বিদায়ী অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের গতিপ্রকৃতি
ড. মিহির কুমার রায়
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
অর্থ সংকটের ছাপ পড়েছে উন্নয়ন বাজেট তথা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৮০ দশমিক ৯২ শতাংশ, যা করোনাকালেও ছিল ৯২ শতাংশের বেশি। সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এডিপি বাস্তবায়ন হার কমার জন্য অর্থনৈতিক সংকট একটি বড় কারণ। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়গুলো কাজ না করার জন্যও দায়ী। প্রতি বছরই দেখা যায়, অর্থবছরের শুরুতে এডিপি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে এক ধরনের গাছাড়া ভাব দেখা যায়। কিন্তু শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কারণে বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না। আইএমইডির প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৮৫৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৮০ দশমিক ৯২ শতাংশ। ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা, যা জিওবি তহবিলের ৭৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরের এডিপিতে জিওবি খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া বিদেশি ঋণের ব্যয়ের হার ছিল ৮৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে বিদেশি ঋণ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ব্যয় হয়েছে ৭১ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। এডিপি বাস্তবায়নের এ হার করোনাকালের চেয়ে কম। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি ছিল। ওই সময়েও এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৮২ দশমিক ১১ শতাংশ। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে বাস্তবায়ন হার ছিল ৯২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।
একক মাস হিসেবে বিদায়ী জুন মাসেও বাস্তবায়ন অগ্রগতি তার আগের ৫ অর্থবছরের তুলনায় কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুনে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ২৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তার আগের অর্থবছর ২০২২-২৩-এর জুনে এই হার ছিল ২৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ২৭ দশমিক ৯০ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ২৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। দেশের ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপি বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত। এগুলোর পৃথক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এডিপি বাস্তবায়নে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। তাদের বাস্তবায়ন হার ১১৮ দশমিক ১০ শতাংশ এবং পিছিয়ে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। তাদের বাস্তবায়ন হার ৩৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এছাড়া বিদায়ী অর্থবছরে জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের ৪৬টি প্রকল্পের বিপরীতে এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৮৮০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। তারা ব্যয় করেছে ৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। যা শতাংশের হিসেবে ১০৭ শতাংশ। বিদ্যুৎ বিভাগের ৬৪টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৩০ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। তারা ব্যয় করেছে ৩০ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। যা শতাংশের হিসেবে ১০১ দশমিক ৮২ শতাংশ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ২৬টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১২০ কোটি টাকা। ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। যা শতাংশের হিসেবে ১০১ দশমিক ২৬ শতাংশ। প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ৩টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৩৮৬ কোটি টাকা, তারা ব্যয় করেছে ১৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এডিপি বাস্তবায়ন হার ৪৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের এডিপিতে ৮টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ২৪২ কোটি টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৯২ কোটি টাকা। বিভাগটির এডিপি বাস্তবায়ন হার ৩৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম-কমিশনের (পিএসসি) ১টি প্রকল্পের জন্য এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৪৪ কোটি টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২০ কোটি টাকা। এডিপি বাস্তবায়ন হার ৪৬ দশমিক ০৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের পুরো সময়েই এডিপি বাস্তবায়নে শূন্যের ঘরে থাকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভালো করেছে। মন্ত্রণালয়টির ৭টি প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ ছিল ১০৩ কোটি টাকা। বিপরীতে তারা ব্যয় করেছে ১০২ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে করে দেখা যায়, প্রকল্প তৈরি ও অনুমোদন পর্যায়ে ১১টি চ্যালেঞ্জ হলো- প্রকল্প তৈরিতে দুর্বলতা, দক্ষতার অভাবে অন্য প্রকল্পের ছক অনুসরণ করে নতুন প্রকল্প তৈরি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রকল্প প্রস্তাবে সরকারে বিভিন্ন পরিকল্পনা লক্ষ্য অর্জনের তথ্যে অপর্যাপ্ততা এবং প্রকল্প গ্রহণে সুবিধাভোগীদের মতামত না নেয়া। এছাড়া প্রকল্প তৈরির সময় রেজাল্ট ফ্রেমওয়ার্ক ও লগফ্রেম ওয়ার্ক ঠিকভাবে না করা, প্রকল্প নেয়ার আগে সম্ভাব্য ভূমি চিহ্নিত না করা, এমটিবিএফের আর্থিক সীমা অনুসরণ না করা এবং প্রকল্পের ফলাফল টেকসই করতে পরিকল্পনা সঠিকভাবে তৈরি না করা। আরো আছে ভৌত কাজের ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়, বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত না করেই প্রকল্প অনুমোদন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পের দ্বৈততা থাকে। প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ের ১১টি চ্যালেঞ্জ হলো প্রকল্প প্রস্তাবে দেয়া কর্মপরিকল্পনা ও ক্রয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করা, প্রকল্পের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য সঠিক ও কার্যকর পরিকল্পনা এবং তা পরিবীক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা এবং মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। এছাড়া কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, নিয়মিত পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) ও পিএসসি (প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি) সভা না করা এবং কার্যাদেশ প্রাপ্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্যাকেজের কাজ শেষ না করে বারবার সময় বৃদ্ধির আবেদন করা।
প্রকল্প বাস্তবায়ন পরবর্তী পর্যায়ের ৬টি চ্যালেঞ্জ হলো- প্রকল্প শেষ হওয়ার ৩ মাসের মধ্যে পিসিআর (প্রকল্প সমাপ্ত প্রতিবেদন) না দেয়া, তুলনামূলক আর্থিক বা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ না করা এবং পিসিআর মূল্যায়ন প্রতিবেদনের ফিডব্যাক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইএমইডিকে অবহিত না করা। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত কার্যক্রম প্রকল্প শেষে পরিচালনা করার জন্য রাজস্ব বাজেটের অপ্রতুলতা, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এর থেকে প্রাপ্ত ফলাফল স্বচ্ছ করতে কোনো ব্যবস্থা না করা এবং প্রকল্প শেষে এর যানবাহন নির্ধারিত সময়ে সরকারি পরিবহন পুলে জমা না দেয়া। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকার হালনাগাদ সংস্করণ ২০২২ সালের জুনে প্রকাশ করা হয়েছে। ওই নির্দেশিকায় প্রকল্প তৈরির সময় বিবেচনার জন্য বিভিন্ন বিষয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর বাইরে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আইএমইডি প্রকল্পের বাস্তবায়ন, দীর্ঘ সময় লাগা এবং প্রাক্কলিত ব্যয় অতিক্রান্ত হওয়ার কারণসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। এ বিষয়ে আইএমইডির সচিব বলেন, আমরা শুধু চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেই দায়িত্ব শেষ করিনি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, সেসব বিষয়ও তুলে ধরেছি প্রতিবেদনে। ইতোমধ্যেই প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আশা করছি আগামীতে এটি আর চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে না। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে আর একটি অন্যতম বাধা হলো ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা। এটিও সমাধানের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার কাজ শুরু হয়েছে। এভাবে পর্যায়ক্রমে বাকি সমস্যাগুলোরও সমাধান করা সম্ভব হবে।
আইএমইডি বাজেট বাস্তবায়নের যে বক্তব্য দিয়েছে তা গতানুগতিক ধারার বাহক বলে প্রতীয়মান হয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। এটা সত্যি, বাজেট বাস্তবায়নে চাই একাগ্রতা ও দক্ষতা, যা নতুন করে বলার কিছুই নেই। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের নির্বাচনকালীন বাজেট বাস্তবায়নের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিল কেন্দ্রিক রাজস্ব আহরণ, অবকাঠামোগত ঘাটতি, অগ্রাধিকারভিত্তিক সরকারি ব্যয় নির্ধারণ, ঘাটতি বাজেটের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়, বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা, ব্যক্তি ঋণের প্রতিবন্ধকতা, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সমতা আনয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সঞ্চয় বিনিয়োগের ভারসাম্য রক্ষা ইত্যাদি, যা একেবারেই দৃশ্যমান। এখন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা রোডম্যাপ তৈরি, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, প্রকল্পের গুণগত বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করলে অনেক চ্যালেঞ্জই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এখন প্রশ্নটি হলো তা কীভাবে সম্ভব। সাবেক প্রধানমন্ত্রী তার বাজেট সমাপনী বক্তৃতায় মহান জাতীয় সংসদে বলেছিলেন সব বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করে বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন অর্থের কোনো রকম অভাব হবে না। এখন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা মানেই এর সঙ্গে সংযুক্ত জনশক্তি তথা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সক্ষমতা। যা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে, যা সরকার অবগত আছে। কিন্তু এর উন্নয়নের গতিধারায় কবে নাগাদ এই সক্ষমতা একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছাবে তা বলা দুষ্কর; কিন্তু দেশ উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে যে গতিতে তার চেয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি আরো বাড়ানো প্রয়োজন। এর জন্য প্রশিক্ষণ ও তদারকির কোনো বিকল্প নেই সত্যি, কিন্তু একটি রোডম্যাপ ধরে এগোতে হবে। প্রায়ই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সক্ষমতা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত প্রকল্পগুলোর ব্যয় দক্ষতা/ব্যয়ের মান নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন শোনা যায়, বিশেষত অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকে; যার ভিত্তিগুলো সরকারকে আমলে নেয়া উচিত। কারণ রাজস্ব আয়ের আহরণের একটি বড় প্রতিষ্ঠান হলো এনবিআর। যার সঙ্গে সরকারের স্থায়িত্বশীলতার প্রশ্নটি জড়িত। সে ক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নৈতিক ভিত্তি তথা প্রশাসনিক কাঠামো আরো জোরদার করতে হবে। নতুন নতুন করদাতা সংগ্রহে উপজেলায় আরো অফিস স্থ’ানান্তর করতে হবে এবং বেশি বেশি করমেলার আয়োজন নতুন অঞ্চলগুলোতে করতে হবে। আবার উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয়ের মান উন্নয়ন ও অব্যাহত দুর্নীতি প্রতিরোধে উদ্যোগী মন্ত্রণালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, পরিকল্পনা কমিশন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ অনুবিভাগকে উন্নয়নের সহযাত্রী হিসেবে কাজ করতে হবে।
ড. মিহির কুমার রায় : কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক; ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি।
