×

রাজধানী

আইপিডির আলোচনা

‘গুলশান পার্কে সীমিত হচ্ছে জনসাধারণের প্রবেশ, বাড়ছে বাণিজ্যিকীকরণ’

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৭:৫৩ পিএম

‘গুলশান পার্কে সীমিত হচ্ছে জনসাধারণের প্রবেশ, বাড়ছে বাণিজ্যিকীকরণ’

ছবি: সংগৃহীত

গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ও স্পোর্টস কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের কাছে দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মাঠ ও পার্ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) বলছে, এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে জনসাধারণের অবাধ প্রবেশাধিকার সংকুচিত হচ্ছে এবং নগর ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা বাড়ছে।

শুক্রবার অনলাইনে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে আইপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, পাবলিক পার্ক বা মাঠ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা। কিন্তু গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের একটি বড় অংশ ক্লাবের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগও কমে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়।

আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, উচ্চ আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও একটি ক্লাবকে পার্ক পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া আইন ও নীতির পরিপন্থী। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগে রাজউক ওই ক্লাবকে অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিল। অথচ একই প্রতিষ্ঠানকে পরে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি আরও বলেন, ঢাকায় খোলা জায়গা ও মাঠ-পার্কের সংকট অত্যন্ত তীব্র। এমন পরিস্থিতিতে একটি বাণিজ্যিক ক্লাবের হাতে পার্কের ব্যবস্থাপনা দিলে সাধারণ মানুষের খেলাধুলা ও বিনোদনের অধিকার আরও সংকুচিত হবে। জনগণের করের টাকায় গড়া এসব জায়গা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা থাকা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আইপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “পার্ক কোনোভাবেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে না। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা হচ্ছে। এতে সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গেও বড় ধরনের অসংগতি তৈরি হচ্ছে।”

আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ ও পার্ক থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও একটি মাঠ বেসরকারি ক্লাবের হাতে চলে যাওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক।

তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আদালতের রায় অমান্য করে, তাহলে আইনের শাসন প্রশ্নের মুখে পড়ে। এখানে শুধু প্রশাসনিক নয়, নৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা উচিত যে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না।”

বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আমিরুল রাজীব বলেন, মাঠ-পার্ক দখলের পেছনে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ কাজ করে। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক সময় আন্দোলনের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং কিছু ব্যক্তি প্রশাসনিক সুবিধা নিয়ে দখলদারদের পক্ষেও অবস্থান নেন।

তিনি বলেন, “নাগরিক আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ মাঠ-পার্ক রক্ষা শুধু সরকারের কাজ নয়, এটি নাগরিকদেরও অধিকার রক্ষার বিষয়। দখলদারদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।”

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল বলেন, ঢাকায় জনসংখ্যার চাপের কারণে খোলা জায়গার ওপর চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় পরিকল্পিতভাবে মাঠ-পার্ক সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যতে নগর জীবন আরও অস্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, “বিকেন্দ্রীকরণ না হলে এই সংকট আরও বাড়বে। প্রতিটি ওয়ার্ডে খাস জমি চিহ্নিত করে মাঠ বা পার্ক তৈরি করা জরুরি।”

পরিবেশকর্মী নাঈম উল হাসান বলেন, গুলশানের মতো এলাকায় দখলদারিত্বের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এটি একটি বিস্তৃত সমস্যা। তিনি বলেন, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংযোগ ব্যবহার করে অনেক সময় এসব দখল টিকে থাকে।

তিনি আরও বলেন, “এই দখলদারিত্বের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত। তাই সঠিক তদন্ত না হলে সমস্যার সমাধান হবে না।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, উন্নত দেশগুলোতে পার্ক ও খোলা জায়গাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকায় উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে বিদ্যমান পার্কও দখল হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে পার্ক বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হলে তা নগর পরিকল্পনার জন্য বড় হুমকি।”

পরিকল্পনাবিদ আবু নইম সোহাগ বলেন, প্রতিটি এলাকায় মাঠ থাকবে—এমন ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনো অনুমোদন ছাড়া কীভাবে একটি মাঠ দখলে চলে যেতে পারে।

পরিকল্পনাবিদ ফাহিম মন্ডল বলেন, মাঠ ও পার্ক ব্যবস্থাপনায় সরকারি সংস্থাগুলোর আগ্রহ কম, বরং তারা বেসরকারি ইজারার দিকে ঝুঁকছে। এতে নাম পরিবর্তনসহ নানা কৌশলে দখল টিকিয়ে রাখা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গবেষণা সহকারী জিনিয়াস জান্নাত বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের সময় মাঠ-পার্ক রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরে তা বেসরকারি হাতে চলে যাচ্ছে, যা প্রশ্নবিদ্ধ।

গবেষণা সহকারী কাজী তাসনিয়া তাবাসসুম বলেন, পাবলিক স্পেস বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলে সামাজিক বৈষম্য বাড়ে। নিম্ন আয়ের মানুষ এসব জায়গা থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়, যা নগরে বিভাজন তৈরি করে।

আলোচনায় আইপিডি মাঠ ও পার্ক ব্যবস্থাপনায় কমিউনিটি ও সিটি কর্পোরেশনভিত্তিক যৌথ ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব দেয়। এতে বলা হয়, স্থানীয় কমিটি ও সিটি কর্পোরেশন একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে কোনো গোষ্ঠী এককভাবে দখল করতে পারবে না।

এছাড়া গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা, চুক্তি বাতিল, নাম পরিবর্তন, তদন্ত ও শ্বেতপত্র প্রকাশসহ একাধিক সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ইজিবাইকচাপায় প্রাণ গেল শিশুর

ইজিবাইকচাপায় প্রাণ গেল শিশুর

জনগণের অসচেতনতা সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ

সড়কমন্ত্রী জনগণের অসচেতনতা সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ

কুল-বিএসপিএ'র তিনটি অ্যাওয়ার্ড একাই জিতলেন হামজা

কুল-বিএসপিএ'র তিনটি অ্যাওয়ার্ড একাই জিতলেন হামজা

প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে প্রতারণা, ডিবির জালে ভুয়া আইনজীবী

প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে প্রতারণা, ডিবির জালে ভুয়া আইনজীবী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App