স্বপ্নজয়ের পদ্মা সেতুর নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

আগের সংবাদ

হাওর জনপদে স্বাস্থ্যসেবা ‘নেই’

পরের সংবাদ

শহীদ কামারুজ্জামানের ৯৯তম জন্মদিন আজ

প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৬, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক, রাজশাহী : জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের ৯৯তম জন্মদিন আজ। ১৯২৩ সালের ২৬ জুন বৃহত্তর রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমার বাগাতিপাড়া থানার মালঞ্চী রেলস্টেশন সংলগ্ন নূরপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পৈতৃক নিবাস রাজশাহী শহরের কাদিরগঞ্জ মহল্লায়। দাদা গুলাইয়ের জমিদার হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার (১৮৪৮-১৯৩৬) ব্রিটিশ আমলে একজন রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। পিতা আবদুল হামিদ মিয়াও (১৮৮৭-১৯৭৬) ছিলেন একজন বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সমাজসেবক। তিনি রাজশাহীতে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) ছিলেন।
এ এইচ এম কামারুজ্জামানও দাদা এবং পিতার আদর্শকে সামনে রেখে শৈশবেই অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। বাড়িতেই পিতৃব্য বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সমাজসেবক কবি মুহাম্মদ আব্দুস সামাদ সাহেবের কাছে তার বাল্যশিক্ষা শুরু হয়। তারপর তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তার এক ফুফা। হঠাৎ করেই তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে বদলি হয়ে যান। ফলে কামারুজ্জামানকেও তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ম্যাট্রিক পাসের পর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে অর্থনীতিতে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন কামারুজ্জামান। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ল’ পাস করেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের রাজশাহী জেলা শাখার সম্পাদক এবং ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালে তিনি বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া থানার চামরুল গ্রামের জোতদার আশরাফ উদ্দিন তালুকদারের কন্যা জাহানারা বেগমকে বিয়ে করেন।
১৯৫৬ সালে কামারুজ্জামান আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে তিনি দুবার মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থায় জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৬৭ তিনি সালে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা নির্বাচিত হন। আইয়ুব খান সরকারের নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবির সমর্থনে ১৯৬৯ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পুনরায় তিনি রাজশাহী থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে সারাদেশে অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করতে থাকে। এমন সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৫ সদস্য বিশিষ্ট দলীয় হাই কমান্ড গঠন করেন। এই হাই কমান্ডের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন কামারুজ্জামান।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার নিরীহ-নীরস্ত্র বাঙালি নিধনের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী লেলিয়ে দেয়, যা ইতিহাসে অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিচিত। এই কুখ্যাত গণহত্যার সময় পাকিস্তানি বাহিনী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এর আগেই তার দলের নেতাকর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলেছিলেন। তাই শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমেদ ও আরো কয়েকজন নেতাকে নিয়ে বগুড়া হয়ে কলকাতা চলে যান কামারুজ্জামান। সেখানে তার সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্যান্য নেতাকর্মীর দেখা হয়। ওখানেই সকলে মিলে সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। আর সবার সিদ্ধান্তে ১৯৭১ এর ১০ এপ্রিল গঠিত হয় প্রথম অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার এবং ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকা বৈদ্যনাথ তলায় (পরবর্তীতে মুজিবনগর) শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
নবগঠিত মুজিবনগর সরকারে কামারুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি অন্যান্য নেতারা ও মন্ত্রীবর্গসহ স্বাধীন দেশে ফেরত আসেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফিরে এলে সরকার পুনর্গঠিত হয়। সেই পুনর্গঠিত সরকারে তিনি ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে নতুন মন্ত্রিসভায় তিনি শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করলে তিনি বাকশালের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা করে ঘাতকরা। ওই সময় জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে কামারুজ্জামানসহ আরো জাতীয় তিন নেতাকে হত্যা করা হয়।
ব্যক্তি জীবনে শহীদ কামারুজ্জামান ছয় সন্তানের জনক। তার বড় ছেলে এডভোকেট এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনও পিতার মতই রাজনীতিতে জড়িত রয়েছেন। খায়রুজ্জামান লিটন বর্তমানে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র।
বিভিন্ন কর্মসূচি : জাতীয় নেতা শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের ৯৯তম জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে আজ বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশন আয়োজিত কর্মসূচিতে রয়েছে- সকাল ৯টায় শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে নগর ভবনের মসজিদে মাদ্রাসাছাত্রদের মাধ্যমে পবিত্র কুরআন খতম। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে নগর ভবন চত্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের মাজার চত্বরে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া। বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে শিশুদের নিয়ে নগর ভবনে কেক কাটা। বাদ জোহর নগর ভবনের ওয়াক্তিয়া মসজিদসহ মহানগরীর সকল ওয়ার্ডের মসজিদে বিশেষ দোয়া এবং মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সুবিধাজনক সময়ে বিশেষ প্রার্থনা। বেলা ২টায় হজরত শাহ্ মখদুম দরগা মাদ্রাসাছাত্রদের মাঝে খাবার পরিবেশন ও বিশেষ দোয়া। সন্ধ্যা ৬টার পর হতে মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের বর্ণাঢ্য জীবনের ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন।
রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের আয়োজনে সকাল ১০টায় কুমারপাড়াস্থ দলীয় কার্যালয় হতে র‌্যালিসহ শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের সমাধীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হবে। সকাল ১১টায় দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ। বিকাল ৫টায় সিএন্ডবি মোড়স্থ শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়