×

মতামত

অন্তর্বর্তী সরকারের টিকার অব্যবস্থাপনায় শিশুমৃত্যুর মিছিল

Icon

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৪ এএম

অন্তর্বর্তী সরকারের টিকার অব্যবস্থাপনায় শিশুমৃত্যুর মিছিল

অন্তর্বর্তী সরকারের টিকার অব্যবস্থাপনায় শিশুমৃত্যুর মিছিল

দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। প্রতিদিনই সংবাদপত্রে নতুন মৃত্যুর খবর যোগ হচ্ছে, আর তাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক গভীর সংকট। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে একটি মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে ঘটেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাকি দুই শিশুও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে মৃতের সংখ্যা খুব দ্রুতই ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

একটি সভ্য সমাজে শিশু মৃত্যুর মতো ঘটনা গভীর আলোড়ন তৈরি করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই ঘটনাগুলো যেন আমাদের সামাজিক সংবেদনশীলতাকে আর তেমন নাড়া দিচ্ছে না। কোথাও তীব্র প্রতিবাদ নেই, নেই জাতীয় পর্যায়ে জরুরি আলোচনার উদ্যোগ। এমনকি জাতীয় সংসদেও বিষয়টি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এখনো হয়নি। এটি শুধু উদাসীনতার নয়, বরং একটি বিপজ্জনক সামাজিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছে শত শত শিশু, এবং ইতোমধ্যে বহু শিশুর মধ্যে রোগটি শনাক্ত হয়েছে। অথচ খুব বেশিদিন আগেও বাংলাদেশে হাম প্রায় নিয়ন্ত্রণে ছিল। গত দেড় দশকে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। তাহলে হঠাৎ করে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো কেন?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মূল কারণ টিকাদান কার্যক্রমে গুরুতর গাফিলতি। বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হওয়ায় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হয়েছে। সময়মতো টিকা মজুত না থাকায় বহু শিশু নির্ধারিত বয়সে প্রয়োজনীয় টিকা পায়নি। এর ফলে তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি, যা আজকের এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই দায় এককভাবে বর্তমান পরিস্থিতির ওপর চাপানো যায় না। বরং এটি একটি ধারাবাহিক ব্যর্থতার ফল, যেখানে পূর্ববর্তী নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে অধ্যাপক ইউনুসের অন্তবর্তী সরকারের অদক্ষ পরিকল্পনায় হাম ও রুবেলার টিকার ঘাটতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব এখন দৃশ্যমান।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত অনেক শিশুর বয়স ৯ মাসের কম। সাধারণত এই বয়সের আগে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয় না। কিন্তু এখানেই আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান-ভিটামিন ‘এ’। গবেষণা ও চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা বলছে, নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণ করলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং হামের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, গত কয়েক বছরে ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহেও বড় ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ছয় মাস পরপর ভিটামিন ‘এ’ দেওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবে বজায় রাখা হয়নি। কোথাও নয় মাস, কোথাও এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে এই গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লিমেন্ট ছাড়াই। ফলে শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা তাদের হামের মতো রোগের কাছে দুর্বল করে তুলেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রমে স্থবিরতা। স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ব্যবস্থার এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরটি ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর থেকে কার্যকর না থাকায় বহু শিশু মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। ফলে রোগ প্রতিরোধ তো দূরের কথা, প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ একসময় টিকাদান কর্মসূচির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। সম্প্রসারিত টিকা কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশটি একটি উদাহরণ স্থাপন করেছিল। রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও অতীতের রাজনৈতিক সরকারগুলো এই খাতকে গুরুত্ব দিয়েছে, এবং সাধারণ মানুষও টিকা গ্রহণে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ব্যর্থতা সেই অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেষ করে ইউনুস সরকারের উদাসীনতার শিকার আজ এত এত শিশু, এত এত পরিবার। 

বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ব্যর্থতা ও অনিয়ম খতিয়ে দেখা হবে। কিন্তু শুধু তদন্তের ঘোষণা দিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত এবং কার্যকর পদক্ষেপ।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো-টিকাদান কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা, ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ নিশ্চিত করা, এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে সচল করা। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শিশুর জীবন শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।

শিশুমৃত্যুর এই মিছিল আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। এখনই যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই দায় নির্ধারণের পাশাপাশি কার্যকর সমাধানের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।

লেখক: সাংবাদিক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মার্কিন অবরোধে ২১ জাহাজ

মার্কিন অবরোধে ২১ জাহাজ

প্রাইভেট কারের ধাক্কায় পথচারী নিহত

নোয়াখালী প্রাইভেট কারের ধাক্কায় পথচারী নিহত

তুরস্কে বাংলাদেশ-পাকিস্তান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক

তুরস্কে বাংলাদেশ-পাকিস্তান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক

দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজ কি মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়?

দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজ কি মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়?

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App