তৃষ্ণার্ত পেটে সিন্ডিকেটের ছোবল: লেবু এখন বিলাসী পন্য!
এস এম ফয়েজ
প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:০৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
রমজান আসে সংযম আর শুদ্ধির বার্তা নিয়ে, কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে রমজান মানেই পকেট কাটার মহোৎসব। ইফতারের প্রশান্তি যে এক গ্লাস লেবুর শরবত, সেই সাধারণ স্বপ্নটুকু এখন মধ্যবিত্তের নাগালে নেই। পাতি লেবু এখন আক্ষরিক অর্থেই 'সোনার হরিণ'। বাজারজুড়ে অস্থিরতা, সাধারণের চোখে মুখে উদ্বেগ আর অসাধু চক্রের পকেটে ঢুকছে কোটি কোটি টাকা।
দামের কারসাজি ও কৃত্রিম সংকট:
সাধারণত বছরের অন্যান্য সময়ে যে লেবু ৫-১০ টাকায় এক হালি পাওয়া যায়, রমজান আসতেই তার দাম লাফিয়ে ছাড়িয়েছে শতকের ঘর। এটি কেবল চাহিদার ওপর নির্ভর করে বাড়ছে তা ভাবা বোকামি। বরং পাইকারি আড়ত থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’ চক্র পুরো সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করছে। কোল্ড স্টোরেজ বা বাগানে মজুত রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করাই এদের মূল অস্ত্র।
দিশেহারা ক্রেতা ও নিরুপায় দীর্ঘশ্বাস:
বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। আশি থেকে একশ টাকা দিয়ে এক হালি লেবু কেনা অনেকের কাছেই এখন বিলাসিতা। নিম্নবিত্তের পাতে তো লেবু অনেক আগেই দূরস্ত হয়েছে, এখন মধ্যবিত্তরাও লেবুর দোকানে দাঁড়িয়ে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। ইফতারির প্লেটে এক টুকরো লেবু না থাকাটা কেবল একটি ফলের অভাব নয়, বরং সাধারণ মানুষের অধিকার হরণের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদারকির অভাব ও চোর-পুলিশ খেলা:
প্রতিবছর ঘটা করে বাজার মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়, ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। প্রশাসনের অভিযান শেষ হতে না হতেই ব্যবসায়ীরা পুনরায় দাম বাড়িয়ে দেয়। সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য যে টেকসই উদ্যোগ এবং কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন, তার অভাবেই বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে এই বাজার-দস্যুরা।
নৈতিকতার দুর্ভিক্ষ:
সবশেষে প্রশ্ন ওঠে আমাদের সামাজিক ও ব্যবসায়িক নৈতিকতা নিয়ে। যেখানে বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে উৎসব বা ধর্মীয় উপলক্ষ্যে পণ্যের দাম কমানো হয়, সেখানে আমাদের দেশে উল্টো চিত্র। এটি কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং চরম নৈতিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ।
রোজা আসলে লেবুর দাম আকাশচুম্বী হবে—এই অলিখিত নিয়ম বন্ধ হওয়া জরুরি। সিন্ডিকেটের বিষদাঁত এখনই না ভাঙলে সাধারণ মানুষের হাহাকার কেবল বাড়তেই থাকবে। বাজার নিয়ন্ত্রণ কেবল জেল-জরিমানায় সীমাবদ্ধ না রেখে, সরবরাহ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং জনগণের সচেতনতাই পারে এই ‘সোনার হরিণ’ লেবুকে সাধারণের ডাল-ভাতে ফিরিয়ে আনতে।
লেখক:
এস এম ফয়েজ
সিনিয়র সাংবাদিক
