×

শেষের পাতা

কাতারের আমিরের সফরে কী পেল বাংলাদেশ

Icon

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাতারের আমিরের সফরে  কী পেল বাংলাদেশ
কাগজ প্রতিবেদক : কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির ঢাকা সফর ছিল ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের। সংক্ষিপ্ত এ সফরটি বাংলাদেশের জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ তামিমের এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়েছে এবং সম্পর্কের বহুমাত্রিকতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বড় প্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ সম্পর্কে কাতারের যে মনোভাব- সেটির বড় পরিবর্তন হয়েছে। নিজ চোখে বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখে গেছেন কাতারের আমির। এছাড়া বাণিজ্য, জনশক্তি রপ্তানিসহ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে ৫টি চুক্তি ও ৫টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। ঢাকা সফরের শেষ দিন দুপুরে কাতারের আমির শেখ তামিম ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এসব চুক্তি ও সমঝোতা সই হয়। পরে ভিডিও কনফারেন্সে ঢাকার কালশীতে নিজের নামে একটি পার্ক ও সড়কের নামকরণের উদ্বোধন করেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন-হামাদ আল থানি। জানা গেছে, সংযুক্তি, পর্যটনসহ নানা খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসার সম্ভাবনা খুঁজতে কাতারের আমির আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে তিনি দেশে ফিরে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়ার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে। কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের কথা এলেই জ¦ালানিসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসার বিষয় আলোচনায় আসে। তবে এবার কাতারের আমিরের ঢাকা সফরে ব্যবসার পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বার্তাও পাওয়া গেছে। কাতারের আমিরের সফর প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, এ সফরে রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করা এবং সম্পর্কের বহুমাত্রিকতা তৈরির ক্ষেত্রে আমরা কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়েছি। সচিব বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ বাংলাদেশিদের দেখে ‘গরিব’ হিসেবে, কিন্তু এখানে তারা উন্নতি নিজ চোখে দেখে গেছে। সুতরাং তিনি (আমির) নিজেই বললেন ‘সিয়িং ইজ বিলিভিং’। বাংলাদেশের উন্নতি দেখে তিনি অভিভূত। কাতারের আমির দুই দিনের সফরে সোমবার (২২ এপ্রিল) ঢাকা এসে পৌঁছান। এ বছর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর পূর্তি হয়েছে। কাতারের আমির ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে প্রায় ৪৫ মিনিট এবং এর আগে একান্ত বৈঠক হয়েছে প্রায় ২৫ মিনিট। এ সফরে পাঁচটি চুক্তি ও পাঁচটি সমঝোতা স্মারক অর্থাৎ মোট ১০টি দলিল সই হয়েছে। চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্বৈতকর পরিহার, আইনগত বিষয়ে সহযোগিতা, সাগরপথে পরিবহন, বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বদলি এবং যৌথ ব্যবসা পরিষদ গঠনসংক্রান্ত চুক্তি। সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছে- শ্রমশক্তি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক, বন্দর পরিচালনা, উচ্চ শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যুব ও ক্রীড়া সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ সহযোগিতা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বন্দর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কাতারের বিশ্বব্যাপী সুনাম আছে। কাজেই কাতার যদি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চায়, সেটি অবশ্যই ভালো খবর। কাতার জ¦ালানি খাত নিয়ে কাজ করছে, কাজেই তাদের বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ¦ালানি খাতে বিনিয়োগের প্রতি আকৃষ্টের চেষ্টা করা যেতে পারে। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, কাতারের আমিরের বাংলাদেশ সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলএনজি আমদানি ছাড়াও কাতারে আমাদের বহু শ্রমিক কাজ করেন। সেজন্য দুই দেশের সম্পর্ক ভালো থাকা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, সার্বিক প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে নবম অবস্থানে আছে কাতার। আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে কাতারের অবস্থান সপ্তম। চলতি অর্থ বছরের (২০২৩-২৪) প্রথম ৯ মাসে প্রবাসীরা ওই দেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ৮৩৮ দশমিক ২২ মিলিয়ন ডলার। ২০০১ সাল থেকে কাতারে জনশক্তি রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গিয়ে ২০১৫-১৬ সালে আবার ভালো অবস্থানে চলে আসে। এরপরের চার বছর আবার কমে যায়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫৬ হাজারেরও বেশি জনশক্তি কাতারে গিয়েছে। কূটনীতিবিদরা বলেছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠনের পর এটিই মধ্যপ্রাচ্যের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম বাংলাদেশ সফর। সব মিলিয়ে কাতারের আমিরের এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনায় নেয় বাংলাদেশ সরকার। যা শ্রমশক্তি পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বাড়লে তা মধ্যপ্রাচ্য থেকে নানা সুবিধা নিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তথ্য অনুযায়ী, এলএনজি সরবরাহকারী দেশের মধ্যে কাতার অন্যতম। ওই দেশের সঙ্গে এলএনজি সরবরাহ করার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের। পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, বাংলাদেশের জ¦ালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কাতারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারাও বুঝতে পেরেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি বাড়ছে এবং এলএনজির চাহিদা আরো বাড়বে। এলএনজি সাপ্লাই চেইনেও কাতার আগ্রহী এবং তার স্থলে এলএনজি টার্মিনাল করা যায় কি না সেটি বিবেচনা করছে বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব। বাণিজ্যিক স্বার্থ : বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২৫০ কোটি ডলারের বেশি এবং এর বেশির ভাগ এলএনজি আমদানির জন্য বাংলাদেশ ব্যয় করে থাকে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, হঠাৎ করেই দেখা গেল কাতারের সঙ্গে বাণিজ্য অনেক বেশি হচ্ছে এবং এর বেশির ভাগ আমদানি। এটি নিশ্চয় তারাও বিবেচনায় নিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং চাহিদা বাড়ছে। একই ভাবে কাতারে বিভিন্ন পণ্য যেমন কৃষি পণ্য ও হালাল খাবারসহ অন্যান্য জিনিস পাঠাতে পারে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, পর্যটন খাতেও তাদের আগ্রহ আছে এবং এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের জানিয়েছেন যে, কক্সবাজার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক করা হবে এবং সেখানে পর্যটনের বিষয়টি তারা বিবেচনা করতে পারে। জনশক্তি রপ্তানি : কাতারে প্রায় চার লাখ বাংলাদেশি কাজ করে। ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপের সময়ে অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশের প্রচুর শ্রমিক অবদান রেখেছে। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, অন্যান্য দেশগুলোর মতো কাতারও দক্ষ শ্রমিক চায় বাংলাদেশ থেকে। তারা এতদিনে জেনে গেছে যে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা বা প্রকৌশলী বা অন্যান্য ক্ষেত্রে দক্ষ লোক আছে। আমরাও সেখানে লোক পাঠাতে চাই। আমরা তাদের অনুরোধ করেছি আধা দক্ষ শ্রমিকদেরও যেন তারা সুযোগ দেয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সভাপতি আবুল বাশার বলেন, সরকারি হিসেবে কাতারে বর্তমানে ৪ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত, যাদের বেশির ভাগই গেছেন অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে। ফলে অন্যান্য দেশের দক্ষ শ্রমিকদের তুলনায় তারা সেখানে কম বেতন ও অন্যান্য সুবিধাও কম পেয়ে থাকেন। কাতার দক্ষ শ্রমিক নেয় ভারত-পাকিস্তান থেকে। বাংলাদেশের অদক্ষ শ্রমিকরা বেশি কাজ করেও পর্যাপ্ত রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে না। বাংলাদেশ সরকারের উচিত দক্ষ শ্রমিক রপ্তানির ব্যাপারে কাতারের সহযোগিতা নেয়া। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত দক্ষ শ্রমিক রয়েছে। বায়রার মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, কাতারে জনশক্তি পাঠানোর প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় ধীর গতিতে বাংলাদেশের কর্মীরা যাচ্ছেন। এই প্রক্রিয়া সহজ করলে জনশক্তি যাওয়া বাড়বে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App