×

বিশেষ সংখ্যা

বিশ্বমিডিয়ায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ : নৃশংস যুদ্ধাপরাধের প্রতিচ্ছবি

Icon

ফেরদৌস আরেফীন

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ১০:১০ এএম

বিশ্বমিডিয়ায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ : নৃশংস যুদ্ধাপরাধের প্রতিচ্ছবি

বিশ্বমিডিয়ায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ : নৃশংস যুদ্ধাপরাধের প্রতিচ্ছবি

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক এক নৃশংস সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিজয়কে অস্বীকার করা। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন গণমাধ্যমে কঠোর সেন্সরশিপ জারি করে এবং সব বিদেশি সাংবাদিকদের দেশ থেকে বের করে দেয়, তখন বিশ্বের কাছে সত্য পৌঁছানো ছিল এক প্রায় অসম্ভব। তবুও, কয়েকজন সাহসী সাংবাদিক, কূটনীতিক এবং স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে অপারেশন সার্চলাইটের নৃশংসতার খবর বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে—যা আন্তর্জাতিক মতামত গঠনে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নির্লজ্জ সেন্সরশিপ ও সাংবাদিক নির্বাসন

অপারেশন সার্চলাইট শুরুর পরপরই পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ সব বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বহিষ্কার করে এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করে। ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিকদের কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে দেওয়া হয়নি। দ্যা নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক সিডনি শ্যানবার্গ পরে স্মরণ করেন, আর্মি অফিসাররা তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এক ক্যাপ্টেন সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলেন, ‘আমি তোমাদের সামলাতে পারব। যদি আমি নিজের মানুষকেই মারতে পারি, তাহলে তোমাকেও মারতে পারব’।

এই পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ সাংবাদিককে ২৬ মার্চের মধ্যে ঢাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু সাংবাদিক লুকিয়ে থেকে যান—যার মধ্যে ছিলেন সাইমন ড্রিং, আর্নল্ড জেইটলিন এবং মাইকেল লরেন্ট। তারাই প্রথম বিশ্বের কাছে অপারেশন সার্চলাইটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হন।

সাইমন ড্রিং-এর প্রথম প্রতিবেদন

লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফের যুদ্ধ সংবাদদাতা সাইমন ড্রিং ছিলেন প্রথম সাংবাদিক যিনি বিশ্বের কাছে অপারেশন সার্চলাইটের নৃশংসতার খবর পৌঁছে দেন। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফে ‘হাও ঢাকা পেইড ফর আ ইউনাইটেড পাকিস্তান’ শিরোনামে তার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

ড্রিং প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় লেখেন, ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মার্কিন নির্মিত এম-২৪ ট্যাঙ্ক নিয়ে এক কলাম সৈন্য অগ্রসর হয়। ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি দখল করে সেখান থেকে কামান চালিয়ে ছাত্রাবাসগুলোতে গোলাবর্ষণ করা হয়। ইকবাল হলে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ২০০ ছাত্র নিহত হয়।

বিবিসি ও মার্ক টালি

পাকিস্তানি গণমাধ্যম যখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল, তখন বিবিসি রেডিও ছিল বাঙালিদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রধান উৎস। বিবিসির ভারত সংবাদদাতা স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর ব্যাপক প্রতিবেদন করেন। তার বিবিসি সম্প্রচার ছিল সাধারণ মানুষের কাছে সত্য জানার প্রধান মাধ্যম।

মার্ক টালি এবং সিডনি শ্যানবার্গ পরবর্তীতে কলকাতা থেকে প্রতিবেদন পাঠাতে থাকেন। ১৯৭১ সালের জুনে শ্যানবার্গ দ্যা নিউইয়র্ক টাইমসে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পদ্ধতিগত চিত্র তুলে ধরেন।

সাড়া জাগানো ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ, তৎকালীন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে একটি গোপন টেলিগ্রাম পাঠান, যা ইতিহাসে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত। এই বার্তায় তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর কার্যকলাপকে ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’ বা নির্বাচিত গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেন।

তিনি লেখেন, ‘পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সমর্থনে অ-বাঙালি মুসলমানরা দরিদ্র জনপদে আক্রমণ চালিয়ে বাঙালি ও হিন্দুদের হত্যা করছে’।

৬ এপ্রিল, ব্লাড এবং ঢাকা কনস্যুলেটের ২০ সদস্য মার্কিন সরকারের নীরবতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানান। তাদের টেলিগ্রামে উল্লেখ করা হয়: ‘কিন্তু আমরা হস্তক্ষেপ না করার পথ বেছে নিয়েছি—নৈতিকভাবেও নয়—এই অজুহাতে যে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব, যেখানে দুর্ভাগ্যবশত ‘গণহত্যা’ শব্দটি প্রযোজ্য, তা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়’।

এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের আত্মত্যাগ

১৯৭১ সালের ১৩ জুন লন্ডনের দ্যা সানডে টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। এটি লিখেছিলেন নেভিল অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস—একজন পাকিস্তানি সাংবাদিক, যিনি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আমন্ত্রণে পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন।

ম্যাসকারেনহাস ছিলেন আট সাংবাদিকের একটি দলের সদস্য যাদেরকে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে যায় অপারেশন সার্চলাইটের সাফল্যের গল্প লেখানোর জন্য। কিন্তু তিনি যা দেখেছিলেন তাতে তিনি হতবাক হয়ে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে চারজন ছাত্রের পঁচে যাওয়া মাথা দেখেন। কুমিল্লায় সৈন্যদের গুলির আওয়াজ এবং নির্যাতনের শব্দ শুনেন। পাকিস্তানি অফিসারদের গর্বের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে শোনেন।

পাকিস্তানে ফিরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন সত্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরবেন। স্ত্রী ও সন্তানদের নিরাপদে ইউরোপে পাঠানোর পর তিনি আফগানিস্তান হয়ে লন্ডনে পৌঁছান। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন দ্যা সানডে টাইমসে তার ৯,০৪৭ শব্দের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ‘জেনোসাইড’ শিরোনামে। বিশ্ব সত্যিই স্তম্ভিত হয়ে যায়।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পরে দ্য সানডে টাইমসের সম্পাদক হ্যারল্ড ইভান্সকে জানান, ম্যাসকারেনহাসের প্রতিবেদন তাকে এত গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল যে তিনি ইউরোপীয় রাজধানীগুলোতে কূটনৈতিক প্রচারণা শুরু করেন এবং ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের পথ প্রস্তুত করেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা

এই প্রতিবেদনগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য টাইমস, বিবিসি—বিশ্বের প্রধান সব গণমাধ্যমই পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা নিয়েও প্রতিবেদন করতে শুরু করে।

আন্তর্জাতিক কমিশন অব জুরিস্টসের এক গবেষণায় ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে লক্ষ্যবস্তু করা হত্যাকাণ্ডের ‘অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ’ পাওয়া যায়। রেডক্রস এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও গণহত্যার চিত্র ফুটে ওঠে।

বেইমান গোষ্ঠী আল-শামস ও আল-বদর

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় সহযোগী বাহিনী অল শামস, আল বদর এবং রাজাকাররা নৃশংসতায় অংশ নেয়। এই বাহিনীগুলো জামায়াতে ইসলামীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের তালিকা তৈরি করে হত্যাযজ্ঞ চালায়।

অবশেষে ৫৫ বছর পর  চোখ খুললো আমেরিকা 

অপারেশন সার্চলাইটের ৫৫ বছর পর, ২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান একটি প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন, যা পাকিস্তানি বাহিনী এবং জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১ সালের নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ ও ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানায়।

প্রস্তাবনায় আর্চার ব্লাডের টেলিগ্রামের উল্লেখ করে বলা হয়, পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা ‘নির্বিচারে জাতিগত বাঙালিদের গণহত্যা করেছে, তাদের রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও ছাত্রদের হত্যা করেছে, হাজার হাজার নারীকে যৌনদাসীতে পরিণত করেছে’ এবং ‘বিশেষ করে হিন্দু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্মান্তরিতকরণ ও জোরপূর্বক বিতাড়নের মাধ্যমে নির্মূল করতে লক্ষ্যবস্তু করেছে’।

প্রস্তাবনা হাউস কমিটি অন ফরেন অ্যাফেয়ার্সে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে।

আজ, ৫৫ বছর পর, মার্কিন কংগ্রেসের সাম্প্রতিক উদ্যোগ প্রমাণ করে যে গণমাধ্যমের সেই ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং অপারেশন সার্চলাইটের নৃশংসতার সত্য এখনও বিশ্বের স্মৃতিতে অম্লান।

লেখক: সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আজীবন সদস্য

টাইমলাইন: মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ২০২৬

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ভারত থেকে আসামিদের আনার প্রক্রিয়া চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

হাদি হত্যা ভারত থেকে আসামিদের আনার প্রক্রিয়া চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ভারতে বাস-লরির সংঘর্ষে নিহত ১৩

ভারতে বাস-লরির সংঘর্ষে নিহত ১৩

স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানালো ঢাবি

স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানালো ঢাবি

দেশেরে বাজারে ফের কমলো স্বর্ণের দাম

দেশেরে বাজারে ফের কমলো স্বর্ণের দাম

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App