পরিকল্পনামন্ত্রী : দেশে রাজনীতিবিদের চেয়ে আমলাতন্ত্রের দাপট বেশি

আগের সংবাদ

শ্যামল দত্ত’র প্রত্যয় : চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যাবে ভোরের কাগজ

পরের সংবাদ

আলোচিত শীর্ষ দশ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

স্ব স্ব ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখে বছরজুড়ে বিভিন্ন সময়ে যারা জনতার জল্পনা-কল্পনা ও আলাপ-আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছেন, তাদের সংখ্যা নেহায়েত অল্প নয়। তথাপি সীমিত পরিসরে এখানে আমরা তুলে ধরছি স্বদেশ-বিদেশে আলোচিত-সমালোচিত শীর্ষ দশ নাম।
শেখ হাসিনা : উন্নয়নের রূপকার
বিগত প্রায় এক দশকের বেশি সময়ের ধারাবাহিকতায় গেল বছরটিও তার সবল নেতৃত্বে বড় বড় বাধা অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। কোভিড-যুদ্ধে শক্ত হাতে দেশকে নেতৃত্বে দিয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার নি¤œতম পর্যায়ে ধরে রাখেন তিনি। অর্থনীতির অচলাবস্থায় ভুক্তভোগী মানুষের সহায়তা প্রণোদনা সহায়তা অব্যাহত রাখেন তিনি এ বছরও। করোনা মহামারির মধ্যেও কঠোর স্বাস্থ্যবিধির আওতায় দেশের মেগাপ্রকল্পগুলোর কার্যক্রম চালু রাখেন। ২০০৮ সালে নির্ধারিত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল এ বছর। তার দূরদর্শী নেতৃত্বে প্রায় শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয় এ বছর। বৈশ্বিক সংস্থাগুলো করোনার কারণে দারিদ্র্য ও মৃত্যুও আশঙ্কা জানালেও তাদের ভয় অমূলক প্রমাণ করে উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতি ধরে রাখে তার সরকার। মুজিব জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে ইউনেস্কোতে বঙ্গবন্ধুর নামে সৃজনশীল পুরস্কার প্রবর্তন তার সাফল্যের খাতায় এক অনবদ্য মাইলফলক।
খালেদা জিয়া : এই তো জীবন
গত বছর মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে কারাবন্দি দশা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয় বর্তমান সরকার। সেই থেকে বাসা আর হাসপাতাল ছুটোছুটি করেই মূলত দিন কেটেছে তার। বছরভর আলোচনায় ছিল তার অসুস্থতা। তিনি প্রায় অচল হওয়া সত্ত্বেও তাকে নিয়ে বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয় তার দল বিএনপি। সর্বশেষ তার চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশ পাঠানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া হাজির করে আন্দোলনে নেমেছে তার দল। যদিও সরকার বলছে, আইনি উপায়ে খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার কোনো উপায় নাই।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় : লোকরঞ্জনে বাজিমাত
প্রতিপক্ষ যতই শক্তিধর হোক, মমতা ব্যানার্জি এ বছর প্রমাণ দিলেন যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনীতিতে তিনি এখনো অপরাজেয়। মমতার রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং জয়টি তিনি অর্জন করেন এই বছরে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের আসন ৩৪ থেকে কমে ২২ হয়ে যায় আর বিজেপির আসন ২ থেকে বেড়ে হয় ১৮। সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন মমতা। কিন্তু রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মন জয় করে সেই বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে ২০২১-এ ঘুরে দাঁড়ান মমতা। এবং অতীতের মতো জাতীয় স্তরে নিজেকে তুলে ধরতে উঠেপড়ে লাগলেন। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে প্রায় কোনো চ্যালেঞ্জই নেই, সেটা গত বিধানসভা এবং সদ্য সমাপ্ত কলকাতা পৌর করপোরেশনের নির্বাচনেও পরিষ্কার বোঝা গেছে।
জো বাইডেন : তালেবান চপেটাঘাত
মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য খুব একটা আনন্দের ছিল বছরটি, বলা যায় না। তার আমলেই সবচেয়ে বড় চপেটাঘাত হজম করতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। বিশ বছর ধরে অত্যাধুনিক অস্ত্রের জোরে দমিত রাখা তালেবান বাহিনী ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠে এ বছর। ১৫ আগস্ট ‘কল্পনার চেয়ে দ্রুতগতি’ অভিযান চালিয়ে কাবুল দখলে নেয়। তালেবান আতঙ্কে মহাবিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে সেখানকার ক্ষমতাসীন পশ্চিমা পুতুল সরকার ও তার হোতা মার্কিন বাহিনী। রাতারাতি কাবুল থেকে নিজেদের সেনা আর সমর্থকদের অপসারণ করতে গিয়ে হৃদয়বিদারক মানবিক বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষদর্শী হতে হয় বিশ্বকে। তবে করোনাযুদ্ধে প্রশংসিত

হয় তার গৃহীত পদক্ষেপ। পূর্বসূরি ট্রাম্প প্যারিস জলবায়ু চুক্তি খারিজ করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রকে আবারো সেখান থেকে জলবায়ুর বিরুদ্ধে লড়াকু বিশ্বের কাতারে নিয়ে আসেন দেশকে। চীনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পাশাপাশি বৈরিতা অব্যাহত রাখেন। বছরের মাঝনাগাদ অস্ট্রেলিয়া এবং ব্রিটেনকে নিয়ে অকাস চুক্তি করলে তাদের জোট থেকে আরেক মিত্র ফ্রান্সের ছিটকে পড়ার উপক্রম হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সামাল দেয়া সম্ভব হয় সে পরিস্থিতি। বছরের শেষে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেন সীমান্তে সেনা সমাবেশ নিয়ে ফের বিরোধে জড়িয়ে গেছেন বাইডেন। আপাতত পারস্পরিক হুমকি-ধামকির মধ্যেই সীমিত রয়েছে এই রণ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প : গদি পাগলা বুড়ো
২০২০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সুনিশ্চিত পরাজিত হওয়ার পরও ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ আনেন। আদালতে মামলা করার চেষ্টা করেন। যেনতেন উপায়ে গদি বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কূলকিনারা না পেয়ে জানুয়ারি মাসের ছয় তারিখে, নবনির্বাচিত বাইডেনের শপথ নেয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে দেশটির পার্লামেন্ট ভবন ক্যাপিটল হিলে গুণ্ডা সমর্থকদের লেলিয়ে দেন। ক্যাপিটলে হামলার ঘটনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, পুরো বিশ্বকেই হতবাক করে দেয়। নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে অভিনন্দনও জানাননি ট্রাম্প। বিশ্বের ছিছিক্কারে পড়ে যান ট্রাম্প। নিষিদ্ধ হন টুইটার-ফেসবুকে। তার বিরুদ্ধে অভিশংসনসহ বেশ কয়েক দফা আইনি ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তার এসব ‘পাগলামি’ এক প্রকার ক্ষমা করে দেয়ারই সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সরকার। বছরের বাকি সময় খুব একটা উচ্চকিত হতে দেখা যায়নি তাকে।
অং সান সুকি : আমি বন্দি কারাগারে
বছরটি মর্মান্তিক ছিল শান্তিতে নোবেলজয়ী মিয়ানমারের অবিসংবাদিত নেত্রী অং সান সুকির জন্য। বছরটা শুরু হয়েছিল যদিও অনেক স্বপ্ন নিয়ে। নির্বাচনে ৮৩ শতাংশ রায় নিয়ে জিতেছে তার দল এনএলডি। ‘বিতর্কিত’ রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করার কাজটিও সারা। আন্তর্জাতিক আদালতকে ‘এটা সেটা’ বুঝ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব অর্জনের মধ্যেই আচমকা চোখের পর্দা উল্টে দিয়ে, এতদিনের সহযোগী শক্তি, তাতমাদউ নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী বন্দুকের মুখে তার সাধের গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে ক্ষমতা কেড়ে নিলো। এরপর নতুন এক প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হলো দেশটিতে। নিজের দলের শীর্ষ নেতাসহ তাকেও মেনে নিতে হলো বন্দি জীবন। সর্বদর্শী বিশ্বের নাকের ডগায় বসেই জান্তা সরকার একের পর এক হাস্যকর মামলা দিয়ে এক প্রহসনের বিচার শুরু করল তার। ইতোমধ্যে দুটি মামলায় চার বছরের সাজা হয়েছে তার। সুরাহার অপেক্ষায় তালিকায় রয়েছে আরো প্রায় এক ডজনের বেশি মামলা। সবগুলো মামলায় সাজা হলে এই শতক পুরোটাই কারাবন্দি থাকতে হতে পারে তার।
মুরাদ হাসান : আক্কেল সেলামি
বছরশেষের দিকে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। এর আগে ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। আগেও সংবিধান নিয়ে মন্তব্যের কারণে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তিনি। বিএনপি নেতা তারেক জিয়ার কন্যা জায়মাকে নিয়ে নোংরা মন্তব্য করে নিন্দিত হন। এরপরই টেলিফোনে দেশের একজন শীর্ষ চিত্রনায়িকার সঙ্গে তার অশালীন ভাষার আলাপন ফাঁস হয়ে গেলে গণমাধ্যমে ধিক্কারের বন্যা শুরু হয়। হাইকমান্ডের ত্বরিত সিদ্ধান্তে তার মন্ত্রিত্ব ঘুচে যায়। ক্ষমতা-ইজ্জত সব হারিয়ে দেশ ছেড়ে কানাডায় রওনা দেন তিনি। কিন্তু গণধিক্কারের মুখে সেখানেও ঢুকতে গেলে বাধার মুখে পড়েন তিনি। বর্তমানে দেশেই অবস্থান করছেন।
জাহাঙ্গীর আলম : কূলহারা কলঙ্কিনী
গাজীপুরের নন্দিত এই মেয়র নিন্দিত হন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বেফাঁস কটূক্তির জেরে। তার করা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত একটি আপত্তিকর মন্তব্যের ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হয়ে গেলে নিজের এলাকায় আওয়ামী কর্মী ও সমর্থকদের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় তাকে। অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকমান্ড থেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে মেয়র পদ থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। পরবর্তী দলীয় সভা সিদ্ধান্তে আজীবনের জন্য তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। আম ও ছালা দুটি বস্তুই খুইয়ে বর্তমানে নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন তিনি।
পরীমনি : আইনের গ্যাঁড়াকলে
অভিজাত বোট ক্লাবে মদ্যপান পরবর্তী ঘটনাবলির জেরে শীর্ষ চিত্রানয়িকা পরীমনি কতিপয় শিল্পপতির সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ আনেন। রাজধানীর বনানী থানায় পুলিশ প্রথমে তার অভিযোগ নিতে রাজি না হলেও পরে পরীমনি ফেসবুকে ওই ঘটনার বিষয়ে একটি স্ট্যাটাস দিলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠে যায়। পরে পুলিশ পরীমনিকে ডেকে বনানী থানায় তার অভিযোগ জমা নিয়ে সাভার থানায় মামলা করে। সাভার পুলিশ অভিযুক্ত শিল্পপতিকে গ্রেপ্তার করে। এসব ঘটনার বেশ কয়েকদিন পর পরীমনির বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মদের বোতল ও মাদকসামগ্রী উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আদালতে হাজির করা হলে সেখান থেকে বেশ কয়েকদিনের জন্য তার ঠাঁই হয় কাসিমপুর কারাগারে। অবশ্য পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর বিপুল সংবর্ধনায় তাকে বরণ করে নেয় ভক্তকুল।
মামুনুল হক : শয়তানের ধোঁকা
বছরের মাঝামাঝি চাঞ্চল্যকর ঘটনার জন্ম দেন হেফাজত-ই-ইসলামির প্রভাবশালী শীর্ষ নেতা মামুনুল হক। বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর নিয়ে একটি জোরদার আন্দোলন উসকে দিচ্ছিলেন। বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন সারা দেশে। একের পর এক কর্মসূচি দিচ্ছিলেন ঢাকায়। আচানক তিনি পরস্ত্রী নিয়ে নারায়ণগঞ্জের একটি বিনোদন রিসোর্টে অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত অবস্থায় সাংবাদিক ও পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেলেন। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে মামুনুলের অনুসারীরা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে মোহাম্মদপুরের একটি মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গণমাধ্যমে তার কাণ্ডকীর্তি ছড়িয়ে যাওয়ার পর দলের কমান্ড কাউন্সিল থেকে তাকে অপসারণ করা হয়। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটে রাতারাতি। সবকূল হারিয়ে আপাতত কারাবন্দি জীবন কাটছে তার।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়