র‌্যাব মহাপরিচালক : নাশকতার তথ্য নেই তবুও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছি

আগের সংবাদ

বাংলাদেশের গর্ব, বিশ্বের বিস্ময় : জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে যেভাবে ডানা মেলল স্বপ্নের পদ্মা

পরের সংবাদ

স্বপ্নময় পারাপার

প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৪, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

অবশেষে আনন্দটা স্থায়ী হচ্ছে। খবরটা শুনে এক ধরনের শিহরণ অনুভব করল রিবন রাশেদ। একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে দুঃখ-কষ্টের স্মৃতি। আনন্দ যেমন মানুষকে উচ্ছ¦সিত করে, দুঃখ-কষ্ট তেমনই উ™£ান্ত করে। রিবন এতসব গভীর বিষয় বুঝতে পারে না। কিন্তু ও নিজের মতো বুঝে নিতে সক্ষম। সপ্তম শ্রেণির একজন ছাত্রের পক্ষে যতটা বোঝা সম্ভব। খবরটা হলো, ২৫ জুন ২০২২ পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হবে।
এই খবরে রিবন রাশেদের উচ্ছ¦াস প্রকাশের কারণ আছে। পদ্মার সঙ্গে ওর যোগসূত্র জন্ম থেকে। ওদের বাড়ি মাদারীপুরের তাঁতীবাড়ি এলাকায়। বাবা রাশেদুল হাসান ঢাকায় চাকরি করেন। ফলে মাওয়া ঘাট হয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে বাড়ি যেতে হয়। শিশুকাল থেকেই ও পদ্মার সঙ্গে পরিচিত।
ক্লাসমেট জুবেরীকে জড়িয়ে ধরল রিবন। আনন্দে। মানুষ অধিক আনন্দ পেলে প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরে। জুবেরী কিছুটা আঁচ করতে পেরেও জিজ্ঞেস করল, ঘটনা কী?
: ঘটনা তুই ভালো করেই জানিস। পদ্মা সেতু চালু হতে যাচ্ছে।
রিবনের কথা শুনে জুবেরী নিজের মুখে আঙুল ঘষে। এই আঙুল ঘষার মধ্যে একটা রহস্যের সন্ধান পায় রিবন। বুঝতে পেরেও বিষয়টা এড়িয়ে যায়। জুবেরী বলে, তোদের জন্য বড় সুবিধাই হবে রে।
ওর কথার মধ্যে কেমন যেন হতাশা। সেটাকে পাত্তা না দিয়ে নিজের কথা বলতে ব্যাকুল রিবন। বাবার সঙ্গে পদ্মা সেতু নিয়ে কী আলাপ হয়েছে, বাবা এই সেতু সম্পর্কে এত আগ্রহী কেন? ইত্যাদি।
এই তো কিছুদিন আগের কথা। খাবার টেবিলে বাবা বললেন, বলতো রিবন পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য কত?
রিবন ভাত মুখে দিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ওর জানার দরকার কী? সেতুর কাজ শেষ হলে পদ্মা পার হতে পারলেই হলো। ফেরির চেয়ে অনেক দ্রুত পার হওয়া যাবে তাতে সন্দেহ নেই। রিবনের মুখের ভাত গলায় নামতে চায় না। বাবা হেসে বললেন, বুঝতে পারছি প্রশ্নটা কমন পড়েনি। একটু কঠিন হয়ে গেছে। মেজারমেন্টের প্রশ্নে অ্যাকুরেট রিপ্লাই হতে হয়।
মা বললেন, তুমি হুট করে এমন কঠিন প্রশ্ন করলে কেন?
মায়ের সাপোর্ট পেয়ে মুখের ভাত পেটে চালান করতে পারল রিবন। আরেক লোকমা মুখে দিতে যাবে, তখন বাবা বললেন, ক্লাস সেভেনে পড়িস, এসব সাধারণ জ্ঞান থাকা দরকার। তাছাড়া পদ্মা সেতু একটা আলোচিত বিষয়। ঠিক আছে, উত্তরটা আমি দিয়ে দিচ্ছি, মনে রাখিস। পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার আর প্রস্থ ১৮.১০ মিটার।
মনে মনে মুখস্থ করার চেষ্টা করে রিবন, সিক্স পয়েন্ট ওয়ান ফাইভ কিলোমিটার। খেতে বসে পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য মুখস্থ করা চাট্টিখানি কথা নয়। বাবা আবার প্রশ্ন করেন, বল তো পদ্মা সেতু কিসের তৈরি?
আবার রিবনের মুখে ভাত আটকে যায়। বাবা বললেন, দৈর্ঘ্যই যখন জানিস না তখন তৈরির কথা জানবি কী করে? আমি বলে দিচ্ছি, কংক্রিট আর স্টিলের তৈরি।
মা বললেন, এরপর তো জানতে চাইবে কয়টা পিলার, কয়টা স্প্যান? তুমি রিবনকে ইঞ্জিনিয়ার বানিয়ে ছাড়বে দেখছি। কিন্তু ও তো ডাক্তার হতে চায়।
বাবা বললেন, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বড় কথা নয়। জেনারেল নলেজ থাকাটা জরুরি। দেশে এত বড় একটা কাজ হচ্ছে আর আমরা এ বিষয়ে জানব না, তা ঠিক নয়।
রিবন বলল, ঠিক আছে বাবা। আমি জানার চেষ্টা করব।

এরপর একদিন খাবার টেবিলে আবার পদ্মা সেতু প্রসঙ্গ উঠল। বাবার সঙ্গে নাদের আলী শেখ নামে গ্রামের একজন তর্ক করেছিল। নাদের বলেছিল, ‘পদ্মা সেতুর নামে টাকা লুটপাট হইতেছে। সেতু কোনুদিন আলোর মুখ দেখবি নে।’ বাবা বলেছিলেন, এই সেতু তৈরি হবে এবং আমার জীবদ্দশায় সেতু দিয়ে পার হবো?
নাদের বলেছিল, ‘তুমি কেন, তোমার পোলা-ও দেইখ্যা যাবার পারবি নে। পদ্মায় ব্রিজ হওয়া সোজা কাম না। টাকা পাইবে কই? বিশ্বব্যাংক তো বুড়া আঙুল দেখাইয়া মুখ ফিরাইয়া নিছে। তোমার পোলা বড় হইলে বিশ্বব্যাংকের কাছে দৌড়াদৌড়ি করবার কইও।’
রিবনের কথায় হেসে ফেলে জুবেরী। বলে, সেই লোকটি এখন কোথায়?
: আছে তো গ্রামেই।
: এবার পদ্মা সেতু দিয়ে পার হয়ে বাড়ি যাবি। তাকে বলবি, ফেরি অচল- সেতু সচল। ঢাকায় গেলে সাঁতরিয়ে পার হতে হবে আপনাকে।
দু বন্ধু হেসে গড়াগড়ির উপক্রম। এরপর সেতু নিয়ে গল্প করে যায় রিবন। ও সেদিন বাবাকে এক নিশ্বাসে বলে, পদ্মা সেতুতে মোট ৪১টি স্প্যান ও ৪২টি পিলার আছে। প্রতিটি পিলারে ৬টি করে পাইল করার কথা, কিন্তু ডিজাইনের কারণে ৭টিও করা হয়েছে। মোট ২৯৪টি পাইল করা হয়েছে। প্রতিটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য ১৫০ মিটার। এই সেতু ২৯টি জেলার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে। খরচের পরিমাণ ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
এবার বাবার মুখে ভাত আটকে যাওয়ার উপক্রম। বাবা বললেন, তুই এত সব জানলি কী করে?
: বাবা, জেনারেল নলেজ খুব সহজ একটা ব্যাপার। পত্রিকা পড়লে জানা যায়, টিভির খবর শুনলে জানা যায়। এছাড়া গুগল আছে, ইউটিউব আছে, অনলাইন পত্রিকা আছে।
: আমি তো অবাক হচ্ছি রে। এসব তথ্য আমিও দিতে পারতাম না।
মা বললেন, তোমার তো তথ্য দেয়ার দরকার নেই। প্রশ্ন করলেই তথ্য পেয়ে যাবে।
তিনজন হো-হো করে হাসতে থাকে। মায়ের পাশে বসা ৫ বছরের স্বপ্না রাশেদ অতটা বুঝে উঠতে পারে না। স্বপ্না জিজ্ঞেস করে, তোমরা কী নিয়ে হাসাহাসি করো? আমাকে বলো না?
মা ওর কপালে আদর দিয়ে বলেন, ওরে আমার গুলুগুলু সোনা- আমরা তোমার কথাই বলছি। তুমি পদ্মা সেতু দিয়ে নদী পার হবে। ভীষণ মজা হবে।
স্বপ্না আদুরে গলায় বলে, কবে পার হবো মা? আমি এখনই মজা করব।
: এই তো আর কটা দিন। এক মাসও লাগতে পারে, দু মাসও লাগতে পারে।
: ও-।
স্বপ্না এমনভাবে ‘ও’ বলল যেন সবকিছু বুঝে ফেলেছে। বাবা বললেন, স্বপ্নার তো মনে থাকার কথা নয় সেই ঘটনা। একবার ঈদের নামাজ পড়েছিলাম মাওয়া ঘাটে।
রিবনের মনে পড়ে গেল। এই তো, বছর চারেক আগের কথা। ঈদের ছুটিতে সবাই বাড়ি যাচ্ছিল। দাদা-দাদির সঙ্গে গিয়ে ঈদ করবে রিবনরা। ঈদের আগের দিন বাসে করে রওনা হয়েছে। তাঁতীবাড়ি যেতে সন্ধ্যা হবে, বড়জোর রাত ৮টা বাজবে। কিন্তু মাওয়া ঘাটে পৌঁছানোর ৪০/৪২ কিলোমিটার আগেই ওদের বাসটা থেমে গেল। পুরো সড়ক আটকে আছে গাড়িতে। গাড়ি আর গাড়ি, মানুষ আর মানুষ। বাস থেকে নেমে অনেকেই হাঁটাহাঁটি করছে। অনেকক্ষণ পর দেখা গেল সামনের কিছু গাড়ি এগোচ্ছে। নিচের লোকগুলো পড়িমরি করে বাসে ওঠে। কিছুদূর এগিয়ে আবার থেমে থাকে বাস। কেউ কেউ গান ধরে, ‘গাড়ি চলে না, চলে না, চলে না রে…।’ ভোগান্তি সত্ত্বেও কারো কারো মনে ঈদের আনন্দ। স্বপ্না মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে মায়ের কোলে। বাসের লোকেরা কেউ বিরক্ত হয়, কেউ কেউ স্বপ্নার সঙ্গে কথা বলতে চায়। হঠাৎ করে ‘বাড়ি যাব বাড়ি যাব’ বলে ৩/৪ বছরের একটি বাচ্চা কেঁদে ওঠে। বাচ্চাটির মা চিপস কিনে দিয়ে কান্না থামাতে চেষ্টা করে। রাস্তার মধ্যে দুঃখ আর আনন্দের মিশ্র প্রতিক্রিয়া। লোকজন নানা গল্পে মেতে ওঠে। কেউ কেউ বলে, কবে যে এই পদ্মা সেতু চালু হবে, আমাদের দুঃখ ঘুচবে।
এভাবে মাওয়া ঘাটের কাছে যেতে দিনরাত পার হয়ে গেল। যখন ভোর হলো তখনো মাওয়া ঘাটের দূরত্ব ৫ কিলোমিটার। অনেকে প্রাকৃতিক কাজ করল মাঠে গিয়ে। কেউ কেউ আশপাশের বাড়িতে গেল। বিপদের সময় মানুষ মানুষকে সাহায্য করে। সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে রিবন রাশেদের। অগত্যা ওর বাবাকে ঈদের নামাজ স্থানীয় ঈদগাহে পড়তে হলো। অনেক লোকের সঙ্গে। রিবন নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি আর টুপি কিনেছিল। সেগুলো পরে দাদুর হাত ধরে ঈদের নামাজ পড়তে যাবে। কিন্তু তা আর হলো না। বরং ওকে থাকতে হলো মায়ের সঙ্গে বাসের মধ্যে। স্বপ্নার সে কি কান্না তখন।
একদিকে ঈদের নামাজ, একদিকে ফেরিঘাটের জ্যাম, একদিকে স্বপ্নার আকাশফাটানো কান্না। আবহাওয়া ভারি হয়ে উঠল। গনগনে রোদের মধ্যে থমথমে অবস্থা। রিবনের ভেতরেও কান্না ফুঁসে উঠছিল। নতুন ড্রেস পরতে পারল না, দাদুর হাত ধরে নামাজ পড়তে যেতে পারল না। তখন ওর মনে হচ্ছিল, এই সেতুটা এখনই কেন হলো না? সেই স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। তাই ওর মানে এত আনন্দ।
বন্ধু জুবেরীকে আবার জড়িয়ে ধরে রিবন। অনেকটা আপ্লুত হয়ে পড়েছে। তখন জুবেরী বলল, তুই তো স্বপ্ন পূরণ হয়েছে বলে আনন্দ করছিস। আমাদের কথা একবার ভেবে দেখ। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে আমাদেরকে কি কম ভোগান্তি সইতে হয়? ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় ফেরি পারের জন্য। দুটি ঘাটে জ্যাম লেগেই থাকে।
তা ঠিক। জুবেরীদের বাড়ি রাজবাড়ী। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ছাড়া ওদের শর্টকাট কোনো রাস্তা নেই। কিন্তু এই পথে বাড়ি যেতে আসতে কত যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তার ঠিক নেই।
একবার ৪ কিলোমিটারের জ্যামে পড়ল জুবেরীরা। খবর এলো, কোনো ফেরি চলছে না। পদ্মায় পানি কম। ড্রেজিং চলছে। তার মানে নাব্য সংকট। এই খবর শুনে অনেকে বাস থেকে নেমে হাঁটা শুরু করল। অগত্যা জুবেরীরাও হাঁটার জন্য তৈরি হলো। বড় আপু তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। সে চিৎকার করে বলে উঠল, ওহ নো-।
আম্মু বললেন, এখানে ইংলিশ মিডিয়াম চলবে না মা। চলো হাঁটি।
আম্মুর কথায় সবাই হেসে উঠল। আপু তার লম্বা হিল হাতে নিল। খালি পায়ে হাঁটা তার জন্য আরো কষ্টকর। কিন্তু উপায় নেই। একটা কুলিও পাওয়া গেল না। ঘাটে কুলি থাকলেও রাস্তায় পাওয়া সম্ভব নয়। বড় ব্যাগটা আব্বু কাঁধে নিলেন আর ব্রিফকেসটা হাতে নিলেন। ছোট ব্যাগটা আম্মু নিলেন। জুবেরীর কাঁধে ওর স্কুল ব্যাগ যেখানে নিজের কাপড়-চোপড়। আপু তার পার্টস ছাড়া কিছু নিতে অপারগ। এভাবে ৪ কিলোমিটার হাঁটা সহজ কথা নয়। আব্বু ও আম্মুর হাঁটার অভ্যাস আছে। তারা দ্রুত হাঁটলেও পেছনে পড়ে আপু। একবার দাঁড়াতে হয়, একবার বসতে হয়। এর মধ্যে শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। আপু বলল, ওহ্ নো- হোয়াট এ রেইন!
হাঁটতে অনেক কষ্ট হলেও আপুর কথায় মজা পেল সবাই। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছতে দীর্ঘ সময় লাগল। তখনো ফেরি চালু হয়নি। লঞ্চে উঠে দৌলতদিয়া ঘাটে নামল। ওখান থেকে লোকাল বাসে রাজবাড়ী যেতে হলো। সে কি কষ্ট বলে বোঝাবার নয়। আরেকবার সমস্যা হয়েছিল পদ্মায় পানি বৃদ্ধির কারণে। ঘাট মেরামত না হলে ফেরি চলবে না। সেদিনও কম দুর্ভোগ পোয়াতে হয়নি।
জুবেরীর কথা শুনে রিবনেরও কষ্ট হলো। বলল, ভাবিস না। একটা পদ্মা সেতু যখন সাকসেসফুলি কমপ্লিট হয়েছে তখন আরেকটি হবে।
রিবনের কথা সত্য। চাওয়ার যেমন শেষ নেই, পাওয়ারও শেষ নেই। স্বপ্নেরও কোনো শেষ হয় না। একটি অভাবনীয় স্বপ্ন পূরণ হলে মানুষ আরেকটি স্বপ্নের কথা ভাবতেই পারে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়