সফিক রহমানের এক জোড়া কবিতা
সফিক রহমান
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৬ পিএম
সফিক রহমানের এক জোড়া কবিতা
কাকের জীবন
শৈশবে পুনর্জন্মের ভূত
চেপে বসেছিল ঘাড় রেখে মাথায়-
মাথার ভেতর কেবল ঘুরত-
এই জন্মটা কোনো মতে টেনেটুনে গেলেই হলো,
পরের জন্ম- আহা! শান্তি, শান্তি, ঔম শান্তি!
খাবারের ভাবনা নেই
আয়-রোজগারের তাড়া নেই
ঘরের মায়া নেই
সবচেয়ে বড় কথা-
পড়ালেখা প্যারা নেই
পরীক্ষার চাপ নেই
সে যে এক কাকের জীবন!
ছোট্টমোট্ট একটা কাক-
পরের জন্মে একটা কাক হবো।
ব্যাস-
আমি একটা কাক হবো
ছোট্টমোট্ট, কৃঞ্চ-কালো,
আপন এক কাক পাখি
আমাদের থাকবে দুই ঠিকানা-
দাদাবাড়ি আর বাবার গড়া নতুন ঘর
যখন-তখন উড়ে যাবো
এই আঙিনা থেকে ওই আঙিনায়।
আমাকে দেখে
মা চিনে নেবে, বড় আপাও
ডাকবে- নতুন নামে
পুরোনো ঠিকানায়
এক মুঠো ভাত বাটিতে দিলেই হলো
না দিলেও ক্ষতি কী!
কাকের আবার খাবারের কী এমন ভাবনা!
আমি উড়বো কীর্তিনাশার আকাশ ছুঁয়ে-
শোঁ-শোঁ শব্দে নয়
বাতাসের নরম তালে
ধীরে ভেসে ভেসে
মাঝপথে বিলাসপুরে
ফুপি আর বড় খালার উঠোনে
একটু দেখে যাবো চুপিচুপি।
নদীর বুকে ভেসে যাবে ইয়া বড় নৌকা-
উঁচু মাস্তুলে ফুলে ওঠবে পাল
দাঁড়ের ছপছপ শব্দে
রাতের আকাশে জেগে থাকবে নীল তারা
মাঝিরা কোথায় যায়
কোথায় ফেলে আসে ঘর
কে জানে!
আর দু'কূলের চেনা মানুষ
চেনা ছিপনৌকা
চেনা কূলঘেঁষা গাছপালা হাওয়া
পূবে-পশ্চিমে বদলে যাওয়া ছায়ার ভাষা
শীতের সকালের ধোঁয়াটে জল
বর্ষার ঢেউ
বাতাসে ভাসমান দিনের আলো
তীরের তালগাছে বাবুইয়ের নতুন বাসা
কচি কলাপাতার টিয়ে-রঙে
রোদের ঝলমলে মায়া
দেখবো এসব প্রাণ ভরে
অবাধে অবিরাম।
আমি হবো ছোট্টমোট্ট একটা কাক
বন্ধনহীন মুক্ত বিহঙ্গ
ঘুড়ির পাশে ভেসে থাকা হাওয়া ভর করে
মেঘেদের খুব কাছ ঘেঁষে উড়ে যাবো
রোদে বৃষ্টিতে সকালের নরম আলোয়
দুপুরের ক্লান্ত বটের ছায়ায় কিংবা
বিকেলের মরা আলোয় দেখবো নিজেকে
এ সবই হবে আমার।
কিন্তু কী অদ্ভুত!
শৈশব ছেড়ে আজকের দিনে
এই মানবজন্মটাই ভয় দেখায়
আগামী দিনের কাকের জীবনকে-
ভয় দেখাবার ভয়
তাড়াবার ভয়
বন্দি করার ভয়
মেরে ফেলার ভয়।
মহান মানবজীবনকেই ভয় পায়
শৈশবের সেই ছোট্টমোট্ট কাক।
দানুষ
দানব যে মানুষ
তার নতুন নাম-
দানুষ!
সে কল্যাণের কথা বলে
ন্যায়ের মুখোশ পরে;
অন্ধকারে-
আপন রক্ত পান করে
সে মানুষের ভেতরটাকে ছিঁড়েখুড়ে খায়।
দানুষ-
মানবতার মুখোশে মোড়া এক দানব
মিথ্যের আয়নায়
নিজেকে মানুষ বলে চালায়
সে আঘাত করে না শরীরে
সে ঢুকে পড়ে মস্তিষ্কে
চিন্তার শিরায় শিরায়
বিষ ঢেলে দেয় নিঃশব্দে।
দানুষ-
আলোর কথা বলে
ঘরে ঘরে আগুন লাগায়
সে ইতিহাস পোড়ায়
স্মৃতি মুছে ফেলে
মস্তিষ্কে জং ধরিয়ে
মিথ্যাকে সিংহাসনে বসায়-
আর সত্যকে নির্বাসনে পাঠায়।
তবু সে সম্মানিত,
মহামান্য, অমোঘ-
কারণ দানুষেরা
সবচেয়ে নিখুঁত অভিনয় জানে।
