জনমুখী এক অনন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা
হো চি মিনের দেশে
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সেবিকা দেবনাথ, ভিয়েতনাম থেকে ফিরে : ভিয়েতনামে আমরা উঠেছিলাম হ্যানয় শহরের ‘বা দিন’ এলাকার একটি হোটেলে। আমাদের এক সফরসঙ্গী দেশ থেকে আসার সময় প্রয়োজনীয় একটি ওষুধ সঙ্গে নিতে ভুলে যান। তাই এখানে এসে প্রেসক্রিপশন হাতে বের হন ওষুধের খোঁজে। কাছে কোথাও ফার্মেসির হদিস পেলেন না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যা-ও একটা ফার্মেসি পেলেন সেখানে ওষুধ মিলল না। কারণ প্রেসক্রিপশনে ওষুধের জেনেরিক নাম উল্লেখ নেই। তিনি যখন হোটেলে ফিরলেন তখন আমরা দল বেঁধে হোটেলের লবিতে বসে আড্ডায় মশগুল।
ওষুধ পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে বললেন, আমাদের দেশে অলিগলিতে ওষুধের দোকান। এখানে মাইলখানেক হেঁটেও কোনো ফার্মেসি পাইনি। যে একটা ফার্মেসি পেলাম সেটা বেশ পরিপাটি ও আধুনিক। আমাদের দেশের মডেল ফার্মেসিও এর কাছে কিছু নয়। আমরাও যখন দল বেঁধে শহরের বিভিন্ন রাস্তায় হেঁটেছি তখনো বিষয়টি লক্ষ করেছি। সত্যিই আমাদের দেশের মতো এখানে-ওখানে গড়ে ওঠা হাসপাতাল-ক্লিনিক এই শহরে নেই। মুদি দোকানের মতো ফার্মেসিও নেই।
আমাদের ভিয়েতনাম সফরের পুরো প্যাকেজটি ছিল ভিয়েতনাম ট্যুর-২৪৭ কোম্পানি লিমিটেডের আওতায়। সেই কোম্পানিরই ট্যুরিস্ট গাইড টমি। নিজের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানান, স্বাস্থ্যবিমার জন্য প্রতি বছর ৬০ ডলার করে জমা দেন দেশটির কর্মজীবী প্রতিটি নাগরিক। দেশের ৬ বছরের কম বয়সি শিশু
ও সত্তরোর্ধ্ব বয়সিরা বিনামূল্যেই চিকিৎসা পান। বেসরকারি হাসপাতালও আছে। তবে ধনীরাই সেখানে চিকিৎসা নেন।
হ্যানয় শহরের বাসিন্দা অলিভার জুম ও হ্যা। তারা জানান, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খুবই ভালো। প্রায় প্রতিটি নাগরিকই স্বাস্থ্যবিমার আওতায়। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে দেশটির নাগরিকরা সন্তুষ্ট।
জানা যায়, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভিয়েতনামে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে স্বাস্থ্যবিমা কার্যক্রম। স্বাস্থ্যবিমার মাধ্যমে দেশটির মানুষ তাদের চিকিৎসাব্যয় নির্বাহ করে থাকে। ওই বিমার আওতায় ক্যানসার, কিডনি বিকল কিংবা এইচআইভি-এইডস, লিভারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসাব্যয়ও মেটানো
হয়। কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত ছিল ভিয়োতনাম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাফল্যের নেপথ্যে দেশটির জনমুখী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সরকারি তৎপরতা।
সামাজিক বিমার মাধ্যমে নাগরিকদের কল্যাণ নিশ্চিতে ভিয়েতনামের যে সফলতা তা কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন। ভিয়েতনামে সরকারি সফরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন এসব কথা বলেছেন বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে দেশটির বাংলাদেশ দূতাবাস।
জানা যায়, প্রায় ৩৩১ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে জনসংখ্যা ১০ কোটি। ১৯৮৫ পর্যন্ত ভিয়েতনামে স্বাস্থ্য পরিষেবা মিলত পুরোপুরি বিনামূল্যে। সরকারি ভর্তুকিতে। ১৯৮৬, দইমই (রিনোভেশন বা সংস্কার) কার্যক্রম চালু করে ভিয়েতনাম। পুরোপুরি বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থারও বদল হয়। জনস্বাস্থ্য নিয়ে শুরু হয় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ১৯৫৫ সালে দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবা কর্মীদের সম্মেলনে কমরেড হো চি মিন বলেছিলেন, ‘থাকতে হবে সৎ এবং ঐক্যবদ্ধ, ভালোবাসতে হবে রোগীদের এবং উন্নত করতে হবে দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রকে।’ এটি এখনো ভিয়েতনামের মূলমন্ত্র। ২০২১ সালে ভিয়েতনামের জনগণের ৯১ শতাংশ স্বাস্থ্যবিমার আওতায় সেবা পেয়েছে। বর্তমানে এটি প্রায় ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ বলে জানায় স্থানীয়রা। ভিয়েতনামে প্রায় দেড় হাজারের মতো হাসপাতাল আছে। এর মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ২শরও কম। জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছাড়াও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে।
ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে প্রায়ই উদাহরণ টানেন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সমাজতন্ত্রের মূলমন্ত্রই হচ্ছে, সব মানুষের সমঅধিকার, সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। এমন উদাহরণ কিউবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিউবা চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে ৫টি আদর্শ নিয়ে চলে। এগুলো হলো- যিনি মেডিকেলে পড়বেন তাকে একজন ভালো চিকিৎসক হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তার সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকবে। সেখানে প্রত্যেক চিকিৎসককে কমিউনিটিতে একজন নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়। স্বাস্থ্যকর্মীরা কমিউনিটি পর্যায় থেকে তথ্য নিয়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ভিয়েতনামের জনগণ সেদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখে। অথচ বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম প্রায় একই সময়ে স্বাধীন হয়েছে। ওরা যেভাবে এগিয়েছে আমরা তা পারিনি।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও ওষুধ উৎপাদনে ভিয়েতনাম বেশ আধুনিক উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনামের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেটিই করা হচ্ছে। একে আমরা এখন বলছি সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা। ভিয়েতনামে সেই ব্যবস্থা অনেক আগেই হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের মতো এত ওষুধের দোকান শুধু ভিয়েতনাম নয়, বিশ্বের আর কোথাও নেই।
স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, ভিয়েতনামে স্বাস্থ্যবিমার বিষয়টি সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমাদের দেশে তা নয়। কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারিভাবে এই সুযোগ রাখা হলেও সেটি ঐচ্ছিক। স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা থাকলে দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পেতে যে খরচ হয় তা অনেকাংশে কমে আসে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা নিতে যে পরিমাণ খরচ হয় এর ৭০ শতাংশের বেশি খরচ করতে হয় ব্যক্তি নিজের। এই ব্যয় কমানোর উত্তম বিকল্প ব্যবস্থা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিমা। ভিয়েতনাম তা পেরেছে। আমরা পিছিয়ে আছি। ভিয়েতনাম থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
