শব্দযুদ্ধের ইতিহাস: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র
মনজুর আহমেদ
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম
শব্দযুদ্ধের ইতিহাস: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র
‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ অথবা `তীর হারা ওই ঢেউয়ের সাগর’ গানগুলো কানে আসলেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে ১৯৭১, মহান মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নাম। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই গানগুলোর মাধ্যমেই জেনেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। একাত্তরের উত্তাল সময়ে, যখন পুরো বাংলাদেশ যুদ্ধের আগুনে জ্বলছিল, তখন বন্দুকের পাশাপাশি আরেকটি শক্তিশালী অস্ত্র ছিল- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। এই বেতার কেন্দ্রের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি গান এবং প্রতিটি ঘোষণা বাঙালির হৃদয়ে জাগিয়ে তুলেছিল স্বাধীনতার অদম্য স্পৃহা।
আজ আমরা অনেক সহজেই সেই দিনগুলোর কথা বলতে পারি, বেতারের গানগুলো শুনে শিহরিত হই, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা এই বেতার কেন্দ্রের যাত্রা সহজ ছিলো না। প্রতিটি কর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করে গেছেন `শব্দ সৈনিক’ এর কাজ। অনেকেই জানেন না স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কিভাবে শুরু হয়েছিলো।
মূলত ২৫ মার্চ কালোরাত্রিতে হানাদার বাহিনীর আক্রমণের পরে ২৬ শে মার্চ চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ থেকে বেতার সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, কিন্তু আগ্রাবাদ, বন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় পাক বাহিনীর আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে কালুরঘাট থেকে বেতার সম্প্রচার শুরু হয়। রেডিও পাকিস্তানে কর্মরত কর্মকর্তা-কলাকুশলীদের নিয়েই যাত্রা শুরু করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। বেলাল মাহমুদের সঙ্গে যোগ দেন আবুল কাশেম সন্দীপ ও আব্দুল্লাহ আল ফারুক। অনুষ্ঠান ঘোষণার দলে ছিলেন ফজল হোসেন, হোসনে আরা এবং সুলতান উল আলম। শুরুতে আবুল কাশেম সন্দীপ এর পরামর্শে এই বেতার কেন্দ্রের নাম দেয়া হয় `স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’।
কবি আব্দুস সালাম কোরআনের বানী দিয়ে এই বেতার কেন্দ্রের যাত্রা শুরু করেন। এরপরে তিনি, যার কাছে যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান করেন, কিছু না থাকলে মরিচের গুঁড়া নিয়ে প্রস্তুত হতে বলেন। আব্দুস সালাম শেষ করার পরপরই আব্দুল্লাহ আল ফারুক ইংরেজিতে একটি বুলেটিন পাঠ করেন। এই বুলেটিনে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে এই ঘোষণা দেয়া হয় এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সহযোগিতার আহবান করা হয়। একই বুলেটিন আবুল কাশেম সন্দীপ বাংলায় পড়েছিলেন। ২৬ এ মার্চেই পরের অধিবেশনে চট্টগ্রামের তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠ করেন এবং এই বেতার কেন্দ্র বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই প্রতিষ্ঠা হয়েছে এমন তথ্যও জানানো হয়। এরপর ২৭ মার্চ তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এই বেতার কেন্দ্র থেকেই এবং এর পরপরই বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি সামনে আসে। ৩০ মার্চ পাকবাহিনী কালুর ঘাটে আক্রমণ করলে এখান থেকে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
৪দিন পরে ভারতের আগরতলা থেকে ছোট্ট একটি ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র আবার যাত্রা শুরু করে। এ সময়ে মূলত দেশাত্মবোধক গান, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আর বুলেটিন প্রচার করা হতো। ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় এবং ওই সরকার ভারতের কাছে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সমিটার দাবি করে এবং ভারত সরকার সেই দাবি অনুযায়ী আকাশবাণী কলকাতার একটি সম্প্রচার মাধ্যম স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রকে দেয়।
২৫ মে নতুন করে যাত্রা শুরু করে `স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ নামে। এইদিন মাহমুদউল্লাহ চৌধুরীর কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয়, এরপরে `বজ্রকন্ঠ’ নামের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা হয় আর কামাল লোহানী আবৃত্তি করেন নজরুলের `বিদ্রোহী’ কবিতাটি। প্রথম সংবাদ পাঠ করেন নাট্যব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম।
দেশ-বিদেশে পৌঁছানোর জন্য আলমগীর কবিরের নেতৃত্বে শুরু হয় ইংরেজি বিভাগ, যেখানে পরবর্তীতে আলী যাকের যোগ দেন। পূর্ব-পশ্চিমের সকল নাগরিক যাতে বুঝতে পারে সেজন্য উর্দুতেও অনুষ্ঠান প্রচার হতো। জাহেদ সিদ্দিকীর ব্যাংগাত্মক উর্দু অনুষ্ঠানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবচাইতে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিলো এম আর আখতারের `চরমপত্র`। তুমুল জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠান মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক উজ্জীবিত করতো। অনেক মুক্তিযোদ্ধা এই অনুষ্ঠানের কথা বলতে গিয়ে এখনও শিহরিত হন। ‘ জল্লাদের দরবার’ নামে একটি ধারাবাহিক নাটক প্রচার হতো যেটা মুক্তিকামী মানুষদের সাহস যোগাতো। পাকিস্তানি হানাদারদের বিভিন্ন স্থানে পরাজিত ও নাজেহাল হওয়ার সংবাদ প্রচারের মুল উদ্দেশ্য ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস এবং মনোবল যোগানো। গোবিন্দ হালদারের লেখা `মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ গানটি প্রচারের পর ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। এরকম অসংখ্য গান, কবিতা, নাটক, অনুষ্ঠান, সংবাদ প্রচার করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র রণাঙ্গনে থেকেছে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে। ৯মাস যুদ্ধের মাঝে ঈদের চাঁদ নিয়েও কথা বলেছে মুক্তির অন্যতম হাতিয়ার এই বেতার কেন্দ্র। ৬ই ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, `বাংলাদেশ বেতার’ নামে অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের `শব্দযুদ্ধের প্রধান ঘাঁটি`। এটি শুধু তথ্য প্রচার করেনি, বরং জাতির মনোবল দৃঢ় করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধকে সাংস্কৃতিকভাবে শক্তিশালী করেছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুধু একটি বেতার স্টেশন ছিল না—এটি ছিল একটি আন্দোলন, একটি প্রেরণা, একটি যুদ্ধের কণ্ঠস্বর। এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি গান আজও আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়, হৃদয়ের গভীর থেকে শোনা যায়, ‘ বিজয় নিশান উড়ছে ওই, উড়ছে ওই…’
লেখক: গণমাধ্যম কর্মী
