×

মুক্তচিন্তা

পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর যাপিত জীবন

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৩, ১২:২৮ এএম

পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর যাপিত জীবন
পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর যাপিত জীবন
পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর যাপিত জীবন
পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর যাপিত জীবন
স্মরণাতীত কাল থেকেই এ দেশে বিশেষ করে পাহাড় এবং অরণ্যে ঘেরা পার্বত্য জেলাগুলোর বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করে আসছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জাতিগুলো। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করতে করতে তারা আয়ত্ত করে ফেলেছে কীভাবে এমন পাহাড় এবং অরণ্যময় পরিবেশে জীবনযাপন করতে হয়। একসময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের অনেককেই পার্বত্য চট্টগ্রামের লাগোয়া সমতলের বাজারগুলোতে দেখা যেত পাহাড়ে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিক্রি করতে আসতে। বিশেষ করে পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি হচ্ছে চাকমা নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত জায়গা। এই চাকমা নৃগোষ্ঠীর রাজার প্রথম নিবাস ছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রানীরহাট এবং রাজারহাটে। রানীহাট এবং রাজারহাট ছিল সমতলে। মূলত তৎকালীন চাকমা রাজা তার প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য উক্ত জায়গায় বসবাস করতেন। রানীরহাটের সঙ্গে লাগোয়া পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলা। তৎকালীন সময়ে উক্ত উপজেলার তারাবুনিয়া, বেতছড়ি, রইস্যাবিলি ইত্যাদি জায়গা থেকে চাকমা নৃগোষ্ঠীর লোকেরা রানীরহাটে আসত কলা, পেঁপে, পাহাড়ি মুরগি, মহিষের দই, বিন্নি চাল, বিভিন্ন শাক-সবজি বিক্রি করতে। চাকমা নৃগোষ্ঠীর এসব মানুষ অনেক দূর থেকে হেঁটে রানীরহাট বাজারে আসত আর এর সবই বিক্রি করে সন্ধ্যায় ফিরে যেত তাদের পাহাড়ের আবাসে। সঙ্গে করে কিনে নিয়ে যেত কেরোসিন আর লবণ। মূলত পাহাড়ে তৎকালীন সময়ে বৈদ্যুতিক আলো ছিল না বলে কেরোসিনের খুব প্রয়োজন হতো। তাছাড়া পাহাড়ে লবণ উৎপাদন হয় না আর তাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ এ দুটো জিনিসের জন্যই সমতলের বাজারগুলোতে আসত। এখন সমতলের কোথাও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের তেমন একটা দেখা যায় না। এখন পার্বত্যাঞ্চলের নৃগোষ্ঠীগুলো নিজেরাই পাহাড়ে জুমচাষ করে উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রী নিজেদের হাটেই বিক্রি করে এবং নিজেরাই তা কেনাবেচা করে। তাদের উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে জুমের করলা, ছোট বেগুন, তিত করলা, বাঁশ কোড়ল, মারফা, টকপাতা, সাবারাং, জুমের ধনেপাতা, কলা, লেবু, পেয়ারা, বিভিন্ন জাতের আম, তরুনজা, আনারস, মালটা, কমলা, ড্রগন ফল, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, আলু, পেঁপেসহ আরো নানাবিধ সবজি এবং ফলমূল। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এসব শাক-সবজি এবং ফলমূল তারা পাহাড়ে জন্মায় কোনো ধরনের কীটনাশক ছাড়া। জুমের মধ্যে করা সব সবজি এবং ফলমূলই শতভাগ খাঁটি এবং ফরমালিনমুক্ত। এর বাইরে নৃগোষ্ঠীর মানুষরা আমিষের চাহিদা মেটানোর জন্য পাহাড়ে পুকুর খনন করে সেখানেই মাছের পোনা ছাড়ে। তাছাড়া পাহাড়ের ঝিরি থেকে ছোট ছোট চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ছোট ছোট মাছ ধরে রান্না করে খায়। ঝিরির ছোট চিংড়ি দিয়ে তারা শুঁটকিও বানায় এবং তা বাজারে বিক্রি করে। মাংসের মধ্যে শূকরের মাংস এদের বেশ প্রিয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার হচ্ছে নাপ্পি। নাপ্পি হচ্ছে বিভিন্ন ঝিরি কিংবা সাগর থেকে ধরে আনা কাঁচা চিংড়ি খোলা মাঠে ১২ ঘণ্টা রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়। ওই শুঁটকি ঘরে নিয়ে ঢেঁকিতে চূর্ণ করা হয়। এই গুঁড়া করা শুঁটকির সঙ্গে পানি, লবণ ও নানা দ্রব্য মিশিয়ে তৈরি করা হয় নাপ্পি। বিশেষ করে বাঁশ কোড়ল দিয়ে নাপ্পি রান্না এরা বেশ পছন্দ করে। এদের আরো একটি পছন্দের খাবার আছে তা হচ্ছে সিদল। সিদল হচ্ছে, শুঁটকি ও কচুর ডাঁটা দিয়ে বড়ার আকৃতির সিদল। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রংপুর, বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলের গ্রাম-বাংলায় মুখরোচক খাবার হিসেবে জনপ্রিয় এই সিদল। ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে পুঁটি মাছের ভেজা শুঁটকিকে চ্যাপা শুঁটকি/হুটকি বলা হয়। সিলেট অঞ্চলে এই চ্যাপা শুঁটকিই সিদল নামে পরিচিত। ২০২০ সালের তথ্যমতে বাংলাদেশের ৫০টি জাতিসত্তার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগোষ্ঠী চাকমাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৪ লাখ ৮৩ হাজার ২৯৯। সংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামেরই দুই জাতিগোষ্ঠী মারমা ও ত্রিপুরা। মারমাদের সংখ্যা ২ লাখ ২৪ হাজার ২৬২ আর ত্রিপুরাদের সংখ্যা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭৮। চতুর্থ স্থানে আছে সমতলের জাতিগোষ্ঠী সাঁওতাল। তাদের সংখ্যা ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৯ জন। জেলার নিরিখে দেশে রাঙ্গামাটিতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ জেলায় এসব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৭২ হাজার ৮৬৪। এরপরই আছে আরেক পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি। এখানে জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৮। মূলত বাংলাদেশের বিশেষ করে পার্বত্য জেলাগুলোয় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষরা বেশ বিচিত্র জীবনযাপন করে। জীবনযাপনের জন্য যা কিছু দরকার সবকিছুই তারা পাহাড় থেকেই সংগ্রহ করে। পার্বত্যাঞ্চলের নৃগোষ্ঠীরা অধিক শিক্ষিত হলেও তারা পাহাড়ে জুমচাষ করে মা-বাবাকে সাহায্য করে এবং তাদের ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছে যুগের পর যুগ। ফলে তাদের কাছে এখন পাহাড় হয়ে গেছে আত্মার আত্মীয়। পাহাড়ে এখন নৃগোষ্ঠীদের হাতে ছোঁয়ায় সোনা ফলে। আত্মনির্ভরতার প্রতীক এখন পাহাড়ের নৃগোষ্ঠীগুলো। তাদের ত্যাগ এবং ঘামেই পাহাড় আজ শক্ত অর্থনীতির বুনিয়াদে পরিণত হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করব সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে আরো সাহায্য সহযোগিতা করবে। পাহাড়ে উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রী বাইরের দেশে যাবে। এতে আমরা অর্জন করব প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। নৃগোষ্ঠীদের জীবনমানের আরো স্বাছন্দ্য ফিরে আসবে। রতন কুমার তুরী : লেখক ও শিক্ষক, ঢাকা। turiratan49@gmail.com

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

অতিথিরা যেতেই ফাঁকা ভূমি সেবা মেলার স্টল

নামমাত্র ভূমি সেবা মেলা অতিথিরা যেতেই ফাঁকা ভূমি সেবা মেলার স্টল

কুরবানির পর হামের টিকার দ্বিতীয় ধাপের ক্যাম্পেইন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

কুরবানির পর হামের টিকার দ্বিতীয় ধাপের ক্যাম্পেইন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ওয়াহাব আকন্দকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান তৃণমূল

ওয়াহাব আকন্দকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান তৃণমূল

ট্রেনের ছাদে লুকিয়ে রাখা স্কুল ব্যাগে মিলল গাঁজা

ট্রেনের ছাদে লুকিয়ে রাখা স্কুল ব্যাগে মিলল গাঁজা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App