লোকসানের মুখে মধ্যপাড়া পাথরখনি
মোস্তাফিজুর রহমান বকুল, পার্বতীপুর (দিনাজপুর)
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৬ পিএম
ছবি : ভোরের কাগজ
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ মধ্যপাড়া পাথরখনি ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়েছে। গত দুই অর্থবছরে খনিটি প্রায় ৪৪ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। চলতি অর্থবছরেও লোকসান অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, পাথর উৎপাদনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ বিস্ফোরক ‘অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট’-এর আমদানিতে সিটিভ্যাট আরোপ এবং অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। ফলে গড়ে প্রতিটন পাথর উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রায় ৫০০ টাকা কমে বিক্রি করতে হচ্ছে।
খনি সচল রাখতে হলে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আমদানিতে সিটিভ্যাট প্রত্যাহার, পাথর আমদানির ওপর শুল্ক বৃদ্ধি এবং মধ্যপাড়ার পাথরের ট্যারিফ ভ্যালু সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ১২০০–১৩০০ ফুট গভীর থেকে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পাথর উত্তোলন করা হয়। প্রতিদিন প্রায় তিন টন বিস্ফোরক ব্যবহার করতে হয়, যা আমদানি করা হয় বিদেশ থেকে। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ ও পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কারণে এসব উপকরণের দাম বেড়েছে।
এছাড়া, আগে যেখানে ২.৫ শতাংশ রয়্যালটি দিতে হতো, বর্তমানে তা বেড়ে ৫ শতাংশ হয়েছে। এক্সপ্লোসিভ আমদানিতে ৩৭ শতাংশ সিটিভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, যা আগে শূন্য ছিল। পাশাপাশি ডলার বিনিময় হার ৮৪ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১২৩ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদন ঠিকাদারের বিলের ৮০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রায় এবং ২০ শতাংশ দেশীয় মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। এতে অতিরিক্ত ব্যয় আরও বেড়েছে।
সূত্র জানায়, খনি ইয়ার্ডে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ টন পাথর মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ ২৭ হাজার টন ব্লাস্ট ও বোল্ডার পাথর। প্রতিদিনই এই মজুদ বাড়ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পে পাথর সরবরাহ করা হলেও রেলওয়ের বিদেশি পাথরের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় মধ্যপাড়ার পাথরের চাহিদা কমেছে। ফলে বিপুল মজুদ সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে মজুদ কমাতে ও উৎপাদন সচল রাখতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে উৎপাদন খরচের চেয়ে গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা কম দামে পাথর বিক্রি করা হচ্ছে।
খনিতে প্রতিদিন রেকর্ড পরিমাণ পাথর উৎপাদন হলেও ব্লাস্ট ও বোল্ডার বিক্রির গতি কম থাকায় ইয়ার্ড দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে স্থান সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে প্রায় ৮ শতাধিক শ্রমিক বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম বলেন, ডলার মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় খনিটি লোকসানে পড়েছে। পাথর আমদানিতে শুল্ক সমন্বয় ও বিস্ফোরক আমদানিতে করছাড় দিলে খনিটি আবার লাভজনক হবে।
এমজিএমসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ডি.এম. জোবায়েদ হোসেন জানান, বর্তমানে খনি ইয়ার্ডে প্রায় ১৪ লাখ ৯০ হাজার টন পাথর মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ব্লাস্ট প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন এবং বোল্ডার প্রায় ৩ লাখ ৭৭ হাজার টন। ব্লাস্ট ও বোল্ডার বিক্রি না বাড়লে অচিরেই উৎপাদন বন্ধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশে বছরে পাথরের চাহিদা ৩ কোটি টনের বেশি হলেও মধ্যপাড়ায় উৎপাদন হয় মাত্র ১৫–১৬ লাখ টন, যা মোট চাহিদার ৫–৭ শতাংশ। ফলে দেশকে এখনো ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
২০০৭ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে মধ্যপাড়া পাথরখনি। ২০১৪ সাল থেকে এর উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে বেলারুশের জেএসসি ট্রেস্ট সকটোস্ট্রয় ও জার্মানিয়া করপোরেশন লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে গঠিত জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে পাঁচ হাজার টন পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে।
