অস্থিরতায় বিপাকে পোশাক খাত
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
পোশাক খাতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানিও। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মালিকপক্ষ শ্রমিকদের ১৮ দফা দাবি মেনে নেয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল এবার স্বস্তি ফিরবে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এ খাতে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ফের অস্থির হয়ে উঠেছে গাজীপুর-সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল। এ খাতে বারবার এমন অস্থিরতায় রপ্তানি বাজার হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন উদ্যোক্তারা। আগস্টের শেষে শুরু হওয়া এ অস্থিরতার সঠিক কারণও বের করতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। দাবি মানার পরও আন্দোলন-ভাঙচুর না থামায় দানা বাঁধছে নানা সন্দেহ। সঠিক কারণ এখনো অধরা।
এদিকে বর্তমান সরকার মনে করছে গুজব ছড়িয়ে গার্মেন্টসে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। জড়িতদের অনেককেই চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অন্যদিকে অসন্তোষ বন্ধ না হওয়ার নেপথ্য কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের শ্রম আইনকে ঠিক না করার কারণে অনেক সময়ই শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
চাকরিসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরের পোশাক কারখানার শ্রমিকরা গতকাল বুধবারও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গাজীপুর সদর এলাকায় ১২টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। তবে বার্ডস গ্রুপের মালিককে গ্রেপ্তার করার খবরে দীর্ঘ ৫২ ঘণ্টা পর সাভারের নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক থেকে অবরোধ তুলে নিয়েছেন শ্রমিকরা।
পোশাক মালিকরা বলছেন, কোনো একটি পক্ষের ইন্ধনেই শিল্পে এ অরাজকতা চলছে। যৌথবাহিনী শিল্প সচল রাখার বিষয়ে যে সহযোগিতা করছে, তাতে তারা সন্তুষ্ট। তবে আরো নিরাপত্তা দেয়া হলে শিল্পাঞ্চলে সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা সম্ভব হবে, যা উৎপাদনের পূর্বশর্ত। তারা কারখানা অরাজকতা সৃষ্টির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে জন্য যৌথবাহিনীকে অনুরোধ জানান।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল্লাহ হিল রাকিব বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যৌথবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় চলমান শ্রম পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে, কারখানা খোলা রাখা সম্ভব হয়েছে। শ্রমিকদের ১৮ দফা দাবি মেনে নেয়ার পরও অন্যায় দাবি ও গুজব ছড়িয়ে কিছু কারখানায় অস্থিরতা তৈরি হলেও সেগুলোর সংখ্যা নিতান্তই কম। কারখানা সমস্যায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যৌথবাহিনীর সদস্যরা এসে সমস্যা সমাধান করে উৎপাদন চালু রাখতে সহায়তা করে চলেছে।
তিনি আরো বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে অনেক ক্রেতা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তবে শ্রমিক নেতারা দাবি করেন, গত ২৪ সেপ্টেম্বর ১৮ দফা দাবি মেনে নিলেও পরের দিন থেকেই শ্রমিকদের ছাঁটাই শুরু করে অনেক কারখানা। এছাড়া মামলা ও গুমের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তারা।
জানতে চাইলে পোশাক শ্রমিক নেতা কাজী রুহুল আমিন ভোরের কাগজকে বলেন, রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার জামিনের ঘটনায়সারাদেশের শ্রমকিরা বেশি বিক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, অতীতের সরকারগুলো যেমন মালিকদের পক্ষপাতিত্ব করেছে এ সরকারও প্রকারান্তরে তাই করছে। কেননা মাহমুদ গ্রুপ, বার্ডস গ্রুপ, এএমজেড গ্রুপসহ অনেক কারখানা বেতন পরিশোধ করেনি। ১৮ দফা চুক্তি করেও মালিকপক্ষ তা মানেনি। সেইসব মালিকদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি। তারওপর গত শুক্রবার রাতে আশুলিয়ার মন্ডল নিটওয়্যার লিমিটেডের দুজন শ্রমিককে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়। পরের দিন আন্দোলনের চাপে একজন নারী শ্রমিককে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আরেকজনকে হুমকি দিয়ে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
রুহুল আমিন আরো বলেন, ২৪ সেপ্টেম্বর ১৮ দফা দাবি মেনে নেয়ার পর ২৫ সেপ্টেম্বর সব কারখানা চালু করা হয়। কিন্তু ওইদিন থেকেই বিভিন্ন কারখানায় মালিকরা শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা শুরু করে। অনন্ত গার্মেন্টস, লুসাকা, মন্ডল নিটওয়্যার, আনারা, পাল গার্মেন্টস, জিনসিন গার্মেন্টস, মদিনা টেক্স, ন্যাক্সন, মাহমুদ ডেনিম, মাহমুদ জিন্স, মাহমুদ ফ্যাশন, স্কাইলাইন, এনভয়, ডেকো, পাইওনিয়ার- এমন অর্ধশতাধিক কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই হয়, শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়। কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অর্থাৎ অতীতে যেভাবে রাষ্ট্র ও সমাজে পোশাক মালিকরা প্রভাব খাটিয়ে শ্রমিকদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতন করেছেন, এখনো আমরা তাই দেখছি। সর্বশেষ সোমবার একজনকে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। সুতরাং নির্যাতন বন্ধ করে প্রত্যেক কারখানায় আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে শিল্পের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই আমাদের মৌলিক দাবি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর পোশাক শ্রমিকদের হাজিরা বোনাস ২২৫ টাকা বাড়ানোসহ শ্রমিকদের ১৮টি দাবি মেনে নেয় মালিকপক্ষ। এরপর সব পোশাক কারখানা চালুর ঘোষণা দেয়া হয়। ফলে গত সপ্তাহে সহিংসতা ও অস্থিরতার তীব্রতা কিছুটা কমলেও এ সপ্তাহে আবারো তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ক্রেতাদের চাপের মুখে কারখানা মালিক ও বিজিএমইএ বর্তমান অবস্থা নিয়ে চরম বাজে অবস্থা পার করছে। আকাশপথে পণ্য পাঠানোর জন্য রপ্তানিকারকদের ছাড় ও অতিরিক্ত চার্জ দিতে হয়। ফলে কমছে লভ্যাংশ। দেশে শ্রমিক অসন্তোষে প্রায় দেড় মাসের বেশি সময় ধরে অস্থির তৈরি পোশাক শিল্প। দাবি আদায়ে বিক্ষোভের পাশাপাশি ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে শতাধিক কারখানায়।
সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে এমন অস্থিরতায় বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম। এ অবস্থার মধ্যেই সোমবার শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার টঙ্গাবাড়ী এলাকায় শ্রমিক ও যৌথবাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শ্রমিক নিহত হন। গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। এতে নতুন করে আবার শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হয়। এ অবস্থায় উদ্বিগ্ন পোশাকশিল্প মালিকরা। তারা বলছেন, শ্রমিক অসন্তোষের ফলে যথাসময়ে পণ্য পাঠানো নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। এ অবস্থা দীর্ঘমেয়াদি হলে ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর ভোগরা চৌধুরী বাড়ি এলাকায় শ্রমিকরা চাকরিসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। মহাসড়ক অবরোধ করে রাখার কারণে উভয়দিকে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ।
এদিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকায় বকেয়া বেতন পরিশোধ ও কারখানা খুলে দেয়ার দাবিতে পোশাক শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে শিল্প পুলিশ ও সেনাবাহিনী এসে তাদের বোঝালে দুপুর ১২টায় মহাসড়ক ছেড়ে যান। অন্যদিকে বার্ডস গ্রুপের মালিককে গ্রেপ্তার করার খবরে দীর্ঘ ৫২ ঘণ্টা পর সাভারের নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক থেকে অবরোধ তুলে নিয়েছেন শ্রমিকরা। বুধবার দুপুর ১টার দিকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শ্রমিকদের এ কথা জানানো হলে তারা অবরোধ তুলে সড়ক ছেড়ে বন্ধ কারখানার সামনে অবস্থান নেন।
শিল্প পুলিশ ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুর জেলার প্রায় বেশির ভাগ কারখানার সামনে লেখা রয়েছে- শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ। মাসের ১ তারিখ থেকে ৫ তারিখ পর্যন্ত প্রতিটি কারখানার সামনেই শত শত শ্রমিক চাকরির জন্য ভিড় করেন। তবে কর্তৃপক্ষ ফটকে ‘শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ’ লিখে রাখলেও গোপনে নারী শ্রমিকদের নিয়োগ দিচ্ছেন। পুরুষ শ্রমিকরা চাকরিতে যোগদান করার পর অযথা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ করেন- এমন অভিযোগে তারা পুরুষ শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছেন না।
