ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ আয়োজন : সম্পাদকীয়
সেই ঈদ কি এখনো আসে...
মোঃ কামরুজ্জামান আরিফ
প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬, ১১:৩৬ পিএম
সম্পাদকীয়: সেই ঈদ কি এখনো আসে...
পৃথিবীতে যতই হানাহানি লেগে থাকুক, বছর ঘুরে প্রকৃতির অমঘ নিয়মে চন্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী ঈদ আমাদের মাঝে ঠিকই সময়মতো হাজির হয়। এই নিয়েমের ব্যত্যয় ঘটানো দুনিয়ার কারো পক্ষে সম্ভব না।
তাই তো ফিলিস্তিনের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ঈদ উৎযাপনের দৃশ্য আমাদের সামনে আসে। ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশেগুলোতে মুহুর্মুহু বোমা আর মিসাইলের মধ্যেও শিশু-কিশোররা ঈদের আনন্দে মেতে উঠতে দেখা যাচ্ছে।
সেই একই নিয়মে শহরের যান্ত্রিক জীবন ও অবিরাম ছুটে চলার মাঝে আমাদের দেশেও ফের হাজির হয়েছে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। ক্লান্তিহীন পথ চলার এক ঘেয়ে জীবনের মাঝে এ যেন এক সতেজতা ফিরে পাওয়ার উৎসবমুখর যাত্রাবিরতি।
অথচ, এই ঈদ ঘিরেই ছোট বেলায় আমাদের থাকতো কত পরিকল্পনা, কত আনন্দ আয়োজন। ঈদ আসবে এই কল্পনায় আন্দোলিত হতে থাকতো দিনের পর দিন। শৈশবের সেই আনন্দঘন ঈদ কি এখনো আসে....
ঈদের দিন ভোরে নামাজ আদায়, নতুন পোশাক পরিধান, সেমাই-পায়েস খাওয়া এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে দিনটি আনন্দঘন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঈদ-উল-ফিতরে আমাদের মাঝে ঈদের আনন্দটা একটু বেশিই নাড়া দিয়ে যায়। ঈদ এলেই শৈশবের চাঁদরাত, নতুন জামা পাওয়ার আনন্দ এবং সেমাই খাওয়ার স্মৃতি খুব মনে পড়ে।
ঈদের আগের দিন চাঁদ দেখার যে আয়োজন আর আনন্দ, তা মনে পড়লেই নস্টালজিক হতে হয়। ছোট থেকেই ঈদ আসলেই মনের মধ্যে বাজতে থাকে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন্ আসমানি তাগিদ।’ কাজী নজরুল ইসলামের রচিত এই গান না শুনতে পেলে যেন ঈদের আনন্দই শুরুই হতো না।
শৈশবের ঈদ মানেই ছিল সকালবেলার নতুন জামা গায়ে ঈদের নামাজে যাওয়া, ফিরে এসে সেমাই-ফিরনি খাওয়া, তারপর শুরু হতো ঘোরাঘুরি। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা, সালাম করে ‘ঈদি’ নেওয়া- এসবের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতো অসীম আনন্দ।
এখন সেই আনন্দের জায়গা দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন আর সোশ্যাল মিডিয়া। দেখা না করেও ‘ঈদ মোবারক’ বলা যায়, কিন্তু তাতে কি সেই অনুভূতি থাকে?
প্রযুক্তির এই যুগে ঈদের রূপও বদলে গেছে। ঈদ কার্ডের বদলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়, শৈশবের ছুটোছুটির বদলে ঈদের ছুটিতে মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকা, নিত্য নতুন পোশাকের ভীড়ে ঈদে নতুন পোশাকের আকাঙ্খাও হারিয়ে গেছে।
তাহলে কি আমাদের শৈশবের ঈদ পুরোপুরি হারিয়ে গেছে? নাকি আমরাই অনেক দূরে চলে গেছি?
তবে হ্যা, এখনও হয়তো আছে, আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের চাওয়ায়।
শুধু প্রয়োজন সেই অনুভূতিটাকে আবার জাগিয়ে তোলা। হয়তো তখনই আমরা বুঝতে পারবো, ঈদের আনন্দ আসলে কোথাও হারিয়ে যায়নি- আমরাই একটু দূরে সরে গিয়েছি।
যে কারণে, শৈশব-কৈশোরে কাটানো ঈদের মধুর স্মৃতিই আমাদেরকে ঈদ উপলক্ষে হাজারো বাধা অতিক্রম করে জন্মস্থানে বা প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার তাগিদ দেয়। সেই তাগিদ উপেক্ষা করা কঠিন।
তাই তো হাজারো প্রতিবন্ধকতা, অভাবের তাড়না, জীবনের মায়া, সবকিছু উপেক্ষা করে প্রিয়জনদের সাথে ঈদ করতে চরম ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের শৈশব-কৈশোবের গন্তব্যে ছুটে যায় মানুষ।
সেই আবেগ, সেই অনুভূতি কোন বাধা-বিপত্তি, কোন বক্তব্য-বিশ্লেষনই তোয়াক্কা করে না। ছুটে চলে অবিরাম...
হাজারো প্রতিবন্ধকতার এই দেশে একদিন আনন্দের ঈদ আসবে, হানাহানির এই পৃথিবীতে নিশ্চয় যুদ্ধের বিপরীতে একদিন শান্তি আসবে, যেখানে ঈদের আনন্দ সার্থক হবে।
সেই প্রত্যাশায় সকল পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই ‘ঈদ মোবারক’।
লেখক: হেড অব অনলাইন এন্ড ডিজিটাল, ভোরের কাগজ
