প্রস্তাবিত চুক্তিতে কী আছে যা মার্কিন-ইরান সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারে?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ০২:১৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাতের পর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতিকে একটি আরো দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমঝোতায় রূপ দেওয়ার জন্য একটি চুক্তির দিকে এগোচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র। উভয় পক্ষই একটি “সমঝোতা স্মারক” নিয়ে আলোচনা করছে, যা বাকি থাকা সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সমাধানের একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ নির্ধারণ করবে। তবে এখনো পর্যন্ত এটি একটি প্রাথমিক পর্যায়ের অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। খবর সিএনএনের।
সোমবার (২৫ মে) ভারত সফরের সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এটি এখনো একটি চলমান কাজ। আমরা হয় একটি ভালো চুক্তি পাব, নতুবা বিষয়টি
সমঝোতা স্মারকের সম্ভাব্য কাঠামো ও উদ্দেশ্য
প্রস্তাবিত এই সমঝোতা স্মারকের মূল ভিত্তি হলো, এটি স্বাক্ষরিত হলে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কার্যত অবসান ঘটবে। এতে উভয় পক্ষের জন্য স্বস্তির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এবং ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে।
একজন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন যে খসড়া সমঝোতা চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে, তাতে ধাপে ধাপে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ শিথিল করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এরপর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অন্যান্য জটিল বিষয়, যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত করার কথা বলা হচ্ছে।
রুবিও বলেন, প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি দৃঢ় ভিত্তির চুক্তি রয়েছে এবং একই সঙ্গে ইরানকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিতে হবে।
একজন মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, এই কাঠামো অনুযায়ী দুই পক্ষকে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে ৬০ দিনের সময় দেওয়া হবে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে শর্ত ও অবস্থান
প্রস্তাবিত চুক্তিতে বলা হচ্ছে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। একই সঙ্গে দেশটিকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ ত্যাগ করতে হবে, যাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রায়ই “নিউক্লিয়ার ডাস্ট” বলে উল্লেখ করেন। এই ইউরেনিয়াম মজুদ কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে তা পরবর্তী ধাপের আলোচনায় নির্ধারণ করা হবে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই কাঠামোর মূল বিষয় হলো, ইরান যদি শর্ত পূরণ না করে, তবে তারা কিছুই পাবে না। কোনো অগ্রগতি না হলে কোনো অর্থ ছাড়ও হবে না। হরমুজ প্রণালি যতটা খুলবে, অবরোধও ততটাই শিথিল হবে।
ইরানের অবস্থান ও বিরোধ
তবে ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এই সমঝোতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকের একটি বা দুটি ধারায় এখনো মতবিরোধ রয়েছে।
এদিকে ইরান বলেছে, তারা এখনই কোনো চুক্তিতে ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, পারমাণবিক স্থাপনা বন্ধ বা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, এই পর্যায়ে পারমাণবিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। তবে ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, প্রণালিটি ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
ইরানের অবস্থান অনুযায়ী, প্রণালি খুলে দেওয়া মানে তাদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ছাড় দেওয়া নয়। বরং সীমিতভাবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ৩০ দিনের মধ্যে পূর্বযুদ্ধকালীন পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা হতে পারে। ইরান দাবি করছে, এই প্রণালির মাধ্যমে চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি মূলত তাদের এবং উপকূলবর্তী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়, যুক্তরাষ্ট্রের নয়।
আরো পড়ুন : সুর নরম করে ট্রাম্প বললেন, চুক্তিতে তাড়াহুড়ো নয়
ইরানের বরফ-বন্ধ অর্থ ও শর্ত
ইরান বর্তমানে চায় বিদেশে আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবিলম্বে মুক্ত করা হোক। দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, আলোচনার শুরুতেই এই বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার পরই এসব অর্থ ছাড় করা হবে। তবে এই সম্পদ বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে রয়েছে এবং এগুলো ফেরত দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।
নিষেধাজ্ঞা ইস্যু
ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে তেল রপ্তানিতে এই নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলেছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার তাদের প্রধান দাবি, তবে এটি প্রথম ধাপে আলোচনায় বিস্তারিতভাবে আলোচনা হবে না। একজন ইরানি কর্মকর্তা বলেন, এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা হবে না, তবে বিষয়টি চুক্তির মূল পাঠ্যে উল্লেখ থাকবে। তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে ইরানের তেল রপ্তানি থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত আয় হতে পারে।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ইরানের দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করতে হবে। তবে সাম্প্রতিক আলোচনায় এই বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে।
লেবানন ও আঞ্চলিক সংঘাত
আলোচনায় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সংঘাত। তাসনিম জানিয়েছে, খসড়া সমঝোতা স্মারকে “সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান” কথাটি উল্লেখ আছে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। তবে ইসরায়েলি সূত্র বলছে, তারা যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার বজায় রাখতে চায়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বলেছেন, ইসরায়েল সব ফ্রন্টে নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
সব মিলিয়ে ইরান বলছে, তারা একটি ন্যায্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তির জন্য প্রস্তুত, যার মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যে কোনো চুক্তি অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিরোধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শর্ত পূরণ করতে হবে। তবে উভয় পক্ষ আলোচনায় অগ্রগতি দেখালেও চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
