মাহমুদুর রহমান মান্না : খালেদা জিয়া এখন তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছেন

আগের সংবাদ

ওমিক্রন ঠেকাতে চার সুপারিশ

পরের সংবাদ

মুশফিকের অন্য রকম রেকর্ড

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৮, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৮, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক : রেকর্ড ভাঙা-গড়াই জগতের নিয়ম। রেকর্ড সৃষ্টি হয় ভাঙার জন্য। একজনের গড়া রেকর্ড আরেকজন ভেঙে দেবে এমন ঘটনা ক্রীড়াঙ্গনে ঘটছে নিয়মিত। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাজে পারফরম্যান্সের কারণে ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে দলে রাখা হয়নি মুশফিককে। রঙিন পোশাকে দলে জায়গা হারালেন সাদা পোশাকে পাকিস্তানের বিপক্ষে দলে জায়গা পেয়ে তামিমের রেকর্ড ভেঙে গড়ার সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলে ছিলেন টাইগার ব্যাটিংয়ে নির্ভরতার প্রতীক মুশফিকুর রহিম। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামকে নিজের জন্য অপয়া ভাবতেই পারেন মুশফিকুর রহিম। টেস্ট ক্যারিয়ারে চারবার নব্বইয়ের ঘরে আউট হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে তিনবারই চট্টগ্রামের সাগরিকার এই স্টেডিয়ামে। যার সবশেষটি হলো গতকাল
ইনিংসের ৯৩তম ওভারে শাহিন শাহ আফ্রিদির বলে আউটসাইড এজ থেকে পাওয়া বাউন্ডারিতে ৮৭ থেকে ৯১ রানে পৌঁছে গিয়েছিলেন মুশফিক। এরপর একের পর এক ডট খেলে টানা পাঁচ ওভারে আর রান করতে পারেননি তিনি। সেই ৯১ রানেই ১৪টি বল খেলেন মুশফিক।
দ্বিতীয় দিনে ৯৯তম ওভারে প্রথমবারের মতো আক্রমণে আসেন ফাহিম আশরাফ। তার করা পঞ্চম ডেলিভারিটি ছিল হালকা রাইজিং ইনসুইঙ্গার। যেটি ডিফেন্ড করতে গিয়ে লাগে মুশফিকের ব্যাটের বাইরের কানায়। বোলার-ফিল্ডারদের আবেদনে আঙুল তুলে দেন আম্পায়ার।
সঙ্গে সঙ্গে রিভিউ নেন মুশফিক। টিভি রিপ্লেতে দেখা যায় বল যখন মুশফিকের ব্যাট অতিক্রম করছিল তখন তার ব্যাট প্যাডের সঙ্গেও লেগে ছিল। কিন্তু আল্ট্রাএজে স্পাইক দেখা যাওয়ায় মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই বহাল রাখেন থার্ড আম্পায়ার গাজী সোহেল।
ফলে ৯১ রানেই থেমে যায় মুশফিকের ২২৫ বলের ইনিংস। ক্যারিয়ারে এর আগে ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৫, ২০১৩ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৯৩ ও ২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৯২ রান করে আউট হয়েছিলেন মুশফিক। এর মধ্যে ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল চট্টগ্রামেই। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের মালিক তামিম ইকবাল। সেই তামিম চোটের কারণে পাকিস্তানের বিপক্ষে চলমান চট্টগ্রাম টেস্টে নেই স্কোয়াডে। তাকে তাই ছুঁয়ে ফেলার সুযোগ ছিল মুশফিকুর রহিমের সামনে। কিন্তু তিনি সেটা কাজে লাগাতে পারেননি। সাদা পোশাকে ৬৪ ম্যাচ খেলা তামিম ১২৩ ইনিংসে করেছেন ৪৭৮৮ রান। বন্ধু তামিম থেকে ৯২ রান কম নিয়ে মুশফিক নেমেছিলেন এই ম্যাচে। টেস্ট ক্রিকেটে মুশফিকুর রহিমের অভিষেক ২০০৫ সালের মে মাসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ঐতিহাসিক লর্ডসে তিনি অভিষেকের প্রথম ইনিংসে ১৯ রান করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি করেন মাত্র ৩ রান। প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেতে অপেক্ষা করতে হয় ৫ বছর।
পাকিস্তানের বিপক্ষে সাগরিকার পাড়ে মাঠে নেমে যেভাবে ব্যাট হাতে দাপট দেখাচ্ছিলেন তিনি, তাতে মনে হচ্ছিল, গতকালই বুঝি রেকর্ডটা নিজের করে নেবেন তিনি। দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে অপরাজিত ছিলেন ৮২ রান করে। গতকাল দ্বিতীয় দিনের শুরুতেও খেলছিলেন নিখুঁতভাবেই। কিন্তু রেকর্ড ছোঁয়া থেকে এক রান দূরে থাকতেই করলেন ভুল, আর তাতেই সর্বনাশ। ফাহিম আশরাফের বলে খোঁচা দিলেন, তা গিয়ে জমা পড়ে উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ রিজওয়ানের হাতে। রিভিউ নিয়ে নষ্ট করলেন এরপর। তার ইনিংসটা শেষ হলো ৯১ রানে। রেকর্ড ছোঁয়া হলো না, তাতে অষ্টম টেস্ট সেঞ্চুরিটাও রয়ে গেল অধরাই।
৪ উইকেটে ২৫৩ রান নিয়ে দিন শুরু করে বাংলাদেশ গতকাল সকালে দুই ঘণ্টার মধ্যে ৭৭ রানেই ৬ উইকেট হারিয়ে অলআউট হয়ে গেল ৩৩০ রানে! শুক্রবার সেঞ্চুরি করা লিটন দাস গতকাল কিছুই করতে পারেননি, পারেননি সেঞ্চুরির আশা নিয়ে দিন শুরু করা মুশফিকুর রহিমও।
আরো একবার নব্বইয়ের ঘরে আউট হয়ে গেছেন মুশফিক, তাতে একটা তেতো রেকর্ডও হলো তার। টেস্টে বাংলাদেশের জার্সিতে মুশফিকের চেয়ে বেশি ‘নার্ভাস নাইনটিজে’ আউট হননি আর কোনো ব্যাটসম্যান!
শুক্রবার সেঞ্চুরি করা লিটন দাস গতকাল আর ১ রান যোগ করেই আউট হয়ে যান, দিনের ১২তম বলে। অভিষিক্ত ইয়াসির আলীও টেস্ট ক্রিকেটে নিজের প্রথম ইনিংসটি স্মরণীয় করতে পারেননি। আউট হওয়ার আগে ১৯ বলে ৪ রান করেছেন তিনি।
ক্রিজে তখন একমাত্র স্বীকৃত ব্যাটসম্যান বলতে মুশফিকুর রহিম, এর পাশাপাশি মেহেদী হাসান মিরাজকে ঘিরে যা আশা ছিল। পরশু ৮২ রান করে অপরাজিত থাকা মুশফিকের আরেকটি টেস্ট সেঞ্চুরির দিকেই তাকিয়ে ছিলেন মাঠে আসা দর্শক।
কিন্তু মুশফিকের শতকের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারতেন দুই পাকিস্তানি ফাস্ট বোলার হাসান আলী ও শাহিন শাহ আফ্রিদি। বিশেষ করে প্রেসবক্স প্রান্ত থেকে হাসানের দিনের প্রথম স্পেলটি ছিল এককথায় দুর্দান্ত। এই প্রান্ত থেকে শাহিনের চেয়েও বেশি সিম মুভমেন্ট পাচ্ছিলেন তিনি।
হাসান সাধারণত স্টাম্প বরাবর বল করেন। আজ কিছু বল অপ্রত্যাশিতভাবে নিচু হয়েও যাচ্ছিল। ব্যাটসম্যানদের মনে ভয় ঢোকানোর জন্য যা ছিল যথেষ্ট। ভালো লেংথ থেকে সিম মুভমেন্টে বল ভেতরে এনে লিটন ও ইয়াসিরকে আউট করেন হাসান।
তবে হাসান ও শাহিনের আগুনে বোলিংয়ের বিপক্ষে মুশফিক ছিলেন সাবলীল। হাসানের সিম মুভমেন্ট সামলেছেন, থামিয়েছেন শাহিনের ইনসুইং। মাথা তাক করা বাউন্সার ছেড়েছেন বলে চোখ রেখে। হাসান টানা ছয় ওভারের স্পেলে রান দিয়েছিলেন মাত্র ৭, উইকেট নিয়েছেন ২টি। ততক্ষণে এক-দুই রান ও শাহিনের ফুল লেংথের বলে ব্যাটের কানায় লেগে পাওয়া একটি চারে মুশফিক পৌঁছে গেছেন ৯১ রানে।
মুশফিকের সামনে তখন দুটি হাতছানি। আর ১ রান হলে তিনি বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডে ছুঁয়ে ফেলতেন তামিম ইকবালকে। আর ৯ রান হলে তো অষ্টম টেস্ট শতকই পেয়ে যেতেন। কিন্তু টাইগার ব্যাটিংয়ের নির্ভরতার প্রতীক মুশফিকের ইনিংস থামে ৯১ রানে।
নব্বইয়ের ঘরে মুশফিক এ নিয়ে আউট হলেন চতুর্থবার, যা টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল তিনবার নব্বইয়ের ঘরে আউট হন। সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার দুবার নব্বইয়ের ঘরে আউট হয়ে আছেন এই তালিকায়। নাসির হোসেন আর লিটন দাসও দুবার করে নব্বইয়ের ঘরে আউট হন। বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে তিনি সর্বপ্রথম লংগার সংস্করণটিতে পেয়েছেন ডাবল শতকের দেখা।
মুশফিক ছাড়াও টেস্টে টাইগার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ডাবল শতকের দেখা পেয়েছেন তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান। ২০১৩ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কার গলেতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ম্যাচটিতে মুশফিক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। ৩২১ বল খেলে ২০০ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। তার ওই ইনিংসে ২২টি চারের সঙ্গে একটি ছক্কার মার ছিল। এছাড়া একমাত্র বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে মুশফিক টেস্টে তিনটি ডাবল সেঞ্চুরির মালিক। এর পাঁচ বছর পর মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে টেস্ট ক্যারিয়ারে দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরির দেখা পান এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান।
২০১৮ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওই ম্যাচে ২১৯ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন তিনি। ৪২১ বল মোকাবিলা করে ওই ম্যাচে তিনি ১৮টি চার ও একটি ছক্কা হাঁকান। তার এই ইনিংসটি বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে টেস্টে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। তার পরে ২১৭ রান করে টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের ইনিংস সাকিব আল হাসানের। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২০১৭ সালে নিজের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি খেলেন টাইগার অলরাউন্ডার। আর তামিমের টেস্টে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস ২০৬ পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০১৫ সালে।
মুশফিকের তৃতীয় ও শেষ ডাবল সেঞ্চুরিটি আসে গত বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে একই মাঠ শেরেবাংলায় দ্বিতীয় বার ডাবল শতক তুলে নেন তিনি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওই ম্যাচে ২০৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন মিস্টার ডিফেন্ডেবল। ইনিংসে ৩১৮ বল মোকাবিলা করে ২৮টি বাউন্ডারি হাঁকান মুশফিক।
টেস্টে তিনটি ডাবল শতক ছাড়াও মুশফিকের চারটি শত রানের ইনিংস রয়েছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়