‘রূপায়ণ সিটি উত্তরা’ যেন ঢাকার ‘ক্যাসিনো সিটি’
পরিচালনায় সম্রাটের ক্যাসিনো পার্টনার কাশেম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ১১:১১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ঘটে যাওয়া ‘ক্যাসিনো কাণ্ড’ দেশজুড়ে সাড়া জাগানো ঘটনা ছিলো। তখন অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায় সবচেয়ে আলোচিত নামটি ছিলো যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ওরফে ক্যাসিনো সম্রাট। ঢাকার অন্তত ১৩টি ক্লাব ও ভাড়া করা বিলাসবহুল বাণিজ্যিক ফ্ল্যাটে গড়ে ওঠা ক্যাসিনো ব্যবসার কোমর ভেঙে গিয়েছিলো প্রশাসনের একদিনের অভিযানে, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে আটক হয়েছিলেন সম্রাটসহ সিন্ডিকেটের বেশ কয়েকজন হোতা।
কিন্তু ২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের ওই অভিযানের পরদিনই বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে ভারত পালিয়ে গিয়েছিলেন ওই পুরো ক্যাসিনো নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় লগ্নিকারী কাশেম ওরফে পুল কাশেম। রাজধানীর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া চক্র এবং বনানীর আহমেদ টাওয়ারের ২১ তলা- এই তিনটি স্থানে ক্যাসিনো ব্যবসার একমাত্র মালিকানা ছিলো এই কাশেমের একার।
সেই কাশেমের ক্যাসিনো ব্যবসার কালো ছায়া আবারো ঘিরে ধরেছে রাজধানীকে। এবার তার ব্যবসায় এসেছে নতুনত্ব, তার খেলোয়াড়দের স্থানেও জায়গা করে নিয়েছে অধিকাংশ বিদেশি- বিশেষ করে বাংলাদেশে বসবাসরত চায়না ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীরা।
নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য ও ভোরের কাগজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, কাশেম ওরফে পুল কাশেমের এবারকার ক্যাসিনো ব্যবসার মূল কেন্দ্র হলো রাজধানীর উত্তরায় তুরাগ থানাধীন বিলাসবহুল বেসরকারি মেগা আবাসিক প্রকল্প ‘রূপায়ণ সিটি উত্তরা’ এলাকার ভেতরে। পাশাপাশি উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার দুটো বাড়িতেও ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটে রয়েছে কাশেমের বিকল্প ক্যাসিনো স্পট।
সূত্র জানায়, রূপায়ণ সিটির ভেতরে ‘রূপায়ণ গ্র্যান্ড’ ক্যাটাগরিভুক্ত ৬০ নম্বর বাড়ির (লিফট-৬) সপ্তম তলায় কাশেমের এই ক্যাসিনো ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র। সেখানে চায়না একটি বায়িং হাউজের নামে ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটেই সবচেয়ে বেশি ক্যাসিনো জুয়া চলে। আশেপাশের আরো দুটো একই ক্যাটাগরির ভবনেও ‘বিকল্প’ ক্যাসিনো খেলার স্পট রয়েছে এই সিন্ডিকেটের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কাশেমের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর। আর চলমান ক্যাসিনো ব্যবসায় তার প্রধান সহযোগীর নাম পিন্টু। এছাড়া আশুলিয়ার আজিজ ওরফে কালা আজিজ, সোহেল ও আরমান নামে কাশেমের আরো কয়েকজন সহযোগীর নামও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায় যে, কাশেমের ক্যাসিনো আড্ডায় খেলতে আসা খেলোয়াড়দের অধিকাংশই চীনের নাগরিক, যারা বাংলাদেশে ব্যবসা কিংবা চাকরিসূত্রে বসবাস করছেন। কমপক্ষে অর্ধসহস্রাধিক চায়না নাগরিকের বাইরেও হংকং ও থাইল্যান্ডের নাগরিক বেশ কয়েকজন বিদেশি খেলোয়াড়ও খেলতে আসেন কাশেমের ক্যাসিনো আয়োজনে। আর বাংলাদেশি খেলোয়াড়েরা তো আছেনই।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, একই স্থানে প্রতিদিন একই চেহারার এতগুলো দেশি-বিদেশি লোকের আসা-যাওয়া জনমনে সন্দেহের উদ্রেক করতে পারে- এটা মাথায় রেখেই কাশেম রূপায়ণ সিটির ভেতরে গত ছয় মাসে একাধিক ভবনে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসার নিরাপদ অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছেন।
একই কারণে উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার দুটো বাড়িতেও রয়েছে কাশেমের ক্যাসিনো আয়োজন। স্পট দুটো হলো- উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৯ নম্বর রোডের ৭৮ নম্বর বাড়ি ‘উত্তরায়ণ’-এর টপ ফ্লোরে এবং একই সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের ৬৬ নম্বর বাড়ি ‘বিপাশা নীড়’-এর টপ ফ্লোরের নিচের ফ্লোরের দুটো পৃথক এপার্টমেন্টে।
এর মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘উত্তরায়ণ’ বাড়িটির একজন ভাড়াটিয়া জানিয়েছেন যে, মাসে দু’চারবার এই বাড়িতে বিপুলসংখ্যক চায়না নাগরিককে দামি গাড়ি নিয়ে আসতে দেখেছেন তিনি। এরকমই চলতি বছরের মে মাসের প্রথমদিকে একদিন এখানে দুজন চায়না নাগরিকের মধ্যে মারামারি ও একে অপরের মাথা ফাটানোর ঘটনা ঘটলে, সেদিনই প্রথম এই ভবনে ক্যাসিনো খেলা নিয়ে কানাঘুষা শোনা গিয়েছিলো এবং ক্যাসিনো খেলার টাকা নিয়ে ঝামেলা হওয়াতেই ওই মারামারির ঘটনা ঘটেছিলো বলেও শোনা গিয়েছিলো।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্যাসিনো কাণ্ডে সম্রাটসহ শীর্ষ ক্যাসিনো ব্যবসায়ীরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর, দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাশেম দেশ ত্যাগ করে বুড়িমারী সীমানা পার হয়ে ভারত দিয়ে নেপালে চলে যায়। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে নেপালের একটি ফাইভ স্টার হোটেলে ক্যাসিনো ব্যবসা শুরু করেন। থেমে থেমে নেপালেই চলছিল তার ব্যবসা। কিন্তু ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে আবার দেশে ফিরে আসেন কাশেম।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তার নতুন ক্যাসিনো প্রজেক্ট ছিল ঢাকার রিজেন্সি হোটেলে, কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ফ্লোরের একটি ঘরে। সেখানে টানা তিন মাস অবৈধ ক্যাসিনো আড্ডা চালানোর পর, চলতি বছরের জানুয়ারিতে কয়েকজন চায়না নাগরিকের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় উত্তরা এলাকায় ক্যাসিনো জুয়ার ব্যবসা শুরু করেন কাশেম, আর নিরাপদ জায়গা হিসেবে বেছে নেন রূপায়ণ সিটি উত্তরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তুরাগ থানায় অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পুলিশ পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘জুয়া ও মাদকের বিষয়ে নির্বাচিত সরকার প্রথম থেকেই চূড়ান্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে রূপায়ণ সিটি কিংবা তুরাগ থানার কোথাও এমন বড় ধরনের ক্যাসিনো জুয়ার খবর এখনো আমি শুনিনি। আমি এই থানায় এসেছি মাত্র এক মাস হলো। এরকম কিছু ঘটে থাকলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্যই সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কাশেমের বিকল্প দুই ক্যাসিনো স্পটের বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ খালিদ মনসুরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এরকম কিছু এখনো আমার কানে আসেনি। রূপায়ণ সিটিতে এমন কিছু হওয়ার আঁচ পাওয়া গেলেও, আমার থানায় এখনো তেমন কিছু শোনা যায়নি। তবে আপনার অভিযোগের পর অবশ্যই আমি দ্রুত অ্যাকশন নিচ্ছি’।
এসব বিষয়ে জানতে রূপায়ণ সিটি উত্তরা কর্তৃপক্ষের তিনটি হটলাইন নম্বরে ফোন করা হলেও কেউ ফোনকল রিসিভ করেননি।
