কেন গোয়ার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন বিদেশি পর্যটকরা?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
গোয়ার দীর্ঘ বালুকাময় উপকূলরেখার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত অর্ধচন্দ্রাকৃতির পালোলেম সৈকত। ভরদুপুরের চোখ ধাঁধানো উত্তপ্ত সূর্যকে উপেক্ষা করেই পর্যটকদের ভিড় মেতেছে সমুদ্রের নোনা জলে। ভারতের ‘পার্টি ক্যাপিটাল’ খ্যাত এই রাজ্যের উপসাগর ঘেঁষে থাকা সৈকতের ঝুপড়ি আর সস্তা ব্যাকপ্যাকার হোটেলগুলো এখন পর্যটকে ঠাসা।
তবে আপাতদৃষ্টিতে জমজমাট মনে হলেও কয়েক বছর আগের গোয়ার সঙ্গে বর্তমানের তফাতটা আকাশ-পাতাল। যে ইউরোপীয় ও রুশ পর্যটকরা একসময় পালোলেম বা গোয়ার অন্যান্য সৈকত সংলগ্ন গ্রামে চষে বেড়াতো, তাদের উপস্থিতি এখন মেলাই ভার। সৈকতের বর্তমান ভিড়ের প্রায় পুরোটাই স্থানীয় বা দেশীয় পর্যটক। এটি মূলত এই ক্ষুদ্র উপকূলীয় রাজ্যটি থেকে বিদেশি পর্যটকদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ারই এক স্পষ্ট প্রতিফলন।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালে যেখানে প্রায় ৯ লক্ষ বিদেশি পর্যটক গোয়ায় এসেছিলেন, ২০২৫ সাল নাগাদ এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ লাখে। অন্যদিকে, ২০১৬ সালের ৬৮ লাখ থেকে বেড়ে গত বছর দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে গেছে।
গোয়ার পর্যটন মন্ত্রী রোহান খাউন্তে একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বৈদেশিক পর্যটন প্রবাহকে প্রভাবিত করছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার সময় আমাদের একই সাথে হতাশাবাদী ও আশাবাদী থাকতে হবে।’
কিন্তু সংখ্যার এই ধস সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাতেরও আগের ঘটনা। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকের হিপিদের স্বর্ণযুগ থেকে যে বিদেশি পর্যটকরা গোয়াকে ভালোবেসে নিয়মিত এখানে আসতেন, তারা এখন কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন? এর পেছনে উঠে এসেছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ।
কারণ গুলো মধ্যে রয়েছে: বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দা ও আকাশছোঁয়া বিমান ভাড়া, দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর আগ্রাসী নীতি, সীমিত আবাসন ও চড়া মূল্য, যাতায়াত সংকট ও নোংরা পরিবেশ।
রাশিয়া থেকে পঞ্চমবারের মতো আসা ব্যালে নৃত্যশিল্পী সোফি বলেন, ‘মানুষের এখন খুবই আর্থিক টানাটানি। প্রথমে কোভিড, তারপর ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইটের ভাড়াও অনেক বেড়ে গেছে। টাকা-পয়সা অবশ্যই একটা বড় বিষয়।’
তিনি জানান, ‘তার অনেক বন্ধু এখন গোয়ার পরিবর্তে তুরস্ক বা মিশর বেছে নিচ্ছেন, কারণ সেগুলো বাড়ির কাছে এবং খরচ কম।’
যুক্তরাজ্য থেকে আসা ২০ বছরের নিয়মিত দর্শনার্থী রিকোও একমত হয়ে বলেন, ‘ইউরোপীয়রা এখন নিজ দেশেই ছুটি কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।’
বার্তা সংস্থা বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে বেশ কয়েকজন বিদেশি পর্যটক গোয়া বিমুখতার জন্য ভারতের দীর্ঘ ও জটিল ভিসা প্রক্রিয়া এবং পাঁচ বছরের ভিসার ফি বৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন।
এ প্রসঙ্গে গোয়ার পর্যটন বিভাগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং একটি বড় ট্র্যাভেল চার্টার কোম্পানির মালিক আর্নেস্ট ডায়াস বলেন, ‘আজকের দিনের ভ্রমণকারীরা খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন এবং শেষ মুহূর্তে ভ্রমণে যেতে চান। তাই ভিসা পেতে বিলম্ব হওয়ার কারণে সম্প্রতি একটি বড় রুশ চার্টার গ্রুপ তাদের গোয়া সফর বাতিল করে ভিয়েতনামে চলে গেছে, যেখানে এখন পর্যটকদের ব্যাপক চাহিদা।’
তিনি আরো বলেন, ‘সহজে অন-অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়ার সুবিধা এবং সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে বর্তমানে ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো বিদেশি পর্যটকদের লুফে নিচ্ছে।’
এদিকে, দেশীয় পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং করপোরেট (MICE) অর্থনীতির কারণে গোয়ার ভালো মানের হোটেলগুলোর ভাড়া অনেক বেড়ে গেছে। ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের তুলনায় গোয়ায় সাশ্রয়ী মূল্যের সমুদ্রতীরবর্তী রিসোর্টের সংখ্যা খুবই সীমিত, যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলো অর্ধেক দামে আকর্ষণীয় প্যাকেজ ডিল দিচ্ছে।
লন্ডন গ্যাটউইক থেকে গোয়া রুটে এয়ার ইন্ডিয়ার সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন ব্রিটিশ পর্যটকরা।
নিকোলা নামের এক হেয়ারড্রেসার জানান, ‘সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় তাকে মুম্বাইয়ে অপ্রয়োজনীয় যাত্রাবিরতি (লেইওভার) করতে হয়েছে, যা ছিল বেশ ঝামেলার। একই কারণে তার ভাই এবার গোয়ার বদলে শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার মতে, শ্রীলঙ্কা শুধু গোয়ার চেয়ে বেশি সাশ্রয়ীই নয়, বরং অনেক বেশি পরিচ্ছন্নও।’
সৈকতের রাস্তাঘাটে আবর্জনা জমে থাকা এবং স্থানীয় সিন্ডিকেটের কারণে অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সি (ওবার/ওলা) নিষিদ্ধ থাকাও বিদেশি পর্যটকদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ। ডায়াসের মতে, অ্যাপে ট্যাক্সি না পাওয়াটা যেন "প্রস্তর যুগে বাস করার মতো।
বিদেশি পর্যটক কমে যাওয়া গোয়ার পর্যটন-নির্ভর স্থানীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বাগা সৈকতের কাছে ১০০ কক্ষের হোটেল ব্যবসায়ী শেরভিন লোবো জানান, তার হোটেলে বিদেশি পর্যটক অন্তত ১০% কমে গেছে।
আর্নেস্ট দিয়াস উল্লেখ করে বলেন, ‘ভারতীয় পর্যটকরা যেখানে সাধারণত অল-ইনক্লুসিভ (থাকা-খাওয়ার সম্পূর্ণ খরচ) প্যাকেজ পছন্দ করেন, সেখানে বিদেশিরা স্থানীয় মোটরবাইক ভাড়া করা, ভ্রমণ প্যাকেজ কেনা এবং স্থানীয় ঝুপড়ি ও রেস্তোরাঁয় খাওয়ার পেছনে বেশি খরচ করেন। ফলে বিদেশি কমায় পুরো পর্যটন বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
দিয়াস স্বীকার করেন যে, ‘গোয়া সম্ভবত দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন নিয়ে কিছুটা অসতর্ক বা আত্মতুষ্ট ছিল। তবে বর্তমান সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রোড শোর আয়োজন করছে। পোল্যান্ডে সফল প্রচারণার পর এবার স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলো এবং পরবর্তীতে এশিয়া ও আফ্রিকার নতুন বাজার ধরার পরিকল্পনা রয়েছে গোয়ার।’
তার মতে, সাদা চুনকাম করা গির্জা, রঙিন পর্তুগিজ বাড়ি আর ধীরস্থির জীবনযাপনের (সুসেগাড়) ঐতিহ্যবাহী গোয়াকে যদি তার পুরোনো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে মহাদেশ জুড়ে গড়ে ওঠা সস্তা, পরিচ্ছন্ন এবং আধুনিক বিকল্পগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় জিততে আরও আমূল সংস্কারের প্রয়োজন।
