নিয়াজ জামান সজীবের নিবন্ধ
প্রথম পাঠ
নিয়াজ জামান সজীব
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম
ছবি: জামাল আহমেদের পেইন্টিং অবলম্বনে
যে কোনো প্রথম কিছুর আবেদন আলাদা। প্রথমবার আলো দেখা, অন্ধকারের মানে বুঝতে পারা। প্রথম বৃষ্টির স্পর্শ কিংবা কোন নারীর মনের মাদকতার আহবান। প্রথমবার পড়া বা লেখা অথবা ইশারায় কিছু করতে পারা। প্রথম ক্ষমতার স্বাদ, বল প্রয়োগ। ইতিবাচক-নেতিবাচক যেভাবেই বলি না কেনো প্রথম তো প্রথমই।
এ বিশ্বে প্রথম রাজা কে ছিলেন? কি ছিলো তার প্রথম জীবন। সবই রহস্য না বাস্তবতার মায়ার জগত। বিশ্বের প্রথম রাজা হিসেবে মেসোপটেমিয়ার কিশ শহরের শাসক এনমেবারাগেসিকে ধরা হয়। আনুমানিক ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ সময়কালে তিনি রাজত্ব করেন। সুমেরীয় রাজাদের তালিকায় পৌরাণিক প্রথম শাসক আলুলিম। প্রাচীনতম শাসকদের অন্যতম ৩ হাজার ১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশরের প্রথম রাজবংশ।
প্রথম পড়ালেখা কারা করেছিলেন? এটা অবশ্য নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির আবিষ্কার নয়। মূলত শস্যের হিসাব বা ব্যবসার কাজের জন্য জ্ঞান সংরক্ষণে ব্যবহৃত হতো কিউনিফর্ম নামক লিখন পদ্ধতি। খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ অব্দের দিকে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয়রা সর্বপ্রথম এ পদ্ধতিতে লেখা ও পড়ার প্রচলন শুরু করে।
এই যে রাজা, সম্রাটদের শাসন কিংবা প্রথম কোন নারীর মন জেতা। আলাদা অনুভূতি। ভাষায় বা চোখের ইশারায় তা কি সব সময় প্রকাশ করা যায়। তবে প্রথম পড়ালেখা যে বা যারাই আবিষ্কার করে থাকুক তাদের নিয়ে এখনো অনেক শিক্ষার্থীর মনে কিছুটা বিরুপ ধারণা কাজ করে। কি দরকার ছিলো এই পড়ালেখা চালু করার। আর পড়ালেখা না হয় করা গেলো কিন্তু পরীক্ষা কেনো দিতে হবে? জীবনে প্রথম প্রশ্ন কে বা কাকে করেছিলেন তা যার যার নিজস্ব ভাবনার জগতকে আন্দোলিত করে বটে।
তবে প্রথম চুমু বা প্রথম বকা খাওয়া। এই দুই অভিজ্ঞতা কারো ঠোঁটের পরশ পেয়েই হয়ে থাকে। তাই জীবনের নানা রঙে নানা আহবান থাকে। কেউ শান্তির আহবানে সাড়া দিয়ে রাজ্য ত্যাগ করে সন্নাসে চলে যায়। কেউ বা আবার প্রেমের জন্য পুরো ট্রয় নগরী ধ্বংসের কারণ হয়ে যায়। আসলে যার নয়নে যারে প্রথম ভালো লাগে। তারে কি আর আটকে রাখা যায়।
প্রথম সভ্যতার বিকাশও কেউ আটকে রাখতে পারেনি। মহান আল্লাহর শত বারণ সত্ত্বেওfirst বাবা আদমকে গন্ধম খাওয়া থেকে দূরে রাখতে পারেনি। বিশ্ব প্রথম খুন। হাবিল-কাবিল দুই ভাইয়ের গল্প আজও সবাইকে কাঁদায়। যদিও ইহুদিরা তাদের ভিন্ন নামে ডাকে।
কেউ বলে থাকেন জীবনে প্রথম বেতন পাওয়া বা টাকা কামানো হলো নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্ত ভিত্তির উপস্থিতি টের পাওয়া। সাফল্য ও লক্ষ্য অর্জনের মতো নতুন কিছু শেখার রোমাঞ্চ নিজের ক্ষমতা প্রমাণ বা আত্মবিশ্বাস পাওয়ার মুহূর্ত জীবনের শেষ বেলার স্মৃতিচারণকে সমৃদ্ধ করে।
নিজের জন্য সময় বের করে নতুন জায়গা ভ্রমণের রোমাঞ্চ ভয়কে জয় করার পর সাহসিকতার অনুভূতি।
অনেক খাবার ও পরিস্থিতি প্রথম প্রথম বিস্বাদ লাগলেও সময়ের পরিক্রমায় এবং অভ্যাসের কারণে একসময় স্বাদ লাগতে শুরু করে। বিস্বাদ হয়ে যায় সুস্বাদু। জীবন আসলেই এক বর্ণময় সত্ত্বা। যার নানা পথ-মত থাকলেও বেঁচে থাকা আর মৃত্যুই চিরন্তন।
যে কোনো বাচ্চার শিশুকাল হলো স্বচ্ছ কাঁচের মতো। ভবিষ্যতে তা প্রতিফলিত হয় জীবনের প্রতিটি বাঁকে। বিশ্বের বুকে প্রথম ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মায়ের ভাষার মর্যাদার জন্য বুকের রক্তে রাজপথ লাল করেছিল বাংলার দামাল ছেলেরা। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ও সরকারি দপ্তরে চালু করার দাবি পাকিস্তানের তৎকালীন সরকারকে তারা মানতে বাধ্য করেছিলো।
দেশে দেশে শিশুর প্রথম পাঠদান তার মাতৃভাষায় দেয়া হয়। তাইতো কবি বলেছেন, মা তোর বুকের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো। জাতীয় সংগীত যেকোন দেশের মানুষকে প্রথমেই আন্দোলিত করে। স্বকীয়তা শেখায়। জীবনের যে বয়সেই প্রথম নিজেকেই স্বাধীন মনে হয় সে সময়ের বর্ণনা দেয়া যেকোন মানুষের জন্য অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
প্রথম প্রশংসা পাওয়ার আনন্দ নিজের নিরাপত্তা ও ভরসার মতো আত্মিক প্রশান্তি বাড়িয়ে তোলে। প্রথম কারো প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ, ক্ষমা করার তৃপ্তি ও নিজের ভুল স্বীকার করে নতুনভাবে শুরু করে অনেক রাজা, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী জনগণের মন জয় করে আবারও ক্ষমতার মসনদে বসেছেন।
ঝগড়ার পর হাসি দিয়েই জীবন আবার চলতে থাকে। প্রথম প্রথম ভুল স্বীকার করতে লজ্জা হলেও সময় সব ভুলিয়ে দিয়ে দাগ কিছুটা মুছে দিয়ে বলে এগিয়ে যাও। পৃথিবীতে আসা সেই প্রথম দিনের মতো আবার মৃত্যুর দিনক্ষণ গুনতে থাকো।
সম্পর্ক ও ভালোবাসার মুহূর্ত হৃদয়ে শিহরণের এক অদ্ভুত দোলা দেয়। প্রিয়জনের মুখে শোনা ‘ভালোবাসি’ শব্দটি সন্তানের জন্ম দেয়ার মতো জীবনের সবচেয়ে স্বর্গীয় ও আনন্দের মুহূর্ত হয়ে থাকে।
লেখক: সাংবাদিক
