×

মুক্তচিন্তা

জাতীয় দিবস বাতিল: ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও সমসাময়িক বিতর্ক

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম

জাতীয় দিবস বাতিল: ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও সমসাময়িক বিতর্ক

ছবি: লেখক

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু দিবস। ৭ মার্চের ভাষণ, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস -এসব শুধু তারিখ নয়; এগুলো জাতির সংগ্রাম, অর্জন, ত্যাগ এবং বাঙালি পরিচয়ের প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতার স্বার্থের কারণে এই ইতিহাসকে বারবার পুনর্লিখন এবং সংস্কৃতিগতভাবে বিকৃত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের আন্দোলনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপনের একটি নতুন তালিকা প্রণয়ন করেছিল। এই তালিকায় অনেক ঐতিহাসিক দিবস বাতিল বা পরিবর্তিত হয়েছিল। তবে সবচেয়ে আলোচ্য বিষয় হলো ৭ মার্চ এবং ১৫ আগস্টের মতো দিনগুলোকে সরাসরি বাতিল করা-এক ধরনের ইতিহাসের 'সংশোধন' যা দেশের সংবিধান এবং জাতীয় চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২০২৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এই অন্তর্বর্তী সরকারের তালিকাকে বহাল রেখেছে। বুধবার (১১ মার্চ) নতুন একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে, যেখানে মোট ৮৯টি দিবস উদযাপনের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। 'ক' শ্রেণিতে ১৭টি, 'খ' শ্রেণিতে ৩৭টি এবং 'গ' শ্রেণিতে ৩৫টি দিবস রাখা হয়েছে। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ৫ আগস্ট 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস' এবং ১৬ জুলাই 'জুলাই শহীদ দিবস' অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

যদিও প্রশাসনিক দিক থেকে এ ধরণের শ্রেণিভিভাজন প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এই তালিকার মাধ্যমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস- ৭ মার্চ, ১৫ আগস্ট, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস, সংবিধান দিবস, সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং শিক্ষামূলক দিবসগুলোকে সরকারী স্বীকৃতি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক নিদান নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা, যা নির্দেশ করে যে ক্ষমতায় থাকা দল ইতিহাসের কোন অংশকে স্বীকৃতি দেবে এবং কোন অংশকে 'অদৃশ্য' করবে।

৭ মার্চের ভাষণ শুধু ভাষণ নয়, এটি ছিল স্বাধীনতার প্রস্তুতির একটি অপরিহার্য সংকেত। ১৫ আগস্টের দিনটি কেবল শোকের দিন নয়, এটি জাতিকে সতর্ক করে যে স্বাধীনতা অর্জন সহজ ছিল না। এই দুই দিবসের বাতিল, বিশেষ করে ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও পুনঃস্থাপন না করা, স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্লিখন করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক ইতিহাস এবং সামাজিক সচেতনতার জন্য ক্ষতিকর। শিশুদের শিক্ষা থেকে শুরু করে জাতীয় চেতনার গঠন-এসব ক্ষেত্রে একটি দেশের নির্দিষ্ট ইতিহাসকে বাতিল করা বা বিকৃত করা গভীর প্রভাব ফেলে। এর পাশাপাশি, কিছু দিবসকে অন্তর্ভুক্ত করা, যেমন 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস' হয়তো রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু দেশের স্বাধীনতার মূল ধারাকে উপেক্ষা করে।

বর্তমান পরিপত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসের শ্রেণিভিভাজন কেবল প্রশাসনিক সুবিধার জন্য নয়; এটি নির্দেশ করে কোন ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনটি 'অপ্রয়োজনীয়'। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলো বাতিল রয়েছে, অথচ তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবশালী দিবসগুলো রাখা হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে ইতিহাস এখন রাজনৈতিক নির্বাচনের বিষয় হয়ে গেছে, এবং সরকার এই ইতিহাসকে জনগণের চোখের সামনে সাজানো বা লুকানোর ক্ষমতা প্রয়োগ করছে।

এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত মূল সমস্যা হলো, ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্বার্থের চোখ দিয়ে দেখা। 

কোনো রাষ্ট্রের ইতিহাস কেবল সরকারের ইচ্ছে অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায় না। শিক্ষা, গবেষণা এবং সামাজিক সচেতনতার জন্য ইতিহাসকে সঠিকভাবে তুলে ধরা অপরিহার্য। ৭ মার্চ, ১৫ আগস্ট, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস এসব দিনের রাজনৈতিক এবং শিক্ষামূলক গুরুত্ব দেশের সকল নাগরিকের মধ্যে জাতীয় চেতনা তৈরি করে। এই দিবসগুলোর বাতিল কেবল ইতিহাসকে মুছে ফেলা নয়, এটি জনগণের জাতীয় পরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

একটি দেশের ইতিহাসের পুনর্লিখন যখন ক্ষমতার প্রতিফলন হয়, তখন তা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। বর্তমান সরকারের তালিকায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত নীতি বহাল রাখা, যা ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশগুলোকে উপেক্ষা করেছে, এটি স্পষ্ট করে যে ইতিহাস রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক সচেতনতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জাতীয় চেতনা গঠনের ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি প্রশাসনিক তালিকার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং জনগণের মধ্যে জাতীয় চেতনা সংরক্ষণের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ইতিহাসকে পুনর্লিখন, দিবস বাতিল বা অন্তর্ভুক্তি, এসব সিদ্ধান্তের ফলে ইতিহাসের প্রতি সরকারের দায়িত্ব এবং সামাজিক নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে উপরে রাখা। দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসগুলো শুধু তারিখ নয়,  এগুলো আমাদের সংগ্রাম, অর্জন এবং জাতীয় চেতনার স্মারক। ৭ মার্চ, ১৫ আগস্ট, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবসের মতো দিনগুলোকে উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় চেতনা গঠন করতে পারবে না। ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার খেলার সরঞ্জাম বানানো মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত এই দিবসগুলোর তাৎপর্য এবং মর্যাদা বজায় রাখা, যাতে স্বাধীনতা, সংগ্রাম এবং জাতীয় চেতনার প্রকৃত মূল্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছায়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে খাবার বিতরণ করেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে খাবার বিতরণ করেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা

মার্কিন সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ সংস্থা প্রধানের পদত্যাগ

ইরান ইস্যুতে মতবিরোধ মার্কিন সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ সংস্থা প্রধানের পদত্যাগ

হরমুজ প্রণালিতে কোনো অভিযানে অংশ নেবে না ফ্রান্স

হরমুজ প্রণালিতে কোনো অভিযানে অংশ নেবে না ফ্রান্স

খ্যাতিমান অভিনেতা শামস সুমন মারা গেছেন

খ্যাতিমান অভিনেতা শামস সুমন মারা গেছেন

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App