দেশীয় কোম্পানিই তৈরি করছে সম্ভাব্য কিছু ওষুধ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২০, ০৯:৩৪ এএম
করোনাভাইরাসের ওষধ/ ছবি: ইন্টারনেট
কোভিড-১৯ আতঙ্কে তটস্থ পুরো বিশ্ব। চীনের উহান থেকে উৎপত্তি হওয়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস ঘুম কেড়ে নিয়েছে ধনী-গরিব সবার। এর প্রকোপ থেকে বাঁচার উপায় বের করতে দিন-রাত গবেষণা করে যাচ্ছেন বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। এই কাজে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। নিজেদের সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের গবেষকরাও এ নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন। জানার চেষ্টা করছেন কোন ওষুধে কাবু হবে এই ভাইরাস।
অন্য কিছু রোগে কার্যকর পুরনো কয়েকটি ওষুধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী অনেক বিজ্ঞানীই আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। তেমনি দুটি ওষুধ হলো- হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও ফ্যাভিপিরাভির। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, ইনফ্লুয়েঞ্জার চিকিৎসার জন্য ফ্যাভিপিরাভির ওষুধটি জাপানি কোম্পানি ফুজির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান তোয়ামা কেমিক্যাল তৈরি করেছিল। ওষুধটির ব্র্যান্ড নাম অ্যাভিগান। চীনের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, করোনা আক্রান্ত রোগীর ওপর অ্যাভিগান প্রয়োগ করে তারা বেশ সুফল পেয়েছেন। এর পরই ওষুধটি নিয়ে নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে জাপান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ আরো কিছু দেশে প্রাথমিকভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন বেশ সফলতা দেখিয়েছে।
বাংলাদেশি কয়েকটি কোম্পানি আগে থেকেই এসব ওষুধ তৈরি করে। মহামারি আকারে করোনা ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে এখন বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন এবং বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সঙ্গে কাজ করছে এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, জিসকা ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো ওষুধ কেম্পানিগুলো। হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও ফ্যাভিপিরাভির ছাড়াও ওসেল্টামিভির ও ইভারমেকটিনের মতো ওষুধগুলো তৈরি করছে এসব প্রতিষ্ঠান।
জানা যায়, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস ইতোমধ্যে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন প্রস্তুত করেছে। শিগগিরই ফ্যাভিপিরাভির, ওসেল্টামিভির ও ইভারমেকটিন তৈরি করতে যাচ্ছে তারা। বিকন ফার্মাও ফ্যাভিপিরাভির তৈরি করেছে। বেক্সিমকো ফার্মা রেমডেসিভির বাদে সবগুলোই তৈরি করে মজুত করেছে। এদিকে সরকারও দেশীয় কোম্পানিগুলোকে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধের উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে এবং ওষুধটি রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর পাশাপাশি প্রয়োজনমতো সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণের সুবিধার্থে ইনসেপটা লিমিটেডের কাছ থেকে আগাম ৩০ লাখ পিস হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ট্যাবলেট কিনে সরকারি ঔষধাগারে মজুত রাখা হয়েছে।
ফার্মাসিস্ট ও গবেষক ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ ভোরের কাগজকে বলেন, করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসায় তিনটি ওষুধের ব্যবহার নিয়ে সারা বিশে^ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাই এখনো উপসংহারে আসা যাচ্ছে না। ওষুধগুলো হলো ক্লোরোকুইন, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এবং অ্যাজিথ্রোমাইসিন। প্রথম দুটো ম্যালেরিয়া ও রিউমেটয়েড আর্থাইটিসের চিকিৎসায় দেয়া হয় এবং অ্যাজিথ্রোমাইসিন একটি অতি পরিচিত কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক।
এই ওষুধগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে এই গবেষক বলেন, এই ওষুধগুলো কোনো সাধারণ ওষুধ নয়। বিশেষ করে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও অ্যাজিথ্রোমাইসিন কম্বিনেশন সম্পর্কে বিশেষ সতর্কতা দরকার। এই দুটো ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ভয়ঙ্কর হতে পারে। অন্যভাবে বললে বলতে হয়, এখানে উল্লেখিত সব ওষুধের মারাত্মক পার্শ^ প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অধিক মাত্রায় দীর্ঘ সময়ের জন্য হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন খেলে রেটিনার ক্ষতি হওয়ার কারণে যে কেউ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। করোনা সংক্রমণে এসব ওষুধের ব্যবহারে শরীরে আরো কী ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা এখনো অজানা। উল্লেখিত ওষুধের অপব্যবহারের কারণে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে বলে দাবি আমেরিকার ফুড এন্ড ড্রাগস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ)। এসব ওষুধ ওটিসি ড্রাগ নয়, এসব ওষুধ প্রদান বা গ্রহণ করতে হলে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পরিপূর্ণ তথ্য না জেনে আতঙ্কিত হয়ে ঝোকের বশে এসব ওষুধ খেলে বিপদই ঘটতে পারে। বিস্তারিত ও গ্রহণযোগ্য ফলাফল ও এফডিএ’র মতামতের জন্য আমাদের আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতেই হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান বলেন, কোভিড-১৯ একেবারে নতুন রোগ। অনেক পুরনো ভাইরাসের চিকিৎসারও এখন পর্যন্ত পুরোপুরি সুরাহা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু গবেষণায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের সাফল্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এর কার্যকারিতার নিজপক্ষে সিদ্ধান্তমূলক কোনো তথ্যপ্রমাণ এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু গবেষণা থেমে নেই।
কোভিড-১৯ আক্রান্তদের চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইন কার্যকর বলে অভিমত ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের বিশেষজ্ঞরা। সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ বিল্লাল আলম বলেন, বিশে^র বিভিন্ন দেশে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইন ওষুধের সঙ্গে অ্যাজিথ্রোমাইসিন ব্যবহার করা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে এই ওষুধ ৭ দিন ব্যবহারে অধিকাংশ রোগীই সুস্থ হয়েছে।
জানা যায়, দেশীয় কোম্পানিগুলোকে এসব ওষুধ তৈরির অনুমোদন দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনাল গাইডলাইন ফর কোভিড-১৯ বেশ কিছু ওষুধ তাদের নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তও করেছে।
ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সব মন্ত্রণালয় করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কোভিড-১৯ আক্রান্তদের চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইন কার্যকর বলে অভিমত ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের বিশেষজ্ঞরা। সোসাইটির পক্ষ থেকে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন প্রণয়ন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার ১ লাখ আক্রান্তের চিকিৎসা দেয়ার মতো ওষুধ মজুত করেছে।
