বিপর্যস্ত বৈশাখী অর্থনীতি
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২০, ১১:৪৬ এএম
পহেলা বৈশাখের মেলা/ ফাইল ছবি
বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম উৎসব পহেলা বৈশাখ ঘিরে। প্রতি বছর এই সময়ে গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র থাকে উৎসব আয়োজনের ব্যস্ততা। মাটির হাঁড়ি থেকে শুরু করে পোশাক, মুড়িমুড়কি, নাড়ু, মিষ্টি, ইলিশের বাজারসহ সবখানেই সাজ সাজ রব পড়ে যায়। এসব আয়োজন ঘিরে চাঙ্গা হয়ে ওঠে অর্থনীতি। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে আজ সবই মলিন। বন্ধ রয়েছে বৈশাখীর সব আয়োজন। আর এতে ক্ষতিগস্ত হচ্ছেন ছোট ব্যবসায়ীরা। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার কোনো পথ না পেয়ে তাদের মধ্যে বিরাজ করছে হাহাকার। বাংলাদেশ দোকান মালিক সূত্র জানায়, বৈশাখের বাজারে দেশীয় বাঁশ, বেত, কাঠের তৈরি জিনিস, মাটির তৈজসপত্র, খেলনা, প্লাস্টিকের খেলনা, বিভিন্ন ধরনের মুড়িমুড়কি, নাড়ু বাজারেই বিক্রি হয় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার। এর বাইরে আরো প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার অন্য পোশাক বিক্রি হয় বৈশাখী বাজারে। এছাড়া ইলিশের বিকিকিনি হয় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার। একইভাবে মিষ্টির দোকানগুলোয় বৈশাখে বিক্রি হয় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার মিষ্টি। সবমিলে বৈশাখে কেবল পোশাক বিক্রি হয় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার। বৈশাখী উৎসব ঘিরে আর্থিক লেনদেন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হয়। এ সময় বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো তাদের এটিএম, ক্রেডিট কার্ড ও ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবস্থায় অর্থের পর্যাপ্ত জোগান রাখে। মোবাইল ব্যাংকিং ও পোস্ট অফিসের মাধ্যমেও লেনদেন বাড়ে। গত দুই বছর ধরে পহেলা বৈশাখকে ঘিরে সারাদেশে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য হয়েছে। এ বছর সেটি আরো বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে সব বন্ধ হয়ে গেছে। করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পহেলা বৈশাখের পর ঈদ বাণিজ্যেও বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন ব্যবসায়ীরা। এসব বিষয়ে ভোরের কাগজকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে বর্ষবরণ উৎসব বন্ধসহ মার্কেট-দোকানপাট বন্ধ থাকায় ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ক্ষতি অপূরণীয়। পহেলা বৈশাখের পণ্য অন্য সময় বিক্রি হয় না। এক বছর পরে আর এ পণ্যের চাহিদা থাকে না। অনেক ব্যবসায়ী এবার পথে বসে যাবে। তাই এ অপূরণীয় ক্ষতি কীভাবে সামলে উঠবেন সে চিন্তায় দিশেহারা ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, সব ব্যবসাই বন্ধ। এই পরিস্থিতিতে এখন আর ব্যবসার কথা চিন্তা করা যাবে না। জীবন বাঁচানোর চিন্তা করতে হবে। তবে সরকার যে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্যাকেট ঘোষণা করেছে সেখান থেকে ১৫ জন থেকে তার নিচে যে সব প্রতিষ্ঠানে রয়েছে তাদের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছি। কারণ এ মুহূর্তে আমাদের দোকানপাট বন্ধ থাকায় কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারছি না। কারণ আমরা ক্যাশ টাকায় ব্যবসা করি। তাই ব্যাংকঋণ নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কাও রয়েছেন। জানা গেছে, পহেলা বৈশাখের এই উৎসবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তারা। কারণ এ সময় সারাদেশের বাজারে এসএমই খাতের ব্যবসায়ীদের পণ্যই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। গতবারের চেয়ে এবার ব্যবসার ২০ শতাংশ বেশি প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু করোনার কারণে সবকিছু ভেস্তে গেছে। পহেলা বৈশাখের সঙ্গে হালখাতার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হালখাতায় ক্রেতা ও গ্রাহকদের মিষ্টি-নিমকি খাওয়ান ব্যবসায়ীরা। আধুনিক যুগে হালখাতা উৎসবের জৌলুস অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। তারপরও মিষ্টি খাওয়ানোর প্রচলনটা অনেকেই ধরে রেখেছেন। সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান। তারা তাদের গ্রাহকদের নববর্ষের উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে মিষ্টিকে রাখেন সবার ওপরে। বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ না থাকলেও ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরে বর্ষবরণে পান্তা-ইলিশ অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ফলে নগরবাসীর মধ্যে ইলিশ কেনার এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। বাড়তি ইলিশের জোগান দিতে দেড়-দুই মাস আগে থেকে মাছ মজুত করেন ব্যবসায়ীরা। তারপরও মাছটির দাম আকাশ ছুঁয়ে যায়। এবারো সে রকম প্রস্তুতি নেয়া ছিল। কিন্তু করোনার আঘাত এবার সব ফিকে হয়ে গেছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বৈশাখ কেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত তারা ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোক্তা। তারা এককভাবে একটা ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তা নির্বাচন করে তাদের সহায়তা দেয়া প্রয়োজন।
