আজ মাদারীপুর রায়পুরা ও ঘাটাইল মুক্ত দিবস
প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাগজ ডেস্ক : মাদারীপুর, নরসিংদীর রায়পুরা ও টাঙ্গাইলের ঘাটাইল মুক্তদিবস আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে তাড়িয়ে এসব স্থানে বিজয় পতাকা উড়িয়ে দেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। দিবসটি পালন উপলক্ষে ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট-
মাদারীপুর : ১৯৭১ সালের এই দিনে সদর উপজেলার সমাদ্দার ব্রিজের কাছে একটানা ৩৬ ঘণ্টা সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে মাদারীপুর হানাদারমুক্ত হয়। এ সংবাদ মুক্তিকামী মানুষের কাছে পৌঁছালে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো জয়বাংলা স্লেøাগান দিয়ে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসে আনন্দ উল্লাস করে। যুদ্ধে শহীদ হন মাদারীপুরের সর্ব কনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা সরোয়ার হোসেন বাচ্চু।
জানা গেছে, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে জেলার সবকটি থানা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। এ কারণেই হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা মাদারীপুর শহরের এ আর হাওলাদার জুট মিলের অভ্যন্তরে ও নাজিমউদ্দিন কলেজে অবস্থান নেয়। মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে তাদের ঘিরে রাখে। ৮ ডিসেম্বর দুপুরে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক আবদুল মতিনের ড্রাইভার আলাউদ্দিন কলাগাছিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে সংবাদ পৌঁছে দেয় যে, ৯ ডিসেম্বর ভোর রাতে পাকিস্তান বাহিনী মাদারীপুর থেকে ফরিদপুরের উদ্দেশে পালিয়ে যাবে। এ সংবাদ পেয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের ৩ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা বর্তমান সদর উপজেলার ঘটকচর থেকে সমাদ্দার ব্রিজের পশ্চিমপাড় পর্যন্ত মহাসড়কের দুপাশে প্রায় ৪ কি.মিজুড়ে অবস্থান নেয়। ৯ ডিসেম্বর ভোর ৫টায় হানাদার বাহিনী গোলবারুদ, অস্ত্র ও কনভয়সহ তাদের বাঙালি দোসর রাজাকার, আলবদর, আলসামস ও মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে ঘটকচর ব্রিজ পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের তাড়া খেয়ে হানাদার বাহিনী দ্রুত গাড়ি চালাতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা একটি কনভয় থেকে নেমে কভার ফায়ার করতে করতে আরো দ্রুত সব গাড়ি নিয়ে এগুতে থাকে। এ সময় হানাদার বাহিনীর ফেলে যাওয়া কনভয় থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে নেয়।
সমাদ্দার ব্রিজে ৯ ডিসেম্বর সারাদিন সারা রাত এবং ১০ ডিসেম্বর সারাদিন সম্মুখযুদ্ধ চলে মুক্তিযোদ্ধা ও হানাদার বাহিনীর মধ্যে। তুমুল যুদ্ধের এক পর্যায়ে হানাদার বাহিনীর গোলা-বারুদ স্তিমিত হয়ে আসলে ১০ ডিসেম্বর বিকালে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে হ্যান্ডমাইকযোগে তাদের আত্মসর্পণের আহ্বান জানানো হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাকি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে
মাদারীপুর শত্রæমুক্ত হয়। এ সংবাদ মাদারীপুরে পৌঁছালে হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে রাস্তায় নেমে আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়ে। এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল খলিল বাহিনী। যুদ্ধে শহীদ হন মাদারীপুরের সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা সরোয়ার হোসেন বাচ্চু। এ যুদ্ধে ২০ হানাদার সেনা নিহত হয়।
প্রতি বছর মাদারীপুর দিবস যথাযথভাবে উদযাপনের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এবারো মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।
রায়পুরা (নরসিংদী) : ১০ ডিসেম্বর রায়পুরামুক্ত দিবস। ৭১-এর এই দিনে রায়পুরার কৃতী সন্তান সেক্টর কমান্ডার বীর উত্তম ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে ৫নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের কবল থেকে গৌরবোজ্জ্বল বিজয় ছিনিয়ে আনে।
৯ ডিসেম্বর ভারতের ৪র্থ গার্ড রেজিমেন্ট হেলিকপ্টারে রায়পুরার পূর্ব দক্ষিণ এলাকায় অবতরণ করতে থাকে। ১০ ডিসেম্বর ভারতীয় ১০ বিহার রেজিমেন্ট ও ১৮ রাজপুত রেজিমেন্ট রায়পুরায় পৌঁছে এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধোদের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে রায়পুরায় অবস্থানরত হানাদার সেনারা নরসিংদী হয়ে ঢাকার দিকে পলায়ন করে এবং রায়পুরা শক্রমুক্ত হয়।
এ দিনটি উদযাপন উপলক্ষে রায়পুরা প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সংগীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আজগর হোসেনও এই দিনটি যথাযথ মর্যাদায় পালনের উদ্দেশ্যে আলোচনা সভা ও র্যালির ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) : পাকিস্তানি হানাদারদের কবল থেকে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা মুক্ত হয় ১০ ডিসেম্বর। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীর নেতৃত্বে যমুনা নদীতে পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করা হয়। এ সময় মুক্তিসেনারা ২১ কোটি টাকার গোলাবারুদ ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র কব্জা করে। ৯ ডিসেম্বর কাদের সিদ্দিকীর নির্দেশ অনুযায়ী কালিদাসপাড়া, গুণগ্রাম, ঘাটাইল সদর ও বানিয়াপাড়া সেতু একযোগে আক্রমণ করা হয়। মেজর হাবিব ভোরে বানিয়াপাড়া সেতু, মেজর মোস্তফা কালিদাসপাড়া সেতু দখল করে ঘাটাইল থানার দিকে অগ্রসর হন। কাদের সিদ্দিকী নিজেই পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণ করেন। এই যুদ্ধে ৫০ জন হানাদার নিহত ও ১৫০ জন বন্দি হয়। ১০ ডিসেম্বর সম্পূর্ণরূপে ঘাটাইল হানাদারমুক্ত হয়। দিবসটি পালন উপলক্ষে ঘাটাইল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
