মাজারে হামলা চালাচ্ছে কারা?
সালাফি ও ওয়াহাবি মতাদর্শদের বিদ্বেষ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতে উদ্দেশ্যে ভিন্ন হতে পারে > মাজার ও সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলা হলে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাগজ প্রতিবেদক : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সম্প্রতি দেশে একের পর এক মাজারে হামলা-লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ধারাবাহিকভাবে সিলেট, গাজীপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, নোয়াখালী, ঢাকাসহ আরো কয়েকটি জেলার মাজারে হামলা চালানো হয়েছে। এসব ঘটনা ঘিরে বেশ কয়েকজন আহতও হয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে বুলডোজার নিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইভেন্ট খুলেও মাজার ভাঙার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই অবস্থায় মাজার রক্ষায় তৎপরতা দেখা গেছে মুরিদদের মধ্যে। হামলার হাত থেকে বাঁচাতে অনেক মাজার রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা পাহারা দিচ্ছেন তারা।
মাজার ভাঙার এসব ঘটনায় সমালোচনাও সৃষ্টি হয়েছে বেশ। উলামাদের অনেকে এর নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে মাজার ও সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তবে প্রশ্ন হচ্ছে- কারা কেন কী উদ্দেশ্যে মাজারে হামলা করছে? আর কেনই বা হাজার হাজার মানুষ মাজারে হামলা চালানোর আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত সুফি বা ধর্মীয় প্রচারকদের কবরকে কেন্দ্র করেই মাজার গড়ে ওঠে। যেখানে অনেকে মনোকামনা পূরণের উদ্দেশ্যে মানত করে থাকেন। যদিও মাজার স্থাপন কতটা ইসলামসম্মত, তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। বিশেষ করে মাজারে উরস করা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো ও যেভাবে মাহফিল করা হয়, সেটি নাজায়েজ বলে মনে করেন সালাফি ও ওহাবি মতাদর্শের মানুষ। এই বিদ্বেষ থেকে মাজারে হামলা হতে পারে, আবার রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেও এ ধরনের হামলা হয়ে থাকতে পারে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইসলামিক স্টাডিস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিক আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, মাজারে কারা হামলা চালাচ্ছে- ঢালাওভাবে এটি বলা মুশকিল। তবে সালাফি ও ওহাবি মতাদর্শের মানুষদের মাজারের প্রতি ক্ষোভ বা বিদ্বেষ রয়েছে। কেননা, মাজারে উরস পালনসহ যেসব কর্মকাণ্ড করা হয় সেগুলোকে তারা নাজায়েজ বলে মনে করে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে কারা কী উদ্দেশ্যে এই হামলায় অংশ নিচ্ছে, সেটি তদন্তের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই ভালো বলতে পারবে। আমাদের কাছে যেটি মনে হচ্ছে, হিন্দুদের বাড়িতে যে কারণে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, মাজারে হামলার পেছনেও একই কারণ থাকতে পারে। আবার বর্তমান সময়ের সুযোগ নিতে পারে বিদ্বেষ থাকা মতাদর্শের লোকজনও। তবে নেপথ্য কারণ যাই হোক না কেন, এটি অনৈতিক ও গর্হিত কাজ। কারোই এরকম হামলা চালানো উচিত হবে না।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফিন্দি ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা কখনোই আইন হাতে তুলে নেয়াকে সমর্থন করি না। সব সময় শান্তি-সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় থাকবে সেটিই চাই। ফলে মাজারে হামলার ঘটনাগুলোকেও আমরা সমর্থন করি না। নানা মহল পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই তদন্তের পর বলতে পারবে- কারা কী উদ্দেশ্যে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাজার বিদ্বেষী মতাদর্শের লোকরা এসব ঘটনা ঘটাতে পারে কি না- সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। তবে কারোরই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো উচিত হবে না।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল সনদ বিভাগের উপপরিচালক মো. আবু সালেহ পাটোয়ারী বলেন, মাজার শব্দের অর্থ জিয়ারতের স্থান। কিন্তু আমাদের দেশে মাজার বলতে বোঝায় পীর-বুজুর্গের কবর। মানুষ সেখানে জিয়ারতের জন্য যায়। ইসলামের মৌলিক বিধান অনুযায়ী, কবরের পর সেটিকে পাকা করে গম্বুজ করা বৈধ না, শরিয়তে এর অনুমতি নেই। কিন্তু আমাদের দেশে অনেকে এগুলো করে। তবে ইসলামে বৈধ না বলে কেউ ওইসব স্থাপনার ওপর আক্রমণ করতে পারে না। আপনার-আমার কাজ হলো- এগুলো বৈধ নাকি অবৈধ, সেটুকু বলা। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মাজারে আক্রমণ করার অনুমতি ইসলাম দেয় না। মাজার সংস্কৃতির কারণে যদি কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগে, তাহলে আইনের দ্বারস্থ হতে হবে।
এদিকে গতকাল শনিবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত সুফি আশ্রম ও মাজারে হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে সরকার। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কাজও চলছে। এছাড়া ধর্মীয় উপাসনালয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলো রক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আক্রান্ত হয়েছে যেসব মাজার : ঢাকার ধামরাই উপজেলার বাটুলিয়া এলাকায় ‘বুচাই পাগলা (রহ.) এর মাজারে’ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এলাকাবাসীর দাবি- অন্য এলাকার লোকজন এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। তারা আরো বলেন, মাজারটিতে শরিয়াহবিরোধী কাজ হতো না। মাজারে মাদক নিষিদ্ধ ছিল। মাজারে দানের টাকায় একটি মসজিদ পরিচালনা করা হতো, একটি অংশ যেত মাদ্রাসায়। এছাড়া অসহায় মানুষদেরও সহায়তা করা হতো। গত বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ৫ শতাধিক মানুষ উপজেলার সানোড়া ইউনিয়নের বাটুলিয়া এলাকায় কালামপুর-সাটুরিয়া আঞ্চলিক সড়কের পাশে মাজারটি ভাঙচুরে অংশ নেন। প্রায় দুই ঘণ্টা যাবত ভাঙচুর চলে। মাজার ভাঙচুরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সি মানুষ লাঠি হাতে মাজারের বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করছেন এবং একটি এক্সাভেটর (ভেকু) দিয়ে মাজারের মূল ভবনটি গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তাদের অধিকাংশই টুপি ও পাঞ্জাবি পরে ছিলেন।
এই হামলায় অংশ নিয়েছিলেন কুশুরা দক্ষিণ কান্টাহাটি মসজিদের ইমাম মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এখানে শিরক-বিদাতি কাজকর্ম চলছিল, কোনোভাবেই প্রতিরোধ করতে পারছিলাম না। আলহামদুলিল্লাহ, এখন প্রতিরোধ করার সময় হয়েছে। এখন যদি বসে থাকি, তবে কেয়ামতের ময়দানে হিসাব দিতে হবে। যে কারণে আমরা ধামরাইয়ের আলেম-ওলামারা বিভিন্ন সংগঠন থেকে একত্রিত হয়ে এটি বন্ধ করি। ধামরাই ওলামা পরিষদ, ইমাম পরিষদ, কালামপুর আঞ্চলিক ইমাম পরিষদ এখানে ছিল। নিজেকে হামলার সমন্বয়ক দাবি করা আবুল কাশেম বলেন, এখানে অনেক আগে থেকে অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড হয়েছে। তবে জনগণ প্রতিবাদ করতে পারেনি। এখানে মদ, গাঁজা সেবনসহ নানা অনৈতিক কাজ হতো। কালামপুর ও আশপাশের তৌহিদি জনতা সবাই একত্র হয়ে এটি ধ্বংস করেছে।
গত শুক্রবার গাজীপুরের পোড়াবাড়ি এলাকার ফসিহ উদ্দিন ওরফে ফসিহ পাগলার মাজারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় মাজারের সীমানা প্রাচীর, পাকা ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। পরে মাজারের বিভিন্ন আসবাবপত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। জুম্মার নামাজের পর কয়েকশ মানুষ লাঠিসোটা, শাবল ও ভাড়া করা একটি বুলডোজার নিয়ে ওই মাজারে হামলা করে। আশির দশকে গড়ে ওঠা মাজার চত্বরে একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা ছাড়াও ফসিহ উদ্দিন দাখিল মাদ্রাসা ও মসজিদ রয়েছে। একই দিন সকাল ৬টার দিকে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনপুর এলাকায় দেওয়ানবাগ মাজারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া মো. অলি নামের একজন জানান, সকাল ৬টার দিকে মাজারবিরোধী কিছু ব্যক্তি হামলা চালিয়ে প্রথমে দেওয়ানবাগ শরীফে ঢুকে ভাঙচুর করে। তখন ভেতরে থাকা লোকজন তাদের বাধা দিলে হামলাকারীরা তাদের মারধর করে। পরে আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায় তারা। এর আগে গত ২৫ আগস্ট সোনারগাঁ উপজেলার সনমান্দি ইউনিয়নে আয়নাল শাহ দরগা নামে পুরনো একটি মাজার ভেঙে ফেলা হয়।
গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর শরীয়তপুরের জাজিরার বিলাশপুর ইউনিয়নের মেহের আলী মাদবরকান্দি গ্রামে অবস্থিত আরশেদ পাগলার মাজার ও নড়িয়ার মোক্তারেরচর ইউনিয়নের পোড়াগাছা গ্রামে অবস্থিত শালু শাহ মাজারে স্থানীয়রা হামলা চালায়। গত সোমবার রাতে সিলেটের খাদিম এলাকায় শাহপরান (র.) মাজারে আলেম-জনতার সঙ্গে দুর্বৃত্তদের সংঘর্ষে অন্তত ৪০ জন আহত হয়। রাত ২টা থেকে ভোর পর্যন্ত আড়াই ঘণ্টাব্যাপী দুই পক্ষে সংঘর্ষ চলে। পরে সেনাবাহিনীর একটি টিম এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনার পর শাহপরান মাজার কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেন যে ওরসের সময় সেখানে কোনো গানবাজনা হবে না।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামে ইসমাইল পাগলার মাজারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় ৩টি কবর খুঁড়ে দেহাবশেষ নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর গ্রামের ইসমাইল পাগলার মাজার ও গত ২৯ আগস্ট কাজিপুর উপজেলার মনসুরনগর ইউনিয়নের বামনজানি বাজারের পাশে আলী পাগলার মাজারও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। গত শুক্রবার নোয়াখালী পৌরসভার ল²ীনারায়ণপুর এলাকার ফকির চাড়ু মিজি শাহ্ (র.) মাজার (দরগাহ বাড়ির মাজার) ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা। একই দিন মাদারীপুরের শিবচরে দীপঙ্কর সাহা নামের এক কবিরাজের অস্থায়ী বসতবাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এদিকে ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলিস্তানে অবস্থিত গোলাপশাহ মাজার ভাঙতে ফেসবুকে ‘গুলিস্তানে গোলাপশাহ মাজার ভাঙা কর্মসূচি’ শীর্ষক একটি ইভেন্ট খোলা হয়েছিল, যাতে প্রায় ২৩ হাজার মানুষ সাড়া দেন। তবে মুরিদদের পাহারা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ভেস্তে যায় ওই ইভেন্ট।
হামলার ঘটনা বাড়তে থাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের মসজিদ, মন্দির ও গির্জাতে সরকার যেভাবে পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে, ঠিক সেভাবে মাজারেও নিরাপত্তা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সুফি, বাউল ও ওলি-আউলিয়াদের ভক্তরা। এসব ঘটনার নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে যারা আইন হাতে তুলে নিয়েছেন তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের কিছু আলেমও।
