ইরান-আমেরিকার অস্ত্রভাণ্ডার কি কমে আসছে?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ১০:৩৮ এএম
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের প্রায় অফুরান ভাণ্ডার রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, শত্রুকে প্রতিরোধ করার সক্ষমতা তাদের ধারণার চেয়েও বেশি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ফলাফল শুধু অস্ত্রের মজুদের ওপর নির্ভর না করলেও অস্ত্রের সংখ্যা বড় একটি নির্ধারক।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, রাশিয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের দিক থেকে অনেক আগেই ইউক্রেনকে ছাড়িয়ে গেলেও যুদ্ধ এখনো চলছে। একইভাবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত জোটের মধ্যে চলমান সংঘাতও শুরু থেকেই তীব্র মাত্রায় চলছে। দুই পক্ষ দ্রুতগতিতে অস্ত্র ব্যবহার করছে, কিন্তু একই হারে নতুন অস্ত্র উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইনস্টিটিউট অব ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইতোমধ্যে দুই হাজারের বেশি হামলা চালিয়েছে, যেখানে একাধিক বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে। অপরদিকে ইরান ৫৭১টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,৩৯১টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, যদিও এর অনেকগুলোই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আটকে দেওয়া হয়েছে।
আরো পড়ুন : ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল কেনায় সাময়িক ছাড় যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার
পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে ইরান যে হারে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছিল, এখন তা অনেক কমে গেছে। প্রথম দিনে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলেও বর্তমানে তা কয়েক ডজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের কাছে প্রায় দুই হাজারের বেশি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে কোনো দেশই তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের সঠিক পরিমাণ প্রকাশ করে না।
মার্কিন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ড্যান কেইন জানিয়েছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের হার প্রথম দিনের তুলনায় প্রায় ৮৬ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে ড্রোন হামলার সংখ্যাও প্রায় ৭৩ শতাংশ কমে গেছে।
ধারণা করা হয়, ইরান যুদ্ধের আগেই হাজার হাজার একমুখী হামলা চালাতে সক্ষম শাহেদ ড্রোন তৈরি করেছিল। এই প্রযুক্তি তারা রাশিয়াকেও সরবরাহ করেছে, যা ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান এখন ইরানের আকাশসীমায় আধিপত্য বিস্তার করেছে। ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ফলে পরবর্তী পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ঘাঁটি, অস্ত্রভাণ্ডার ও উৎপাদন কারখানা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের প্রায় তিনগুণ বড় দেশ হওয়ায় ইরান সহজেই অনেক অস্ত্রভাণ্ডার গোপনে লুকিয়ে রাখতে পারে। তাই সব অস্ত্র ধ্বংস করা সহজ হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের অবস্থা
বিশ্বে সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। তাদের কাছে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় প্রচলিত অস্ত্রের মজুদ বেশি। তবে মার্কিন বাহিনী তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল ও অত্যাধুনিক নির্ভুল অস্ত্রের ওপর বেশি নির্ভর করে। এগুলো কম সংখ্যায় তৈরি হয় এবং দ্রুত শেষ হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
এ কারণেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক ডেকেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বোঝা যায় যে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে মার্কিন বাহিনী দীর্ঘপাল্লার ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম দামের জেডিএএম বোমা ব্যবহার করছে, যা সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে নিক্ষেপ করা যায়।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় চাপ
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ মার্ক ক্যানশিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হাজার হাজার জেডিএএম বোমা থাকলেও ব্যয়বহুল বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরবরাহ সীমিত।
বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার চাহিদা খুব বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও তাদের আরব মিত্র ও ইউক্রেনও এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। প্রতিটি প্যাট্রিয়ট মিসাইলের দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলারের বেশি।
আরো পড়ুন : আমাকে না বলে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করলে ইরানে আবার যুদ্ধ: ট্রাম্প
ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বছরে প্রায় ৭০০টি প্যাট্রিয়ট মিসাইল তৈরি করতে পারে এবং বর্তমানে তাদের কাছে প্রায় ১,৬০০টির মতো মজুদ রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এই মজুতেও চাপ পড়তে পারে।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জোর দিয়ে বলেছেন, সামরিক শক্তির দিক থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টিকতে পারবে না। অস্ত্রের দিক থেকে তার এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক বাস্তবতার কাছাকাছি বলেই মনে করছেন।
