন, তবুও গভর্নরের ডান পাশে সবচেয়ে দৃশ্যমান অবস্থানে রয়েছেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী।
পরবর্তী সময়ে এই মনোভাব আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে যখন ইয়াহিয়া খান উপনির্বাচনের ঘোষণা দিলেন। নির্বাচনে প্রার্থী কে হবেন তা ঠিক করলেন জেনারেল রাও ফরমান আলী। জেনারেল নিয়াজি ও তার অধস্তন সামরিক আইন প্রশাসকরা বেসামরিক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন স্তরে কাজের পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়ার যত বিবৃতিই দিন না কেন, তারাই আবার বলেছেন পূর্ব পাকিস্তানে বিশেষ অবস্থা বিরাজ করার কারণে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বিশেষভাবে অপরিহার্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে এবং প্রদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবনে।
পূর্ব পাকিস্তানের ২০৩ (এ) ব্রিগেডের কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার এম সলিমুল্লাহ কমিশনকে জানিয়েছেন, সেনা কর্মকর্তাদের ও সাধারণ সৈনিকদের দীর্ঘমেয়াদি মার্শাল ল’ ডিউটি তাদের পেশাগত মানকে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পাকিস্তান নৌবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডিং অফিসার রিয়ার অ্যাডমিরাল এম. শরিফ বলেন, ১৯৭১-এ পাকিস্তানের পরাজয়ের ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৯৫৮ সালে যখন সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে।
সৈন্যরা যখন নতুন দায়িত্ব নিয়ে রাজনীতি শেখার পাঠ গ্রহণ করতে শুরু করে ধীরে ধীরে তারা সৈনিকবৃত্তির কলাকৌশল ছাড়তে শুরু করে, সেই সঙ্গে শুরু করে সম্পদ অর্জন আর বাড়িয়ে চলে নিজেদের মর্যাদা। কমিশনকে একই কথা বলেছেন কমোডর আই এইচ মানিক (১৯৭১-এ চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান), ইস্টার্ন কমান্ডের আর্টিলারি ব্রিগেডিয়ার এস এস এ কাসিম, ৯ ডিভিশনের কর্নেল মনসুরুল মালিক এবং ইস্টার্ন কমান্ডের কর্নেল স্টাফ ইজাজ আহমদ।
হামুদুর রহমান কমিশন এই উপসংহারে পৌঁছে যে, মার্শাল ল’ ডিউটিতে ও বেসামরিক প্রশাসনে পাকিস্তান আর্মি দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করে এবং সেনাবাহিনীকে পেশাগত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ক্রমেই দুর্বল করে ফেলে। এমন সব লোভনীয় ব্যাপারে তারা জড়িয়ে যায় যে তাদের প্রশিক্ষণ গ্রহণের ও প্রদানের সময়ও তাদের থাকে না, পেশাগত বিষয়ে তাদের অনেকের আগ্রহ শূন্যের ঘরে নেমে আসে। রিয়ার অ্যাডমিরাল শরিফের মূল্যায়নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে ১৯৭১-এ পাকিস্তানের পরাজয়ের ভিত্তি রচিত হয় ১৯৫৮ সালে, যা বিচারপতি কায়ানির ভাষায়- পাকিস্তানের বীর সৈনিকদের নিজ দেশ জয়।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়