মুক্তচিন্তা
যুদ্ধের রকমফের
নিয়াজ জামান সজীব
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ১০:২০ পিএম
ছবি: কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে তৈরি ছবি
যুদ্ধ। সবসময়ই নির্মম। আশাহত হৃদয়ের আর্তনাদ। স্থল, জল, মন, সশরীরে কিংবা আকাশ পথে। যে নামেই বা যেভাবেই হোক না কেনো ফল সবসময়ই ধ্বংস। মানুষের মনের মধ্যে নিয়ত যুদ্ধ চলে। ভালো ও মন্দের দ্বন্দ্ব চলে। প্রেম, বিরহ, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ- সর্বত্র বিরাজমান এক ভয়ংকর শব্দ যুদ্ধ।
কখনো নিজের সাখে কখনো কাছের কারো সাথে। চলছে-চলবে। রাজ্যপাট দখলে রাখা বা হারানো রাজত্ব উদ্ধারে যুদ্ধ চলছে বিশ্বব্যাপি। খাবার নিয়ে বা নিরাপদ আবাস পেতে এখন যুদ্ধের আভাস। ঘরের পাশের দেশ বা প্রতিবেশীর যুদ্ধেও বিপদে পড়তে হয়।
বিশ্বের বহু সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছে যুদ্ধের কারণে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য হলো যাযাবরদের হাতে অনেক শক্তিশালী রাজা, সম্রাট এর পতনের গল্প। আবার অনেকের পছন্দের মানুষকে হারাতে হয় অগোছালো ও এলোমেলো – সমাজ যাকে বলে প্রতিষ্ঠিত নয়- এমন কারো প্রেমের টানে।
যাযাবরদের কথা বলছিলাম। বিশ্বের ইতিহাসের গতিপথ বহুবার বদলে দিয়েছে এই গোষ্ঠির মানুষেরা। পৃথিবীর যে প্রান্তেরই যাযাবর হোক না কেনো তাদের একতা, সাহস বহু প্রতিষ্ঠিত শক্তিতে ধ্বসিয়ে দিয়েছে। এক হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দেরও বেশি সময় আগে ইরানি মালভূমিতে বসবাস ছিল বিভিন্ন যাযাবর গোষ্ঠীর। একটি গোষ্ঠীর প্রধান ছিলেন দ্বিতীয় সাইরাস- ‘সাইরাস দ্য গ্রেট’। পারস্য অঞ্চলে বসবাস করা গোত্রগুলোকে একত্র করে জয় করেন পারস্যের উত্তরাংশে অবস্থিত শক্তিশালী মেদেস রাজ্য। মাত্র ১৫ বছরে সেই রাজ্যকে পরিণত করেন শক্তিশালী সাম্রাজ্যে। রাজা সাইরাস দ্য গ্রেট দখল করে নেন ব্যাবিলন। ওপিসের যুদ্ধে হেরে গিয়ে পুরোপুরি পারস্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার মাধ্যমে পতন ঘটে ব্যাবিলনের।
আরো পড়ুন: ফোর্স মেজরের ছায়া, আবারও জ্বালানি সংকটের দোরগোড়ায় বাংলাদেশ
ইংরেজিতে অটোমান। তুরস্কের ভাষায় ওসমানী সাম্রাজ্য। তুরস্কের আনাতোলিয়ার ছোট একটি এলাকা থেকে এই রাজত্বের শুরু। পরে ছয়শ’ বছর ধরে কয়েক লাখ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে এই সাম্রাজ্যের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পতন হয়েছিল।
২৩ বছরের বঞ্চনা ও ভাষাগত পার্থক্যের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়েছে । সেই আকাংখার মূল কথাগুলো এই দেশের মানুষ শুনেছিল ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণে । ভাষণ মানুষকে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে উদ্দীপ্ত করে ও পথ দেখায় ।
সেনাবাহিনী, পারিষদবর্গ ও ক্ষমতার জৌলুস ফেরাউনকে উদ্ধত করেছিল। সে নিজেকে খোদা দাবি করেছিল। ফেরাউন সাগরে ডুবে মারা যায়। আল্লাহর আজাব দেখে ফেরাউন তাওবা করলেও তার তাওবা গৃহীত হয়নি।
তাই যুদ্ধ এক আজব জিনিস। সবাই জানে যুদ্ধে সব তছনছ হয়ে যায়। স্বজন, জমিন, জীবন হারিয়ে যায়। তবুও প্রতিদিন চলে আরেক জীবন যুদ্ধ। বেঁচে থাকার, ভালো থাকার। সময়ের সাথে সব হারিয়ে যায় কিন্তু ভালোবাসা, আদর্শ থেকে যায়। সময় সবকিছু হয়তো ঠিক করে দেয়। কিন্তু সব কি ভুলে যাওয়া যায়!
মনিষীরা বলেন, যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে কখনো খাটো করে দেখতে হয় না। আবার প্রেমের ক্ষেত্রেও কারো সাময়িক অযোগ্যতাকে বাঁকা চোখে দেখার সুযোগ নেই।
জীবনে এগিয়ে থাকার জন্য জ্ঞানীরা বলেন, গোপনীয়তাই তোমার শক্তি। যা অন্যরা জানে না, তা নষ্ট করতে পারবে না। নিজের ব্যক্তিগত জীবন গোপন রাখো। কারণ সবাই তোমার মঙ্গল চায় না। যুদ্ধেও তেমন। কেউ কারো কৌশল বলতে চায় না। আবার একজন প্রকৃত নেতার একাকীত্ব তাঁর পথচলারই অংশ। একা থাকা অনেকে উপভোগও করেন। যুদ্ধে যেমন পরাজিতের পাশে কেউ থাকেনা। বিজিত মানুষ বড় একা। সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। জীবনে প্রত্যেকের ভেতরে ভেতরে কোনো না কোনো লড়াই চলে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ সিএসআইএস জানিয়েছে-ইরানের বিরুদ্ধে চলমান ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই ওয়াশিংটনের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার। এই বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের কারণ- অত্যাধুনিক ও দামি গোলাবারুদ এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার। গড়ে প্রতিদিন এই যুদ্ধের পেছনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে প্রেমের জন্য যুদ্ধও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। দরিদ্রদের জন্য তাই যুদ্ধ মানে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকা।
যুদ্ধে কেউ পরাজয় মানতে চায় না। যার যতটা সম্বল আছে তাই নিয়ে চালিয়ে নিতে চায়। প্রেয়সীর মন জয়ে তাই প্রকৃত প্রেমিক অর্থ যুদ্ধে না নেমে আর্ত হৃদয়ের শিশির ভেজা সকালের প্রত্যাশা করে।
তবে, সব প্রেম যুদ্ধ সবসময় আলোর মুখ দেখে না। যেমন পৃথিবীর বহু প্রতিভা ও ফুল সময়মতো ফুটতে পারেনা। যুদ্ধে অর্থেও পাশাপাশি সাহসেরও দরকার হয়। তাইতো ইরান ভাবছে মার্কিন স্থও বাহিনীকে তারা পরাজিত বা ভালোভাবে মোকাবেলার করার ক্ষমতা রাখে। তাইতো ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আরাঘচি মনে করছেন স্থল পথে মার্কিন সেনারা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। যে যুদ্ধ এখন পরমানু নির্ভর হয়ে পড়েছে সেখানে আসলে সমতল ও পাহাড়ী রাস্তার বৈপরিত্য কতটা কার্যকর সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তবুও যুদ্ধ শেষ হয় না । মনের বন্দরে মাঝে মাঝে নোঙর ফেলে বটে কিন্তু এই জাহাজ সব সময় থাকে অজানা দূরের আলোর সাথে।
লেখক: সাংবাদিক
