দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন : বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত ৮১ জন চেয়ারম্যান

আগের সংবাদ

সম্প্রীতির জমিনে শকুনের চোখ

পরের সংবাদ

সিলেট পাসপোর্ট অফিসে দুর্নীতি : পর্ব-২ : ‘দালালকে টাকা দিলে এমন ভোগান্তিতে পড়তাম না’

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৯, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৯, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

জাহিদুল ইসলাম, সিলেট ব্যুরো : সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের নিচ তলার একটি দেয়ালে কেউ একজন লিখে রেখেছেন- ‘কারো মরার ইচ্ছে হলে পাসপোর্ট অফিসে আসুন’, একজন লিখেছেন- ‘জীবনে যা পাপ করেছি তার ফল’, আরেকজন লিখেছেন- ‘সকাল ৬টা থেকে অপেক্ষা করে আছি, উৎসাহ পেলে আরো করব’। বিপরীত দিকের দেয়ালে লেখা- ‘বাংলাদেশে যত দুর্নীতি আছে, তার বেশির ভাগই পাসপোর্ট অফিসে হয়’। আবার কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালিও করেছেন।
পাসপোর্ট অফিসে দুর্নীতি আর জনদুর্ভোগের একাধিক অভিযোগ পেয়ে সরজমিন গিয়ে এমন চিত্রই দেখা যায়। সীমাহীন দুর্নীতিতে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে এখানে সেবা নিতে আসা হাজারো মানুষকে। আর ভোগান্তির শিকার সেবাপ্রত্যাশীরা তাদের ক্ষোভের সেকথা লিখে রেখে যাচ্ছেন পাসপোর্ট অফিসের দেয়ালে দেয়ালে।
অফিসের সামনে মামুনুর রশিদ নামের এক পাসপোর্টপ্রত্যাশীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি এসেছেন পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে। মামুন জানান, নানা ভোগান্তি শেষে অক্টোবরের ১৪ তারিখ আবেদন জমা দিয়েছেন তিনি। তবে আঙুলের ছাপ ও ছবি তুলতে পারেননি। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, তার জমা দেয়া চালানের টাকা ‘পেমেন্ট লক’ দেখাচ্ছে। গত এক সপ্তাহ থেকে তিনি রোজ সকাল-বিকাল পাসপোর্ট অফিস আর ব্যাংকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ক্ষুব্ধ মামুনুর রশিদ ভোরের কাগজকে বলেন, ‘আমার পাপ হয়েছে আমি নিজে নিজে আবেদন করতে এসেছি। দালালকে দেড় হাজার টাকা দিয়ে আবেদন করলে এমন ভোগান্তিতে পড়তাম না।’
একই সময়ে কথা হয় তোয়াহিদুর রহমান নামের এক ছাত্রের সঙ্গে। উচ্চশিক্ষার্থে বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন তিনি। তার বাবার নামের ‘ত’ এর স্থলে ‘ঔ’ লিখে দিয়েছে পাসপোর্ট অফিস। সেটি সংশোধনের জন্য ঘুরছেন দুমাস থেকে। তোয়াহিদুর বলেন, ‘গত দুমাস থেকে কখনো পরিচালক কখনোবা সহাকারী পরিচালক- এই করতে করতে আমার স্কলারশিপের সময় শেষ হতে চলেছে। ১০ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট না পেলে আমার বিদেশে গিয়ে লেখাপড়ার স্বপ্নই শেষ হয়ে যাবে। এমন অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে শেষ পর্যন্ত এক ট্রাভেল এজেন্টের শরণাপন্ন হয়েছি। পাঁচ হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছে। এখন বলছে দুদিনেই পাসপোর্ট পেয়ে যাব।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, পাসপোর্টপ্রত্যাশীদের ভোগান্তির শুরু হয় আবেদন জমা দেয়ার লাইন থেকে। কক্ষ নং-১০৮ এ আবেদন জমা দেয়ার জন্য পৃথক লাইনে দাঁড়াতে হয় পুরুষ মহিলা উভয়কেই। বেশির ভাগ সময়ই আবেদন জমা নেন উচ্চমান সহকারী দীপক কুমার দাশ। আবেদন ফরমে নির্দিষ্ট দালালের চিহ্ন (মার্কা) ছাড়া আবেদন জমা করতে এলে অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে বাতিল করে দেন আবেদন। কেউ কারণ জানতে চাইলে করেন দুর্ব্যবহার। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তুই-তোকারি করতেও ছাড়েন না এই কর্মকর্তা। ধমকের সুরে বলেন, ‘নিজে নিজে ফিলআপ করেন কেন? ট্রাভেল এজেন্টে যেতে পারেন না?।’
ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে যখন কেউ আবেদন জমা দিতে না পেরে উল্টো দুর্ব্যবহারের শিকার হন তখন স্বাভাবিকভাবেই ঝামেলা বাধে। প্রতিদিনই এসব নিয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আর নিরুপায় হয়েই নিজেদের অনুভূতি পাসপোর্ট অফিসের দেয়ালে লিখে রাখেন ভুক্তভোগীরা। তবে নিজেদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার না করে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের উচ্চমান সহকারী দীপক কুমার দাশ এই প্রতিবেদককে অফিসে গিয়ে দেখা করতে বলেন। ‘মার্কা’ (দালালদের দেয়া বিশেষ চিহ্ন) ছাড়া পাসপোর্ট আবেদন কেন গ্রহণ করা হয় না, পাসপোর্টপ্রত্যাসীদের নানা অজুহাতে কেন ঘোরানো হয়- এসব প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার আসলে মনে নেই কী হয়েছে। আপনি অফিসে আসেন বসে আলাপ করব।’ এ ব্যাপারে ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন-আটাব-এর সিলেট অঞ্চলের সাবেক সহসভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল বলেন, ‘এমন অভিযোগ ভুরিভুরি। আমি নিজেও বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি। ট্রাভেল ব্যবসা করি বলে প্রতিদিনই পরিচিতজন আসেন নানা অভিযোগ নিয়ে।’ পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা না চাইলে এই ভোগান্তির কোনো প্রতিকার নেই বলে জানান তিনি।
এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সম্পাদক ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আমরা শুনে আসছি দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। কিন্তু বাস্তবে আমরা এর কোনো প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি না। সিলেট পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতি এখন ওপেন সিক্রেট। এরা কাউকে তোয়াক্কা করেন না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এখানেও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’ তিনি আরো বলেন, ‘অতীতেও এ রকম অনেক ব্যাপারেই প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করার পর সমাধান হয়েছে। আমরা আশা করব দ্রুতই সিলেট পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতি বন্ধ হবে এবং জনদুর্ভোগও কমে আসবে।’

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়