চট্টগ্রাম পরিস্থিতি
আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতাদের অফিস-বাসায় পাল্টাপাল্টি হামলা
চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গতকাল শনিবার দুই শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা এবং বিএনপির ৪ নেতার অফিস-বাসায় হামলা হয়েছে। সন্ধ্যায় শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর বাসভবন, মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর বাসভবন ও সাংসদ মহিউদ্দিন বাচ্চুর অফিসে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাল্টা হয় আমীর খসরুসহ বিএনপির চার নেতার বাসায়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশ থেকে মিছিল গিয়েই বিএনপি-জামায়াতের দুষ্কৃতকারীরা আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসা-অফিসে নাশকতা চালায় বলে অভিযোগ করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এরপর রাতে বিএনপি নেতাদের বাসায় পাল্টা হামলার জন্য আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগকে দায়ী করেছেন বিএনপি নেতারা। মূলত শনিবার এ ঘটনার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে বিএনপি-জামায়াত ও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ল বলা চলে।
আওয়ামী লীগের ৩ নেতার বাসা-অফিসে হামলার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, নগর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেনসহ চার জন নেতার বাসায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাসার নিচে থাকা গাড়িতে আগুনও দেয়া হয়। গতকাল শনিবার রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে এ ঘটনা ঘটেছে। বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, ছাত্রলীগ-যুবলীগ এ হামলায় জড়িত।
চট্টগ্রামে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন ভোরের কাগজের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি প্রীতম দাশ। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন, নগরের বাদশা মিয়া সড়কের ডা. শাহাদাত হোসেনের বাসায় ছাত্রলীগ, যুবলীগের শতাধিক কর্মী এসে ভাঙচুর চালান। বাসার দরজা ভেঙে ফেলেন। ভাঙচুর করেন বাসার জিনিস। বাসায় তার অসুস্থ মা রয়েছেন। ঘটনার সময় তিনি (শাহাদাত) বাসায় ছিলেন না। হামলাকারীরা বাসার নিচে পার্ক করা ১০-১২টি গাড়িও আগুনে পুড়িয়ে দেন।
শাহাদাতের বাসার পর নগরের পাঁচলাইশ এলাকায় নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর বাসায়ও হামলা চালানো হয়। নগর বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বে থাকা ইদ্রিস আলী বলেন, এরশাদ উল্লাহর বাসায় হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ।
রাত ৯টার দিকে নগরের মেহেদীবাগ এলাকায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাসায় হামলা ও আগুন দেয়া হয়। ওই সময় নগরের গোলপাহাড় থেকে মেহেদী পর্যন্ত এলাকায় দফায় দফায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি নেতারা। ছাত্রলীগ-যুবলীগ সেখানে ঢুকে হামলা, আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।
নগরের চকবাজার থানার ওসি ওয়ালী উদ্দিন আকবর বলেন, আমীর খসরুর বাসার সামনে গাড়িতে আগুন দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে রয়েছে। বিএনপি নেতারা বলেন, নগরের চট্টেশ্বরী রোডে মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের বাসায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের লোকজন হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছেন। বাসায় দরজায় কোপ দেন। কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারেননি। বাসার দরজার সামনে থাকা দুটি পাজেরো গাড়ি ও জানালার কাচ ভাঙচুর করেন।
এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের চশমা হিলের বাসায় ভাঙচুর, আওয়ামী লীগের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বহদ্দারহাটের বাসায় হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া সংসদ সদস্য মো. মহিউদ্দিন বাচ্চুর লালখান বাজারের নিজের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়।
আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসায় হামলা : বন্দর নগরীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের মিছিল থেকে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র চট্টলবীর প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও তার ছেলে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বাসভবনে হামলা চালানো হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় হামলাকারীরা বাড়িতে থাকা দুটি গাড়িও ভাঙচুর করে। এছাড়া আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মো. মহিউদ্দিন বাচ্চুর কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এছাড়া নগরীতে কয়েকটি পুলিশ বক্স এবং ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় নগরীর নিউমার্কেটে বিক্ষোভ শেষ করে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় পথে পথে এসব হামলা-ভাঙচুর করা হয় বলে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
এছাড়া সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বহদ্দারহাটের বাসভবনে হামলা চালায় আন্দোলনকারীরা। গতকাল সন্ধ্যার পর নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন মেয়রের বাড়িতে হামলার সময় সিটি মেয়র রেজাউল করিম বাড়িতে ছিলেন। সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হামলাকারীরা প্রথমে মেয়রের বাড়ির বাইরের গেট ভেঙে ফেলে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু ভেতরের গেটটি ভাঙতে পারেনি। ভেতরে মেয়রের নিরাপত্তায় থাকা পুলিশের সদস্যরা বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন।
এর আগে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এর নামে ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার বিকালে নগরীর নিউমার্কেট এলাকায় বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে বিক্ষোভ শেষে মিছিল নিয়ে তারা টাইগারপাস, লালখান বাজার হয়ে জিইসি মোড়ের দিকে যাচ্ছিলেন। লালখান বাজার আমিন সেন্টার অতিক্রম করে ওয়াসার মোড় যাওয়ার পথে সড়কের বামে পেট্রোল পাম্পের পাশে চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর কার্যালয়ে হামলা শুরু করেন মিছিলকারীরা। এ সময় তারা ওই কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেন।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে আবদুর রহিম নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, কার্যালয়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। অফিসের চেয়ার-টেবিলসহ আরো বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়েছে। আইটি রুমর কম্পিউটার, টেলিফোন সেট ভাঙা অবস্থায় দেখা গেছে। কার্যালয়ের প্রধান ফটক ও ভেতরের কক্ষগুলোতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার চিহ্ন দেখা যায়। এছাড়া কার্যালয়ে থাকা সব সিলিং ফ্যান ভাঙচুর করা হয়। ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুকে নিয়ে সেখানে যান। এ সময় তারা ক্ষতিগ্রস্ত কার্যালয় ঘুরে দেখেন।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। নিউমার্কেট থেকে বহদ্দারহাটে মিছিল যাওয়ার পথে কয়েকটি পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয়েছে। নিউমার্কেট এলাকায় সিসি ক্যামেরাগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি।
এ ঘটনার কিছু পরেই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নগরীর খুলশী থানার ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকা অতিক্রম করছিল আন্দোলনকারীদের মিছিল। সেখান থেকে শতাধিক লোক বায়েজিদ বোস্তামী রোডে চশমাহিলে মেয়র গলিতে ঢুকে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বাসভবনে হামলা করেন।
তবে মূল ফটক বন্ধ থাকায় তারা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। এ সময় বাসায় থাকা মন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। শিক্ষামন্ত্রীর মা ও নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বেগম হাসিনা মহিউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের বাসায় আক্রমণ হয়েছে। ইট, পাথর মেরে আমাদের বাসার দরজা-জানালা ভাঙচুর করেছে। দুইটা গাড়ি বাসার সামনে রাখা ছিল। সেগুলো ভাঙচুর করেছে।’ নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘মিছিল নিয়ে যাওয়ার পথে শিক্ষামন্ত্রীর বাসা লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়েছে। খবর পেয়ে আমাদের টিম ঘটনাস্থলে গেছে।’
ঘটনা জানাজানির পর আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা প্রয়াত মেয়র এ বিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে ভিড় করেন। এরপর তারা সেখানেই বিক্ষোভ মিছিল করেন। আজ রবিবার নগরীতে জামাত-শিবির-বিএনপির ভাঙচুর, সন্ত্রাস- নৈরাজ্য ও নাশকতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করারও ঘোষণা দেয়া হয় মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ মিছিল থেকে।
