কুষ্টিয়ায় বেড়েছে তামাক চাষ : রবি মৌসুমে কৃষি আবাদে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা
প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
নুর আলম দুলাল, কুষ্টিয়া থেকে : ধান, পাট, আখ, সবজিসহ প্রায় সব ধরনের ফসলি জমিতে দিন দিন বাড়ছে তামাক চাষ। কুষ্টিয়া সদরসহ ৬টি উপজেলার কৃষি জমি তামাকের দখলে। সার, বীজ, কিটনাশকসহ চাষে আগাম টাকা দেয়ার মাধ্যমে সাধারণ কৃষকদের তামাক চাষে প্রলুব্ধ করছে বিএটিবিসহ বিভিন্ন দেশি বিদেশি দেশি তামাক কোম্পানি। এতে এ বছর রবি মৌসুমে কৃষি আবাদে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
তামাক কোম্পানিগুলোর লোভনীয় আশ্বাসের ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে তামাক চাষ। জেলার তিনটি উপজেলা জুড়ে তামাক চাষ হওয়ায় রবি মৌসুমে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর চাষিদের খাদ্যশস্য আবাদে উদ্বুদ্ধ করলেও তামাক কোম্পানির লোভনীয় বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার জন্য কুষ্টিয়ার তিনটি উপজেলায় তামাক চাষ ব্যাপকহারে বেড়েছে। ফলে খাদ্যশস্য ঘাটতির আশঙ্কা করছেন কৃষিবিদরা।
এক সময় কুষ্টিয়ার বিশাল এলাকা জুড়ে ধান, গম, আখ, মসুর, ছোলাসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ হতো। খাদ্যশস্য উৎপাদন করে জেলার খাদ্যের অভাব পূরণ করে আসছিলেন কৃষকরা। বর্তমানে ওইসব জমিতে আবাদ হচ্ছে তামাক। কুষ্টিয়া জেলার তিনটি উপজেলায় চলতি মৌসুমে তামাকের আবাদ হচ্ছে প্রায় ১২ হাজার হেক্টরে। ফলে জেলায় খাদ্যশস্য উৎপাদন দিনের পর দিন কমে যাচ্ছে। খাদ্যশস্য ঘাটতির কারণে জেলার বাইরে থেকে ধান ও গম সংগ্রহ করে এ জেলার মিল চাতালের চাহিদা পূরণ করতে হয়।
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি, ঢাকা টোব্যাকো এবং আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানি সহজ সরল চাষিদের অর্থের লোভ দেখিয়ে তামাক চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলেছে। যে কারণে বেশি লাভের আশায় চাষিরা খাদ্যশস্যের আবাদ ছেড়ে দিয়ে ব্যাপকহারে তামাক চাষে ঝুঁকছে।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়া জেলায় আবাদযোগ্য জমি রয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর। সেখানে এবার বোরো আবাদ হচ্ছে মাত্র ৩৬ হাজার ৮৩০ হেক্টর জমিতে। অপরদিকে তামাক কোম্পানিগুলোর মধ্যে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি, ঢাকা টোব্যাকো কোম্পানি ও আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানি প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ৩ হাজার ৬৯৬ হেক্টর, ভেড়ামারায় ৭৮০ হেক্টর এবং মিরপুরে ৬ হাজার ৪৫৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে।
মিরপুরের বারুইপাড়া গ্রামের তামাক চাষি নজরুল বলেছেন, টোব্যাকো কোম্পানিগুলো তাদের নগদ অর্থসহ সার, বীজ, কীটনাশক সরবরাহসহ বেশি মূল্যে তামাক ক্রয়ের নিশ্চয়তা দেয়ায় তারা তামাক চাষে ঝুঁকে পড়েছেন।
দৌলতপুর উপজেলার খলিসাকুন্ডি ইউনিয়নের তামাক চাষি আকসেদ আলী বলেন, আমি তিন বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছি। ঢাকা টোব্যাকো, আবুল খায়ের ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির কাছে বেশি দামে তামাক বিক্রি করতে পারব। আমরা লাভবান হব। তাই তামাক চাষ করছি। চাষিদের অভিযোগ, তারা অনুন্নতভাবে ধান ও খাদ্য শস্যের আবাদ করায় তারা এসব ফসলের লাভ কম পেতেন। তামাক চাষে এর ব্যতিক্রম হওয়ায় তামাক চাষে আগ্রহ বেড়েছে।
ভেড়ামারার ধরমপুর ইউনিয়নের তামাক চাষি মসলেম মণ্ডল বলেন, তামাক চাষে খরচ বেশি হলেও আবাদে চাষিদের আগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে তামাক কোম্পানিগুলো তামাক জ্বালানো ঘর, পাইপ ও নগদ অর্থ অগ্রিম দিচ্ছে। যে কারণে চাষিরা তামাক আবাদে ঝুঁকছে।
এদিকে তামাকের কারণে গ্রামাঞ্চলের শিশুদের কোল্ড ডায়রিয়া, নিমোনিয়াসহ হাঁপানি ও কাশির মতো রোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন পল্লী চিকিৎসক বিমল কুমার প্রমাণিক।
কুষ্টিয়া জেলার খাদ্য ঘাটতি মেটাতে তামাক চাষ বন্ধ করা না হলে আগামীতে এ জেলায় চরম খাদ্য সংকট দেখা দেবে। সেই সঙ্গে জেলাজুড়ে মঙ্গার সৃষ্টি হবে। তাই জরুরী ভিত্তিতে কুষ্টিয়া জেলায় তামাক চাষ বন্ধের জন্য সুশীল সমাজ দাবি করেছে।
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম বলেন, চাষিদের তামাক আবাদে নিরুৎসাহ করতে ব্যাপক চেষ্টা করা হচ্ছে। তামাক ছেড়ে রবি মৌসুমে ধান, গম, সরিষা, ভুট্টা আবাদের কথা বলা হলেও চাষিরা বেশি লাভের কারণেই তামাক আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তারপরেও আমরা মাঠ পর্যায়ে চাষিদের তামাক আবাদে নিরুৎসাহীত করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
ভেড়ামারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা সুলতানা বলেন, তামাক কোম্পানির লোভনীয় আশ্বাসে এবং বেশি লাভবান হবে বলেই চাষিরা তামাক চাষে আগ্রহ বাড়িয়েছে।
মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো চাষিদের তামাক আবাদের জন্য অগ্রিম সার, বীজ, কীটনাশকসহ জ্বালানি খরচ দিচ্ছে। সেই সঙ্গে বেশি দামে তামাক খরিদ করছে। এতে চাষিরা বেশি লাভবান হচ্ছে বলেই তারা তামাক চাষ ছড়ছে না। তামাক আবাদের প্রভাব পড়ে খাদ্য শস্যের উপর। তাই কৃষি বিভাগ খাদ্য শস্য ধান, গম, ভুট্টা ও অন্যান্য ফসল আবাদের জন্য চাষিদের মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। চলছে উদ্বুদ্ধকরণ সভা। তাই চলতি রবি মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কৃষি বিভাগ তৎপর রয়েছে।
