মৃত্যুর মুখ থেকে যেভাবে ফিরলেন ১৫ জেলে
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৩, ১১:১২ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সাগরে হঠাৎ ঝড়। ১০তলা সমান বিশাল বিশাল ঢেউ। চারদিকে ঢেউয়ের সফেদ ফনা। তার মাঝে ট্রলারে আছে ১৯ জন জেলে। ট্রলারটি ঢেউয়ের তোড়ে পেন্ডুলামের মতো দুলছে। মৃত্যু যেন ডাকছে তাদের। জীবিকার তাগিদে সাগরে যাওয়া জেলেরা তখন জীবন নিয়ে শঙ্কায়। তবু তারা হাল ছাড়েনি। সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাগরের সঙ্গে হেরে যায় তারা। একপাশে হেলে পড়ে ট্রলার। ধীরে ধীরে জলের ভিতরে ডুবে যাচ্ছে টিকে থাকার শেষ আশ্রয়টুকু। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও প্রিয়জনদের মুখের স্মৃতি নিয়ে তলিয়ে যেতে থাকেন অনেকে। কেউ কেউ ভেসে আসেন। বেঁচে আছেন তাদের কেউ কেউ।
এই লোমহর্ষক ভয়াল ঘটনার কথা বলেছিলেন বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কবলে পড়া তন্বী ট্রলারের জেলেরা। গত বছরের ২০ অক্টোবর মাছের সন্ধানে ভোলার চরফ্যাশন থেকে গভীর সাগরের উদ্দেশে রওনা দেন তারা। চার-পাঁচদিন ভালোভাবে যাচ্ছিল। ২৫ অক্টোবর সাগরে সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। তখন শুরু হয় তাদের টিকে থাকার লড়াই।
ভাসতে ভাসতে বেঁচে যায় মো. ইমাম (২৫)। এই দুর্ঘটনায় তার ৩ ভাইসহ পরিবারের ৫ জন সাগরে সলিল সমাধি বরণ করেছেন। গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার ইউনিটিতে সেই ভয়াল অভিজ্ঞতার কথা শুনি তার কাছে। গলার আওয়াজে নেই ফিরে আসার আনন্দ। আলাপকালে বোঝা যায় শোক স্পষ্ট। তিনি বলেন, ভোলার চরফ্যাশনের নুরাবাদ ঘাট থেকে ১৮ অক্টোবর বিকালে গভীর সাগরে উদ্দেশ্যে রওনা দেই। ২৫ অক্টোবর বিকাল সাগরে ঝড়ে উঠে। চারদিক অন্ধকার। মনে হচ্ছে কুয়াশা ঘিরে ধরেছে। বোটে ছিলাম ১৯ জন। বড় বড় ঢেউ। বোট দুলছে। আমরা লাইফ জ্যাকেট, গ্যাস ট্যাংকি নিয়ে অপেক্ষা করছি। ট্রলারের জেলেরা ঘণ্টা দেড়েকের মতো ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে। এক সময় সাগরের পানি ট্রলারে উঠে আসে। কিছুক্ষণ ট্রলারটি টিকে ছিল। এরপর আস্তে আস্তে হেলে পড়ে।
এইটুকু বলতেই হাত দিয়ে চোখের জল মুছে। আমিও কল্পনা করছিলাম সেই ঘটনা। কয়েক মিনিটের নিরবতা। এরপর বললেন, ট্রলার ডুবে যাচ্ছে। আমরা যে যা পাইছি সেটা ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টায় ভেসে আছি- কাঠ, কন্টেইনার, কাঠের পাটাতন হবে। লাইফ জ্যাকেট ছিল। এভাবে কয়েক ঘণ্টা আমরা একসঙ্গে ছিলাম। ধীরে ধীরে সাগরে তলিয়ে যায় কয়েকজন।
মো. ইমামের যখন কথাগুলো বলেছিলেন তখন পাশে ছিলেন আরেক জেলে ইমাম হোসেন (৩০)। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, দলে একসঙ্গে অনেকে ছিলাম। ঝড়ের মধ্যে একে অন্যকে ছাড়ি নাই। আস্তে আস্তে দলছুট হতে লাগলো অনেকে। লবণাক্ত পানি। গায়ের চামড়া দিয়ে রক্ত ঝরছে। সহ্য করতে কষ্ট হচ্ছিল। ক্ষুধা ও পানি তৃষ্ণায় দুয়েকজনকে মরে যেতে দেখেছি। আমি ভেঙে পড়লাম। সাহস হারিয়ে ফেলেছি। আমার দুই সন্তানের মুখ চোখে ভেসে উঠছে। ওদের নাম ধরে শুধু পানি পানি বলে চিৎকার করছি। এভাবে ভেসে ভেসে ছিলাম দুই দিন তিন রাত। সেই দুঃখ দিনের কথা মনে করে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা দুলাল মিয়া বলেন, সাগরে যখন ঝড় উঠে তখন সামনে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। আমাদের মাঝি ট্রলারটি বাঁচাতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় চেষ্টা করেছে। কিন্তু চারদিক থেকে এমনভাবে ঢেউ আসতে থাকে যে ট্রলার একপাশ হয়ে যায়। তারপর ট্রালারটি উল্টে যায়। ডুবে যেতে থাকে।
যেভাবে উদ্ধার : বেঁচে যাওয়া দুলাল মিয়া বলেন, ট্রলার ডুবার পর জেলেরা আলাদা হয়ে যাই। সাগরে একটি কলাগাছ খুঁজে পাই। আমরা ছয়জন সেটি ধরে ভেসে থাকি। ঘুম নেই, খাওয়া নেই, পানির পিপাসা। এক সময় ভেসে থাকা কলাগাছ খেতে থাকি। শুধু একটি বোট বা নৌকার প্রতীক্ষায়। বেচেঁ থাকব এমন আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। এ সময় ২৮ অক্টোবর রাতে হঠাৎ একটি ভারতের জেলেদের নৌকা দেখতে পাই। পরে জানলাম এটির নাম মা গঙ্গা। এটি আমাদের সাগর থেকে উদ্ধার করে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে আমাদের হাত-পা কেটে যায়। রক্ত পড়ে।
ইমান হোসেন বলেন, যখন জেলেরা আমাদের উদ্ধার করে তখন মাত্র দুইজনের হুঁশ ছিল। ওই জেলেরা আমাদের ওড়িষ্যার একটি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করায়। তারা পরে ডুবে যাওয়া অন্য ট্রলারের আরো পাঁচজনকে উদ্ধার করে। ১০ দিন চিকিৎসার পর আমাদের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যায়। তন্বী ট্রলারের ১৯ জনের মধ্যে মাত্র ১১ জন বেঁচে আছি। অন্যরা বেঁচে আছে কিনা জানি না। এই জেলেরা বেঁচে আছেন এমন সংবাদ পাওয়ার পর তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে বাংলাদেশের ছাবেরা ফাউন্ডেশন। তাদের এই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়। সাবেরা ফাউন্ডেশনের সভাপতি ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, সিত্রাং ঘূর্ণিঝড়ে ১৫টি পরিবার তাদের স্বজনদের হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। ঘটনাটি জানার পর আমি বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহযোগিতায় ১৫ জেলেকে ভারতের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে উদ্ধার করি। গত শুক্রবার তাদের ফিরিয়ে আনা হয়। এখনো আরো ৩ জন ভারতে আছে। তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই পরিবারগুলো যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে সেজন্য সরকারে পর্যাপ্ত অনুদানের দাবি জানান তিনি।
