ফোর্স মেজরের ছায়া
আবারও জ্বালানি সংকটের দোরগোড়ায় বাংলাদেশ
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আবারও এক অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে এসেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদক কোম্পানি কাতারএনার্জি তাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতির ঘোষণা দেওয়ায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের সামনে তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা,বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এ অবস্থায় দেশে জ্বালানিসংকটের শঙ্কা দেখা দেয়ায় তেল-গ্যাস সাশ্রয়ের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানাচ্ছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে সরবরাহ করা হচ্ছিল ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। গতকাল বুধবার থেকে সরবরাহ ২০ কোটি ঘনফুট কমিয়ে আনা হয়েছে। সার ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ কমানো হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে কিছুটা লোডশেডিং হতে পারে। আর কোথাও কোথাও রান্নার গ্যাস পেতে ভোগান্তি হতে পারে।
দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোপুরিই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অপরিশোধিত জ্বালানির সম্পূর্ণ অংশ আসে মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। অন্যদিকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। পাশাপাশি দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ মেটানো হয় আমদানি করা এলএনজি দিয়ে, যার বেশিরভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই আমদানি প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
আরো পড়ুন: মুক্তচিন্তাঃ যুদ্ধের রকমফের
বাংলাদেশ গত এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ব্যাপকভাবে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমাগত কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শহুরে গ্যাস ব্যবস্থাপনার বড় অংশই এখন আমদানিনির্ভর। এই বাস্তবতায় কাতারের মতো বড় সরবরাহকারী যদি হঠাৎ সরবরাহ অনিশ্চিত করে তোলে,তবে তার অভিঘাত পুরো অর্থনীতিতেই পড়া স্বাভাবিক।
চলতি বছরে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ১১৫টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে প্রায় ৪০টি সরবরাহ করার কথা ছিল কাতারএনার্জির। কিন্তু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি চুক্তির ‘ফোর্স মেজর’ ধারা সক্রিয় করার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে এটি একটি স্বীকৃত ব্যবস্থা-যুদ্ধ,প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতিতে সরবরাহে সাময়িক ব্যত্যয় ঘটলে সরবরাহকারী দায়মুক্তি পেতে পারে।
তবে কাগজে-কলমে বৈধ হলেও বাস্তবে এর প্রভাব ভোক্তা দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুতর। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্পট বাজার থেকে এলএনজি কেনার চেষ্টা করছে। কিন্তু স্পট বাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দাম অস্থিরতা। সংকট শুরুর আগে যেখানে এশিয়ার এলএনজি স্পট সূচক Jছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ৯ ডলারের নিচে,সেখানে কয়েক দিনের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় ১৩ ডলারের বেশি হয়ে গেছে। যদি উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়,তাহলে দাম আরও বাড়তে পারে।
এর ফলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় মানে হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ার চাপ সৃষ্টি করতে পারে। শিল্প খাতের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। গ্যাস সংকট দেখা দিলে কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হবে,যা রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার সীমিত বৈচিত্র্য। বর্তমানে এলএনজি আমদানির বড় অংশই কয়েকটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর নির্ভরশীল। যদি সেই উৎসগুলোর কোনো একটি হঠাৎ বিঘ্নিত হয়,তাহলে বিকল্প সরবরাহ দ্রুত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যখন বিশ্ববাজারে একই সময় বহু দেশ বিকল্প সরবরাহের খোঁজে থাকে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ইরান যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে,তাহলে শুধু এলএনজি নয়,বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই ব্যাহত হতে পারে। কারণ বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানির একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে।
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির কিছু মৌলিক দুর্বলতাকেও সামনে এনে দিয়েছে। প্রথমত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ কম ছিল। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উত্তোলনের উদ্যোগ যথেষ্ট জোরালো না হওয়ায় দেশীয় উৎপাদন কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণেও অগ্রগতি সীমিত। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
অতএব,এই সংকটকে শুধু সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি একটি সতর্কবার্তা-বাংলাদেশকে দ্রুত তার জ্বালানি কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে। নতুন গ্যাস অনুসন্ধান,এলএনজি সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্য, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো-এই চারটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তা না হলে প্রতি কয়েক বছর পরপর একই ধরনের সংকট ফিরে আসবে,আর তখন সরকারকে আবারও ব্যয়বহুল স্পট বাজারে দৌড়াতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু অর্থনীতির প্রশ্ন নয়;এটি শিল্প,কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
কাতারের ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা তাই বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সরবরাহ সমস্যার খবর নয়-এটি একটি কঠিন বাস্তবতার স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির জন্য স্থিতিশীল ও বহুমুখী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন আর বিকল্প নয়,বরং অপরিহার্য।
লেখক: সাংবাদিক
