পরিকল্পনামন্ত্রী : দেশে রাজনীতিবিদের চেয়ে আমলাতন্ত্রের দাপট বেশি

আগের সংবাদ

শ্যামল দত্ত’র প্রত্যয় : চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যাবে ভোরের কাগজ

পরের সংবাদ

উন্নয়নের ধারায় দেশের অর্থনীতি : সব সূচকই ছিল ঊর্ধ্বমুখী > ঋণদাতা দেশের তালিকায় স্থান > নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যে চাপে অর্থনীতি

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

মরিয়ম সেঁজুতি : করোনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউয়ের উৎকণ্ঠা সামলে অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতি। চলতি বছর দারিদ্র্য মোচন, প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ, রেমিট্যান্স আর রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানে ইতিবাচক ধারায় ছিল। দ্রুত গতিতে এগিয়েছে মেগা প্রকল্প, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের কাজ। উদ্বোধনের অপেক্ষায় স্বপ্নের পদ্মা সেতু। অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর বেশিরভাগ ইতিবাচক অবস্থায় থাকায় সন্তুষ্টি নিয়েই বছর শেষ করার কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছর স্বস্তির অর্থনীতি কিছুটা চাপেও ছিল। বছরের মাঝামাঝি সময়ে ধরা পড়ে বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা। ই-ভ্যালি, ধামাকা, ই-অরেঞ্জ, কিউকম, আলেশা মার্টের মতো ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠান অতি মুনাফার টোপ ফেলে গ্রাহকের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বিদেশে পাচার করে। যদিও, প্রতারিত গ্রাহকদের আন্দোলন ও মামলায় ধরা পড়ে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা। তবে প্রতারকদের কাছে আটকে থাকা অর্থ ভুক্তভোগীরা কবে ফেরত পাবেন, সে খবর জানেন না কেউ।
খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যের কারণে চলতি বছর বেশ খানিকটা চাপে ছিল দেশের অর্থনীতি। এর মধ্যে চাল, তেল ও পেঁয়াজের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি উসকে দিয়েছে মূল্যস্ফীতিকে। পাশাপাশি লাগামহীনভাবে বেড়েছে ডলারের দাম। যার ফলে আমদানি পণ্যের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ ও জ¦ালানি তেলের মূল্য বেড়ে দেশের বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
২০২১ সাল ছিল ঋণখেলাপিদের অর্জনের বছর। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যাংক লোপাটের মাধ্যমে তাদের খেলাপি ঋণ ছাড়িয়েছে ১ লাখ কোটি টাকা। বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় ১৫ শতাংশ বাড়লেও তা লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৩ হাজার ৯৮ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
ঋণদাতা দেশের তালিকায় স্থান : এক সময় ঋণ পেতে মরিয়া ছিল বাংলাদেশ। দিন বদলেছে। এখন অন্য দেশকে ঋণ দিচ্ছে। সরকার বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে থাকা শ্রীলঙ্কাকে ২৫ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রæতি দেয়। এর মধ্যে আগস্টে পাঁচ কোটি ডলার ছাড় করে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪২৫ কোটি টাকা। এ ঋণছাড়ের মাধ্যমে প্রথম কোনো দেশকে ঋণ দিল বাংলাদেশ। অর্থাৎ ঋণদাতা দেশের তালিকায় এখন বাংলাদেশের নাম।
এগিয়ে চলছে মেগা প্রকল্প : স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কাজ প্রায় শেষ। মেট্রোরেলের কাজও এগিয়েছে দ্রুত গতিতে। পুরোদমে চলছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ি প্রকল্পের কাজ। এমন অগ্রাধিকার মেগা প্রকল্পগুলো বিশ্ব কাতারে আরো এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশকে। দেশের উন্নয়নমূলক এসব প্রকল্পের সুফল প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। সরকার আগামী বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের বাণিজ্যিক চলাচল শুরুর পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া একই বছরের জুনে পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হবে। এ দুটিসহ মোট আটটি মেগা প্রকল্পের অগ্রগতি প্রকাশ করে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, মেগা প্রকল্পগুলো চালু হলে দেশের সার্বিক চিত্র বদলে যাবে। মাথাপিছু আয় ও প্রবৃদ্ধি আরো বেড়ে যাবে। মেগা প্রকল্পগুলোর সুফল পেতে বার্ষিক উন্নয়ন

কর্মসূচিতেও (এডিপি) বরাদ্দ পর্যাপ্ত দেয়া হয়। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রকল্পগুলো তদারকি করা হচ্ছে।
এডিপিতে ১০টি বৃহৎ প্রকল্পে মোট ৫৪ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা পেয়েছে। এরপর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৬ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিতে (পিইডিপি-৪) ৫ হাজার ৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে মেট্রোরেল ৪ হাজার ৮০০ কোটি, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ ৩ হাজার ৮২৩ কোটি এবং পদ্মা সেতু ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পেয়েছে। করোনার সংক্রমণ ঠেকানোর লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতের বহুল আলোচিত দুটি প্রকল্পে ২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা টিকাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনাকাটায় খরচ হচ্ছে।
এডিপি বাস্তবায়ন : চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন বেড়ে হয়েছে ১৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। টাকার অঙ্কে পাঁচ মাসে খরচ হয়েছে ৪৪ হাজার ৬১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এই সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হার ছিল ১৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। করোনা সংকট কাটিয়ে এডিপি বাস্তবায়ন বেড়েছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।
করোনা সংকটের কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নে ছন্দপতন ঘটে। ধীরে ধীরে করোনা সংকট কমে যাওয়ায় আবারো চাঙ্গা হচ্ছে এডিপি বাস্তবায়ন। শুধু নভেম্বর মাসেই এডিপি বাস্তবায়ন অগ্রগতি বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। গত বছর একই সময়ে বেড়েছিল ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) রয়েছে। যা ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে ২০ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা বেশি।
রপ্তানি আয় রেকর্ড : করোনার ভাটা কাটিয়ে রপ্তানি আয় বাড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি প্রবৃদ্ধিও হচ্ছে। ইপিবির তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস (জুলাই-নভেম্বরে) ১ হাজার ৯৭৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, দেশীয় মুদ্রায় যা ১ লাখ ৬৮ হাজার ২১৫ কোটি টাকার সমান। এই আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৪ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে পণ্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৭৪৭ কোটি ডলার। অবশ্য শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ রপ্তানি বেশি হয়েছে। বরাবরের মতোই পণ্য রপ্তানিতে শীর্ষ স্থানে রয়েছে তৈরি পোশাক। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশ পোশাক খাত থেকে এসেছে।
আমদানির পালে হওয়া : করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় আমদানি ও রপ্তানি দুটোই বাড়ছে। তবে রপ্তানির তুলনায় আমদানি বাড়ছে দ্রুত। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে ৮১০ কোটি ৭০ লাখ ডলারের এলসি খুলেছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা) টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই এক মাসে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে এত বিপুল অঙ্কের বিদেশি মুদ্রা খরচ হয়নি। এর আগে গত অক্টোবর মাসে ৭৪২ কোটি ১৬ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল; যা ছিল এক মাসের হিসাবে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, সব মিলিয়ে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) টাকার অঙ্কে ৩ লাখ ৩ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকার এলসি খুলেছেন। গত অর্থবছরের তুলনায় যা ৫৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি।
রিজার্ভে টান : চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে জুলাই-নভেম্বর সময়ে এলসি খুলতে সবচেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রা খরচ হয়েছে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল কাপড় ও অন্য পণ্য আমদানিতে; সেটা ৫০৫ কোটি ৮০ লাখ (৫ দশমিক ০৫ বিলিয়ন) ডলার, গত বছরের একই সময়ের চেয়ে যা ৪৬ শতাংশ বেশি। আর এলসি খোলার এই হিড়িকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভেও টান পড়েছে। গত ৪ নভেম্বর এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১১৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৪৪ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যা ছিল সাত মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম।
বেশ কয়েক বছর ধরে রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। একের পর এক রেকর্ড হয়। করোনাকালে আমদানিতে ধীরগতি আর রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে গত ২৪ আগস্ট বাংলাদেশের অর্থনীতির এই সূচক ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে, যা ছিল অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নভেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের আকুর বিল পরিশোধ করতে হবে। তখন রিজার্ভ ফের কমে যাবে।
রাজস্ব আদায় : করোনা ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে চলতি বছরে আবারো রাজস্ব আদায়ে গতি পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ১ লাখ ২৬৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যা গত অর্থবছরের চেয়ে ১৩ হাজার ৭৩ কোটি টাকা বেশি। রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ১৫ শতাংশ। যদিও ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৩ হাজার ৯৮ কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে। প্রথম পাঁচ মাসে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও শুল্ক বিভাগ মিলিয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
বেড়েছে বিনিয়োগ : করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে দেশে সার্বিক বিনিয়োগ প্রস্তাব বেড়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এ বিনিয়োগ প্রস্তাব গত ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি। বিডা জানিয়েছে, দেশি-বিদেশি এই বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশে নতুন করে প্রায় ২৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে প্রায় ২০ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে।
মাথাপিছু আয় : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে দেশের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ২২৭ ডলার। নতুন হিসাবে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৩২৭ ডলার। বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, নতুন ভিত্তিবছরের হিসাবে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ২২৭ ডলার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫৫৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৩২৭ ডলার। ডলারের বর্তমান বাজার অনুযায়ী, মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে ২৯ হাজার ৪৩০ টাকা। ২০১৫-২০১৬ ভিত্তিবছর ধরে হিসাব করায় আগের কয়েক বছরের মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে।
এদিকে গতবারের মতো এবারো মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গত অক্টোবরে দেয়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২১ সালে চলতি মূল্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হবে ২ হাজার ১৩৮ ডলার। আর ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হবে ২ হাজার ১১৬ ডলার। এর মানে, দেশের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের নাগরিকরা ভারতের চেয়ে গড়ে বেশি আয় করেন।
প্রবাসী আয়ে ধাক্কা : পণ্য রপ্তানিতে গতি থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরেক খাত প্রবাসী আয়ে ধাক্কা লেগেছে। চার মাস ধরে প্রবাসী আয় টানা কমছে। গত নভেম্বরে যে প্রবাসী আয় এসেছে, তা গত ১৮ মাসের মধ্যে সর্বনি¤œ। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে অতিরিক্ত ২ শতাংশ প্রণোদনা বহাল রেখেছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গত নভেম্বরে প্রবাসী আয় এসেছে ১৫৫ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। গত ১৮ মাসের মধ্যে এটি সর্বনি¤œ। এর আগে ২০২০ সালের মে মাসে ১৫০ কোটি ৪৬ লাখ ডলার আয় এসেছিল। এর মাঝের মাসগুলোতে সব সময় প্রবাসী আয় বেশি ছিল। ২০২০ সালের জুলাইয়ে প্রবাসী আয় ২৫৯ কোটি ডলার ছাড়িয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে আয় কমেছে ৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাসী আয় এসেছিল ১৭২ কোটি ডলার। আর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আয় এসেছিল ২১৫ কোটি ১০ লাখ ডলার। আর নভেম্বরে সেটি কমে হয়েছে ১৫৫ কোটি ৩৭ লাখ ডলার।
নানা সুবিধায় বেড়েছে খেলাপি ঋণ : মহামারি করোনায় সৃষ্ট অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় ২০২০ সাল জুড়ে ঋণের কিস্তির এক টাকা শোধ না করলেও গ্রাহককে খেলাপি করতে পারেনি ব্যাংক। ফলে কাগজে-কলমে কমে যায় খেলাপি ঋণ। খাতার হিসাবে ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি ৬ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ নিয়ে শুরু হয় ২০২১ সাল। এ বছর আগের মতো সুযোগ দেয়া না হলেও অনেক ক্ষেত্রে ঢালাও সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিভিন্ন শিথিলতার আওতায় চলতি বছর একজন গ্রাহকের যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধের কথা, ডিসেম্বরের মধ্যে তার ২৫ শতাংশ পরিশোধ করলেও তাকে আর খেলাপি করা যাবে না। এরপরও বেড়েছে খেলাপিঋণ। প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৯ হাজার ২০৫ কোটি টাকায়। এখন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এটি। সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়ায় ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয় ১ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৮ দশমিক ১২ শতাংশ।
প্রণোদনা নিয়ে ‘নয়-ছয়’: করোনাকালে সংকট উত্তরণে সরকার বিভিন্ন খাতে মোটা অঙ্কের প্রণোদনা ঋণ দেয়। এখন পর্যন্ত ২৩টি প্যাকেজের আওতায় দুই দফায় আড়াই লাখ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঋণনির্ভর প্রণোদনা প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। মহামারিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এ প্যাকেজ নিয়েও অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও বেআইনিভাবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের অভিযোগ ওঠে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) জরিপ অনুযায়ী, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার অভাব, জবাবদিহির পাট চুকে যাওয়া ও দুর্নীতিবাজদের কারণে দেশের ৭৯ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই ঘোষিত ওই প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ পায়নি!
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংকটের বছর : লাগামহীন খেলাপি, নানা সংকট ও মূলধন ঘাটতিতে বছর পার করছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংক ২ লাখ ১৯ হাজার ২৯২ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। যার ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৪৪ হাজার ১৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এ উচ্চ খেলাপির জন্য নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।
ব্যাংকঋণমুখী সরকার : ঘাটতি মেটাতে সরকার এখন ব্যাংকঋণে ঝুঁকছে। জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার কম বিনিয়োগের কারণে চলতি অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত থেকে নেয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকগুলো থেকে ২২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২৬ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। সরকার চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় গত সেপ্টেম্বরে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্র ও প্রবাসী বন্ডের সুদের হার ১ থেকে ৩ শতাংশ কমানোর পর ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগকারী ও কোম্পানিগুলো সঞ্চয় স্কিমগুলোতে বিনিয়োগ কমিয়েছে। ফলে সরকারের ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে সঞ্চয় স্কিমগুলোতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা।
তিন খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে : ৩০ টাকা কেজি পেঁয়াজ একলাফে অক্টোবরে বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। দাম কমাতে শুল্কহার প্রত্যাহার করে সরকার। সে সময়ে দাম কিছুটা কমে এলেও বছরশেষে আবারো বেড়ে যায় এ পণ্যটির দাম। শুধু পেঁয়াজ নয়, তেল ও চালের ঊর্ধ্বমূল্য নিয়ে নানা আলোচনায় ছিল বছরজুড়ে। পেঁয়াজ, তেল ও চাল যেমন ভোক্তার নাভিশ্বাস তুলেছে, তেমনি অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যও ছিল লাগামহীন। এছাড়া চলতি বছর স্বস্তি ছিল না মুরগির বাজারেও। পাকিস্তানি কক বা সোনালি মুরগি, লাল লেয়ার মুরগির দামও ছিল বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সর্বশেষ নভেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এর আগের মাস অক্টোবরে ছিল ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। সে হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্থীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ শহরের চেয়ে গ্রাম এলাকায় পণ্যমূল্য বেশি।
চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে সরকার। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে এ লক্ষ্য ধরা ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু অর্থবছর শেষ হয় ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি নিয়ে। অর্থাৎ বাজেটের লক্ষ্যের চেয়ে খানিকটা বেশি ছিল গড় মূল্যস্ফীতি।
লাগামহীন বেড়েছে ডলারের দাম : বছরজুড়েই অস্থির ছিল ডলারের বাজার। বাড়তি চাহিদার কারণে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে মার্কিন ডলারের দাম। মান হারায় দেশীয় মুদ্রা ‘টাকা’। ২০২০ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু এরপর থেকে বড় ধরনের আমদানি-ব্যয় পরিশোধ করতে গিয়ে ডলারের সংকট শুরু হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ ডিসেম্বর ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যে লেনদেনের জন্য প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য দাঁড়ায় ৮৫ টাকা ৮০ পয়সায়। খোলাবাজার ও নগদ মূল্যে তা আরো বেশি ছিল। যারা ভ্রমণ করতে বিদেশে যাচ্ছেন তাদের ৯০ থেকে ৯২ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে ডলার। এমন পরিস্থিতিতে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ২০৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও পণ্য আমদানি বেড়েছে। এসব পণ্যের দায় ও আগের বকেয়া পরিশোধ করতে বাড়তি ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে। তাই দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা মজুত রয়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংকগুলোর চাহিদার বিপরীতে ডলার সরবরাহ করা হচ্ছে।
ইভ্যালিসহ ই-কমার্সের প্রতারণায় দিশাহারা গ্রাহক : করোনার মতো দুর্যোগকালে ঘরে বসে পণ্য পেতে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে বছর ঘুরতেই চলতি বছরে সবচেয়ে সমালোচিত খাত হিসেবে অবতীর্ণ হয় ই-কমার্স। ইভ্যালি, কিউকম, ধামাকাসহ বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণায় কোটি কোটি টাকা হারিয়ে পথে পথে ঘুরছেন গ্রাহকরা। এক্ষেত্রেও অনেকটাই ব্যর্থ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। শুরু থেকে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না করায় খাতটি বছরের সবচেয়ে বড় সংকটে পড়ে। যার মাশুল গুনতে হয়েছে গ্রাহকদের। পেমেন্ট গেটওয়েতে প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আটকে আছে। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ২১৪ কোটি টাকা ফেরতের উদ্যোগ নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে মামলার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানের গেটওয়েতে আটকা টাকা জানুয়ারি থেকে গ্রাহকরা ফেরত পাবে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
গত ১৫ ডিসেম্বর এসক্রো সার্ভিসে আটকে থাকা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর টাকা ফেরত দেয়া শুরু করতে পেমেন্ট গেটওয়েগুলোকে নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা থাকায় জটিলতায় পড়তে হয়। এই অর্থ ছাড়ের জন্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সব মামলার তথ্য সাতদিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে জানাতে পুলিশ সদর দপ্তরকে গত সপ্তাহে চিঠি দেয়। এসব তথ্য পেলে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে গ্রাহকের টাকা দেয়া শুরু হবে। সবচেয়ে আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির বিষয়টি হাইকোর্টের গঠিত কমিটি দেখভাল করছে।
সংকটে চামড়াশিল্প : ঢাকা থেকে সাভারের ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে স্থানান্তরের ফলে চামড়া কারখানাগুলো পুনরায় পুরোদমে উৎপাদনে যেতে দীর্ঘ সময় নিয়েছে। দেশীয় চামড়া রপ্তানিযোগ্য মান অর্জন করতে না পারার পাশাপাশি সিনথেটিক ও ফেব্রিক দিয়ে উৎপাদিত জুতা, ব্যাগ, মানিব্যাগ, বেল্ট, জ্যাকেটের ব্যবহার বাড়ায় সংকটের মধ্যে পড়েছে দেশের চামড়াশিল্প।
আবার দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়া সত্ত্বেও চামড়াশিল্প পোশাক-শিল্পের তুলনায় কম সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। ফলে এ খাত থেকে কাক্সিক্ষত রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ মানুষ জড়িত। সরকার এ শিল্পের উন্নয়নে বেশকিছু পদক্ষেপ নিলেও গতবারের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এ বছরও ঈদুল আজহায় কুরবানির পশুর চামড়া নিয়ে সংকট তৈরি হয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়