ঢামেকে আগুন আতঙ্ক, রোগীর স্বজনদের ছুটাছুটি

আগের সংবাদ

কড়া নির্দেশনা কার্যকরে ঢিলেমি

পরের সংবাদ

ফ্রিদা কাহলো : আত্মপ্রতিকৃতির বিষণ্ন শিল্পী

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২১, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভকালে পোস্টকলোনিজমের যুগে এবং প্রবল রেসিজমের সময়ে সদ্যউদিত মেস্কিকোতে যে ক’জন চিত্রশিল্পী সাহস দেখিয়ে সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে তুলি দিয়ে প্রতিবাদ করতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে ফ্রিদা কাহলো অন্যতম। ফ্রিদার পুরো নাম মাগদালেনা কারমেন ফ্রিদা কাহলো ই ক্যালদেরোন। ১৯২৯ সালে নিজের বয়সের প্রায় দ্বিগুণ বয়সি দিয়েগো রিভেরার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ফ্রিদা। যদিও বিবাহ-পরবর্তী দুজনারই কিছু অনৈতিক সম্পর্কের কারণে ১০ বছরের বেশি তাদের সংসার জীবন প্রলম্বিত হয়নি, তবুও তাদের জুটি ছিল সে-সময়ের সেরা। দিয়েগো ছিলেন তৎকালীন মেস্কিকোর নামকরা পেইন্টার। অন্যদিকে ফ্রিদা নতুন চিত্রশিল্পের পাইওনিয়ার। ফ্রিদা মূলত তার নিজস্ব প্রতিকৃতিগুলোর জন্য বিখ্যাত। তার মতো করে হয়তো কোনো শিল্পী এত নিখুঁতভাবে নিজেকে আঁকতে পারেননি। 
ফ্রিদার বিখ্যাত একটি আর্টওয়ার্কের নাম ‘দ্য টু ফ্রিদাস’। পাঠকের বোধগম্যতার জন্য ছবিটি নিচে যুক্ত করা হলো।
উক্ত ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে, দুজন ফ্রিদা পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে বসে আছেন। বামের জন ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান পোশাক পরিধান করে আছেন আর ডানের জন বলয় ভাঙতে উৎসুক এবং উত্তরাধুনিক পোশাক পরে আছেন। দুজনের উন্মুক্ত হৃদয় হৃৎপিণ্ডের একটি ধমনী দ্বারা সংযুক্ত। একই সময়ে বাস করেও দুটো সময়ের স্বাদ নেয়ার যে বাসনা, বলয় ভাঙার যে দ্রোহ, তা স্পষ্টতই ফ্রিদার শিল্পে লক্ষ করা যায়।
ফ্রিদার বাবার নাম ছিল গুইলেরমো কাহলো এবং তিনি একজন জার্মান-মেক্সিকান ফটোগ্রাফার ছিলেন। তার দুই কন্যার আরেকজনের নাম ক্রিস্টিনা কাহলো, যার ছবিও পরবর্তীতে ফ্রিদা এঁকেছিলেন এবং নাম দিয়েছিলেন ‘পোরট্রেইট অব ক্রিস্টিনা, মাই সিস্টার’। দিয়েগো রিভেরাও অবশ্য ক্রিস্টিনার ছবি এঁকেছিলেন। দিয়েগোর সঙ্গে ক্রিস্টিনার একটি অনৈতিক সম্পর্কও ছিল, যা দিয়েগোকে প্রচণ্ডভাবে ভালোবাসা ফ্রিদা কখনো মেনে নিতে পারেননি। দুঃখ, অভিমান, ক্ষোভ তিনি তুলি আর ক্যানভাসে এনে রাঙান। ‘মেমোরি, দ্য হার্ট’ চিত্রটি ফ্রিদার তখনই আঁকা।
এখানে দেখা যাচ্ছে যে, জলের পাশে একটি রক্তাক্ত হৃদয় পড়ে আছে- পেছনে ফ্রিদার বাল্যকালের স্মৃতি, বামে যৌবনের ক্ষত আর বর্তমানে সে নিজেই দাঁড়িয়ে। তিনটি সময়, তিনটি কাল যেন এক সুতো দিয়ে বাঁধা আছে। কী অসাধারণ সূ² অবলোকন ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং তৃতীয় দৃষ্টি থাকলে এমন চিত্র আঁকতে পারা যায়, তার বাস্তব প্রমাণ ফ্রিদা কাহলো।
১৮ বছর বয়সের আশপাশে ফ্রিদা একটি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। দীর্ঘ সময়ের জন্য তার শরীরের নিচের অংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। শুয়ে শুয়েই বুকের ওপর একটি ছোট টেবিল রেখে ফ্রিদা আঁকতেন। সে সময়ে ফ্রিদা প্রচণ্ড অমানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। তার মেরুরজ্জুতে একটা বড় ধরনের সার্জারি হয়, যার প্রতিবিম্বস্বরূপ ফ্রিদা ‘দ্য ব্রোকেন কলাম’ চিত্রটি এঁকেছিলেন-
ছবিটিতে ফ্রিদা এবারও নিজেকে উপস্থাপন করেছেন অন্তহীন বিষাদের রেখা টেনে। একটি লোহার দণ্ডসদৃশ বস্তু, বলা যায় মস্ত একটা সোর্ড চাকু তার স্পাইন বরাবর ঢুকে যাচ্ছে এবং মাথা চিরে উঠতে চাচ্ছে। আরো দেখা যায় পুরো শরীরজুড়ে অসংখ্য পেরেক।
বলে রাখা ভালো, ফ্রিদা নিজের যে সেল্ফ পোরট্রেইটগুলো এঁকে গেছেন, সেগুলোর মানের দিক থেকে খুব কম চিত্রশিল্পীই এগোতে পেরেছেন। তার সব কাজে একটা চাপা বিষাদ লুকিয়ে থাকে। ফ্রিদা তার চিত্রে নিজে যেমন, তার অধিক রঞ্জিত করে কিংবা ঈষৎ মলিন করেও কখনো নিজেকে উপস্থাপন করেননি নিজের প্রকৃত প্রতিকৃতি ছাড়া। এ সম্পর্কে বিখ্যাত একাডেমিক স্কলার নাতাশা স্টিড বলেছেন, ‘ফ্রিদার পেইন্টিংগুলো ছিল দারুণভাবে সৎ এবং ফ্রিদা কখনো নিজের থেকে অধিক রঞ্জিত করে কিছু আঁকেনি, যেটা সে আদতে ছিল।’
ফ্রিদা কাহলো তার ব্যক্তিজীবনে অনেক চিত্রের রূপরেখা টানলেও, অনেক সমৃদ্ধ শিল্প পৃথিবীকে উপহার দিলেও, তার একটি কাজকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করা হয়। তা হলো, ‘হোয়াট দ্য ওয়াটার গেভ মি’। এই চিত্রের মাধ্যমে ফ্রিদা তার সমগ্র জীবন ও স্মৃতিকে ক্যানভাসবন্দি করেছেন। পেইন্টিং টি লক্ষ করলে বোঝা যায়, ফ্রিদা বাথটাবে ধূসর পানিতে শুয়ে আছেন, তার পা লক্ষ করা যাচ্ছে এবং পানিতে বিম্বিত হচ্ছে তার জীবনের আমোদ, বেদনার ঘটনাগুলো। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখলে আরো দেখা যায়, জলে যেন ভাসছে কাহলোর জীবনের অবশিষ্টাংশ। একটি দ্বীপ রয়েছে যেখানে একটি আকাশচুম্বী অগ্ন্যুৎপাতের আগ্নেয়গিরি, একটি গাছের ওপরে একটি মৃত কাঠঠোকরা এবং একটি পাহাড়ের ওপর একটি ছোট কঙ্কাল। এই দ্বীপ থেকে একটি আঁটসাঁট দড়ি শুরু হয় যা টবের মাঝখানে একটি হীরের মতো আকৃতি তৈরি করে এবং অবশেষে একটি নগ্ন মহিলা চিত্রের ঘাড়ে জড়িয়ে যায়, যেটি ওফেলিয়ার মতো ভাসতে থাকে। এই মহিলার চিত্র থেকে, যিনি নিজেকে কাহলোকে প্রতিনিধিত্ব করেন, দড়িটি দ্বীপের কিনারায় থাকা একটি মুখবিহীন পুরুষের হাতে ফিরে আসে, যিনি মহিলাটিকে দেখছেন যে তিনি দূর থেকে শ্বাসরোধ করছেন। 
কতটা সূ²চিন্তা ও শৈল্পিক মন থাকলে এমন একটা মাস্টারপিস আঁকা যায় তা ফ্রিদা কাহলোকে দেখে অভিভূত হওয়া যায়।
ফ্রিদা কাহলোর কাজে মেক্সিকোর সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বেশ গুরুত্ব পেয়েছে, যার কারণে তার চিত্রকর্ম কখনো কখনো অর্বাচীন শিল্প বা লোকশিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার কাজকে পরাবাস্তববাদের অন্তর্গতও করা হয়েছে এবং ১৯৩৮ সালে পরাবাস্তববাদী আন্দোলনের প্রধান আঁদ্রে ব্রেটন, ফ্রিদার কাজকে ‘রিবন অ্যারাউন্ড এ বোম্ব’ আখ্যা দিয়েছিলেন। ফ্রিদা ব্রেটনের দেয়া পরাবাস্তববাদী আখ্যা অস্বীকার করেন। কেননা, তার মতে, তার চিত্রকর্মে পরাবাস্তবের চেয়ে তার বাস্তব অবস্থার প্রতিফলনই প্রবল। 
কাহলো তার জীবনদশায় কতটি চিত্রকর্ম করেছিলেন তার সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। যার পরিসংখ্যান ১৫০ থেকে ২০০-এর মধ্যে রয়েছে। তার প্রথম দিকের চিত্রকর্মগুলো, যা তিনি ১৯২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৈরি করেছিলেন, সেগুলো রেনেসাঁ মাস্টার্স এবং ইউরোপীয় অ্যাভান্ট-গার্ড শিল্পীদের দ্বারা প্রভাবিত। ফ্রিদা তার ছবির ধরনগুলো পরাবাস্তববাদ, সেখান থেকে উপাদানগুলোকে বাস্তবতার সঙ্গে মিশিয়ে ছবির মাধ্যমে বিকশিত করেছিলেন এবং প্রায়ই ব্যথা এবং মৃত্যুকে চিত্রিত করেছিলেন। 
১৯৫৪ সালের ১৩ জুলাই আনুমানিক ছয়টায় ব্যক্তিগত নার্স ফ্রিদাকে বিছানায় মৃত অবস্থায় আবিষ্কার করেন। কাহলোর ওষুধের ব্যবহার নিরীক্ষণ করে নার্স বলেছিলেন, কাহলো মারা যাওয়ার রাতে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ গ্রহণ করেছিলেন।
সুনাম, খ্যাতির মধ্য দিয়েও ফ্রিদা কাহলো নিঃসঙ্গ একাকী পাখিটার মতো চলে যান, বেছে নেন আত্মহননের পথ। তবে তার চিত্রকর্মগুলো পরবর্তীতে ব্যাপক বিশ্লেষণ ও গবেষণার দাবি সৃষ্টি করে, এমনকি করে চলেছে এখনও।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়