×

স্মরণ

স্মরণ

‘মশাল কি নিভে গেল বন্ধু?’

Icon

ফেরদৌস আরেফীন

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ০৯:৩৩ পিএম

‘মশাল কি নিভে গেল বন্ধু?’

স্মরণ: ‘মশাল কি নিভে গেল বন্ধু?’

আজ ছিলো ১৯ মে, একুশের অমর কাব্য ও স্বাধিকার আন্দোলনের অনির্বাণ দীপশিখা আবদুল গাফফার চৌধুরীর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২২ সালের এই দিনে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। 

বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়া গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর এক রাজনৈতিক পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা হাজী ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলা কংগ্রেস কমিটি ও খেলাফত কমিটির সভাপতি ছিলেন। এই নিঃশ্বাসবায়ু থেকেই যেন তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন স্বাধিকার ও প্রতিবাদের মূলমন্ত্র।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির অমর স্মৃতি বাঙালির ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গুলিতে শহিদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও আরও অনেকে। সে সময় ঢাকা কলেজের তরুণ শিক্ষার্থী গাফফার চৌধুরী ছুটে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের দেখতে। সেখানে ওপিডি কর্নারে তিনি দেখতে পান ভাষা শহিদ রফিকের বিক্ষত মৃতদেহ। সেই মর্মভেদী দৃশ্য দেখে মন-প্রাণ হাহাকার করে ওঠে; তিনি যেন নিজের ভাইকেই হারিয়েছেন। এই কান্না আর রক্তাক্ত বাস্তবতার অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় সেই অমর পঙক্তি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...’।

প্রথমে এটি কবিতা আকারে প্রকাশ পায় একটি বিপ্লবী পুস্তিকায়। পরে আলতাফ মাহমুদের সুরে এটি হয়ে ওঠে বাঙালির ভাষা আন্দোলনের প্রধান সঙ্গীত। ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার সর্বকালের সেরা বাংলা গানের তালিকায় এই গান তৃতীয় স্থান লাভ করে। আর, ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করার পর, বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে এখন আবদুল গাফফার চৌধুরীর সেই গান ধ্বনিত হয়। গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ভাষায়, ‘যতদিন বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা থাকবে, এই গাফফার চৌধুরীর একুশের গানটিও ততদিন থাকবে। এটি শুধু গান হিসেবেই ব্যবহার হয়রি, এটি একটি আদর্শিক দিক উন্মোচন করেছিলো। তখন প্রতিঘাত করার প্রয়োজন ছিলো, সেটা গানের মাধ্যমে উনি মিটিয়েছেন।’

ওই গান লেখার সময় সবেমাত্র বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছেন গাফফার চৌধুরী। বরিশালে উলানিয়া জুনিয়র মাদ্রাসায় প্রাথমিকে পড়ার পর সেখানেই হাইস্কুলে ভর্তি, ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক পাস, তারপর ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৫৩ সালে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি নেন।

ঢাকায় এসেই রাজনৈতিক সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত করেন গাফফার চৌধুরী। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙতে গিয়ে নিজেও আহত হয়েছিলেন। 

ছাত্রজীবনেই সাংবাদিক হওয়ার পথ ধরেছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। ১৯৫০ সালে ঢাকা এসেই যোগ দেন ‘দৈনিক ইনসাফ’ পত্রিকায়। এর তিন বছর বাদে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের মাসিক সওগাতের দায়িত্ব নেন তিনি। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক হন। দুই বছর পর ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার রাজনৈতিক পত্রিকা ‘চাবুক’ সম্পাদনার ভার নেন। তবে পত্রিকাটি সামরিক শাসনের মধ্যে বেশিদিন বের হতে পারেনি। গাফফার চৌধুরী এরপর দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক জেহাদ এসব পত্রিকা পেরিয়ে ১৯৬৩ সালে সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদক হন।

১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে ‘দৈনিক আওয়াজ’ বের করেন গাফফার চৌধুরী। ১৯৬৭ সালে আবার ফেরেন দৈনিক আজাদে। ১৯৬৯ সালে পুনরায় যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে। মানিক মিয়া মারা গেলে দৈনিক পূর্বদেশে যোগ দেন তিনি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সপরিবারে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলা হয়ে কলকাতা পৌঁছান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সেখানে মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন গাফফার চৌধুরী। এছাড়াও তখন কলকাতার আনন্দবাজার ও যুগান্তর পত্রিকায় নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কলাম লিখতেন।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দৈনিক জনপদ বের করেন। ১৯৭৪ সালে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে লন্ডনে পাড়ি জমান, আর তারপর থেকে প্রবাসে থিতু তিনি। সেখানে ১৯৭৬ সালে তিনি ‘বাংলার ডাক’ নামে এক সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ‘সাপ্তাহিক জাগরণ’ পত্রিকায়ও কিছুদিন কাজ করেন। ১৯৮৭ সালে ‘নতুন দিন’ পত্রিকা বের করেন। এরপর ১৯৯০ সালে ‘নতুন দেশ’ এবং ১৯৯১ সালে ‘পূর্বদেশ’ বের করেন।

প্রবাসে থাকলেও বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে নিয়মিতই লিখে গেছেন গাফফার চৌধুরী। ১৯৭৪ সাল থেকে লন্ডনে বসবাস করলেও তাঁর লেখনী কখনো থেমে যায়নি। অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার অনন্য ভাষ্যকার হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়ে তিনি বিচরণ করেছেন।

ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকারের আন্দোলন পেরিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ- বলতে গেলে বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁক বদলের সাক্ষী ছিলেন যেন তিনি। গল্প-কবিতা-উপন্যাস লিখেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন, বাংলাদেশে কলাম লেখাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার পথ তৈরি করেছেন- এমন নানা গুণে গুণান্বিত গাফফার চৌধুরী।

প্রয়াত কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী গাফফার চৌধুরীর মৃত্যুর পর একটি পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘কবিতা এবং গানের পাশাপাশি বাংলা কথাসাহিত্যেও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এক স্মরণীয় নাম। আজ থেকে ছয় দশক আগে ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত তার দুটি গল্পগ্রন্থ কৃষ্ণপক্ষ এবং সম্রাটের ছবিকে এ দেশের কথাসাহিত্যে বাঁকবদলের বিন্দু বলা চলে। সম্রাটের ছবি গল্পটিতে তিনি স্বাধীন স্বদেশে বহমান ঔপনিবেশিক বাস্তবতাকে যে চারুদক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা এক কথায় অসাধারণ।’

প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ গাফফার চৌধুরীকে নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সেই পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশ আমল- তিনি যেন প্রত্যেকটা মানুষকে জানতেন। তিনি ছিলেন স্মৃতিধর। এ মানুষের পূরণ হওয়ার লোক নেই। একজন কিংবদন্তি মানুষ যাকে আমরা বলতে পারি যে, একটা জীবন্ত এনসাইক্লোপেডিয়া। ইতিহাস যেন ঠোঁঠস্থ ছিল, কণ্ঠস্থ ছিল তার। প্রতিটি সময়, সবকিছু, চমৎকার ভাবে তিনি বর্ণনা করতে পারতেন, বলতে পারতেন। ইতিহাসের সৃষ্টির সাক্ষী ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার আকাশে উনি একজন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো ছিলেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখনি বাঙালির হৃদয়ের কথা ফুটতো, বাঙালিকে আশাবাদী করে তুলতে পারতেন তিনি।’

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই আশার আলো দেখিয়ে গেছেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মুহুর্মুহু দাবানলে বারবার হতাশায় ডুবে যাওয়া বাঙালির জন্য তিনি লিখে গেছেন চেতনা জাগানো পংক্তি-

‘মশাল কি নিভে গেলো বন্ধু?
সূর্যের রঙ মাখা রোদ্দুর
রক্ত কি মুছে গেলো বন্ধু?
এই ঘোর অমানিশা কদ্দুর?
মুক্তির মৃতদেহ বন্ধু
রমনার রাজপথে বেওয়ারিশ
অভিমন্যুরা আজ খঞ্জ
নিরস্ত্রীর হাত করে নিশপিশ।
চৌকির সিপাহিরা বন্ধু
বন্দুক হাতে নিয়ে  শান্ত্রী
কলম লেখনী হলো স্তব্ধ
কবে হবে এই দেশে ক্রান্তি?
মশাল কি নিভে গেলো বন্ধু?
রোদ্দর মুছে যাবে সন্ধ্যায়
রক্ত কি মুছে যাবে বন্ধু?
জীবনটা কেটে যাবে তন্দ্রায়?’

লেখক: সাংবাদিক,  মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আজীবন সদস্য

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

আন্তর্জাতিক উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে বাংলাদেশ

বাজেট আসে যায়, কোনো পরিবর্তন নাই

মুজিবুর রহমান বাজেট আসে যায়, কোনো পরিবর্তন নাই

বেরোবির সাবেক ছয় উপাচার্যের পাঁচজনই মামলার আসামি, কারাগারে ৩

বেরোবির সাবেক ছয় উপাচার্যের পাঁচজনই মামলার আসামি, কারাগারে ৩

কর্মকর্তাদের মন্ত্রণালয়ে ফেরত

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত কর্মকর্তাদের মন্ত্রণালয়ে ফেরত

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App