বইমেলা উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী : জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেই বাবার পথ অনুসরণে
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাগজ প্রতিবেদক : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। বাবার সেই পথ অনুসরণ করে জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেন তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেয়ার পর ১৯৭৪ সালে ভাষণ দিতে যান বঙ্গবন্ধু। সেখানে তিনি বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি বাংলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতার মাধ্যমে ভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে এসেছিলেন; তেমনি বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থিক ও মুক্তি সংগ্রামের কথা বাংলা ভাষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাবার পথ অনুসরণ করেই আমি জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিই। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বাঙালির ‘প্রাণের এ মেলা’র ৪০তম আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখায় ১১টি শাখায় ১৬ জনের হাতে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৩ তুলে দেন তিনি।
বই পড়ার অভ্যাস জরুরি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কঠিন প্রবন্ধ, জটিল বিষয় খুললেই চোখ বন্ধ হয়ে ঘুম চলে আসে। অনেকের নাকি ঘুম হয় না বলে ঘুমের ওষুধ খায়। আমি তো মনে করি, কঠিন বই পড়তে গেলেই ঘুম আসে। আমি এটাই অনুসরণ করি।
তরুণ সমাজের মধ্যে পড়ার অভ্যাস গড়তে উপজেলা পর্যায়েও বইমেলার আয়োজনের কথা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বাংলা একাডেমির লাইব্রেরিটা খুব পছন্দ ছিল আমার। বান্ধবী বেবি মওদুদকে সঙ্গে নিয়ে টিএসসিতে প্লেটে ভাত ভাগাভাগি করে খেতাম। পরে লাইব্রেরিতে বসে বই পড়তাম। বইমেলার ব্যাপ্তি আরো বাড়ানো দরকার। তবে বাংলা একাডেমির একটা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে স্থান হিসেবে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেলায় এসে মজা নেই মন্তব্য করে সরকারপ্রধান বলেন, ডানে-বামে-সামনে-পেছনে শুধুই নিরাপত্তা। এই বেড়াজালে আটকে থাকায় মেলায় ঘোরার স্বাধীনতাই হারিয়ে গেছে। ছোটবেলায় মেলায় আসার কথাও মনে পড়ে। ইতিহাস টেনে শেখ হাসিনা বলেন, মোনায়েম খান রবীন্দ্রসংগীত বন্ধ করতে বলেছিলেন। তৎকালীন বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক হাই। মোনায়েম খান তাকে বলেছিলেন, এখানকার শিক্ষকরা কেন রবীন্দ্রসংগীত রচনা করতে পারেন না? তখন উত্তরে হাই বলেছিলেন, তিনি লিখতে পারেন- তবে সেটি রবীন্দ্রসংগীত না, হবে হাইসংগীত! তাহলে বোঝেন, কেমন রাষ্ট্রের অধীনে ছিলাম আমরা!
প্রকাশকদের এখন থেকে মুদ্রণের পাশাপাশি ডিজিটালেও বই প্রকাশের পরামর্শ দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের বাংলা ভাষা মধুর। এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। এরপরও বই প্রকাশ হবে। তা কখনো যাবে না। বই পড়ার আনন্দ আছে। তবে এখনকার শিক্ষার্থীরা ট্যাবে ও ল্যাপটপে বই পড়ে। আমরা সেভাবে আনন্দ পাই না। তিনি বলেন, ভাষার সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা উচিত। তাই প্রকাশকদের বলব, এখন থেকে বই ডিজিটালি প্রকাশ করতে হবে। এতে শুধু দেশ নয়, বিদেশেও আমাদের ভাষার বই পৌঁছাতে পারব। অন্য ভাষাভাষীর লোকজনও আমাদের বই পড়ে। পাশাপাশি অডিও ভার্সনও তৈরি করতে হবে। বই প্রকাশে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরো বাড়াতে হবে। বাংলা একাডেমির একটা পৃথক পোর্টাল করে সেখানে বিভিন্ন ভাষাভাষী সাহিত্যের সন্নিবেশ ঘটাতে হবে।
বিদেশি ভাষা অনুবাদের বিপক্ষে অনেকে দাবি তুলেছেন উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, আমি অনুবাদের পক্ষে। অনুবাদ না হলে পৃথিবীর এত ভাষা আমরা কীভাবে জানব? কোনো দেশকে জানতে হলে, তাদের সংস্কৃতিকে জানতে হলে ভাষা অনুবাদের মাধ্যমে সহজে জানা যায়। তিনি বলেন, আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা দিয়েছি। সেটা করতেও পেরেছি। এখন ঘোষণা স্মার্ট বাংলাদেশের। দেশ সর্বক্ষেত্রে স্মার্ট হবে। সমাজের সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি আমাদের ডিজিাটালি নিয়ে যেতে হবে।
এর আগে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখায় ১১টি শাখায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৩ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবার মোট ১৬ জন পেয়েছেন এই পুরস্কার। পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন- কবিতায় শামীম আজাদ, কথাসাহিত্যে নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর ও সালমা বাণী, প্রবন্ধ/গবেষণায় জুলফিকার মতিন, অনুবাদে সালেহা চৌধুরী, নাটক ও নাট্য সাহিত্যে (যাত্রা/পালা নাটক/সাহিত্যনির্ভর আর্টফিল্ম বা নান্দনিক চলচ্চিত্র) মৃত্তিকা চাকমা ও মাসুদ পথিক, শিশুসাহিত্যে তপংকর চক্রবর্তী, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় আফরোজা পারভীন ও আসাদুজ্জামান আসাদ, বঙ্গবন্ধুবিষয়ক গবেষণায় সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ও মজিবুর রহমান, বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞান/পরিবেশ বিজ্ঞানে ইনাম আল হক, আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা/ভ্রমণকাহিনী/ মুক্তগদ্যে ইসহাক খান এবং ফোকলোরে তপন বাগচী ও সুমনকুমার দাশ।
এর আগে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিকাল ৩টার দিকে মেলাপ্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে উদ্বেধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার পরিচালনায় পরিবেশন করা হয় অমর একুশের গান। উদ্বোধন শেষে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ভাষা শহীদ ও বঙ্গবন্ধুর স্মরণে বিভিন্ন ফটো গ্যালারি ও ডিজিটাল আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ফিতা কেটে বইমেলার উদ্বেধন করে বাংলা একাডেমি প্যাভিলিয়নে প্রবেশ করেন। বাংলাদেশ পুলিশের স্টল এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের স্টল মাতৃভূমিতেও যান। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, বাংলা একাডেমির সভাপতি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। পাশাপাশি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগৃহীত রচনা : দ্বিতীয় খণ্ড’ এবং ‘প্রাণের মেলায় শেখ হাসিনা’ (বাংলা একাডেমিতে শেখ হাসিনার গত ২০ বারের ভাষণের সংকলন) শীর্ষক দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন তিনি।
