দেশে ২ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৮৪৬

আগের সংবাদ

ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে সেমিতে অস্ট্রেলিয়া

পরের সংবাদ

কেঁচো সারে ঝুঁকছেন বড়লেখার চাষিরা

প্রকাশিত: নভেম্বর ৬, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ৬, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

সালেহ এলাহী কুটি, মৌলভীবাজার থেকে : বড়লেখায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার। কম দাম, পরিবেশবান্ধব এই সার ব্যবহারে মৌলভীবাজারে অনেক কৃষক আগ্রহী হচ্ছেন। গবাদি পশুর গোবর, শাকসবজির উচ্ছিষ্ট ও কচুরিপানার মিশ্রণে প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদন করা হয় কেঁচো সার, যা ভার্মি কম্পোস্ট সার নামে অধিক পরিচিত। কৃষি উদ্যোক্তারা এই সার উৎপাদন করে নিজের জমিতে ব্যবহার করছেন। অতিরিক্ত সার বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবানও হচ্ছেন। এই সার ব্যবহারের নানা সুবিধার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।
মূলত রাসায়নিক সারের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে ভার্মি কম্পোস্ট সারের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকরা। ২০১৯ সালে উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করেন গাংকুল গ্রামের সালেহা বেগম। অল্প পরিশ্রমে বাড়িতে বসেই ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে লাভবান হয়েছেন। ফলে সার উৎপাদনে কৃষাণ-কৃষাণীরা আগ্রহী হয়ে উঠছেন। পুরো গ্রামে এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শুরু হয়েছে ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন।
এ ব্যাপারে সালেহা বেগম বলেন, বড়লেখা কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণসহ ৪টা রিং ও কেঁচো পেয়ে সার উৎপাদন শুরু করি। প্রথমে সার নিজের জমিতে ব্যবহার করি। অতিরিক্ত সার বিক্রি করে লাভবান হই। আমার দেখে এলাকায় অনেকের সার তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠে। তারা নিজ খরচে রিং কিনে। আমি তাদের কেঁচো দিয়ে সহায়তা করি। বর্তমানে গাংকুল গ্রামে ২০ জন কৃষাণ-কৃষাণী শতাধিক রিং দিয়ে কেঁচো সার উৎপাদন করছেন।
একই গ্রামের দিলারা বেগম বলেন, অল্প খরচে সালেহা বেগমের এই সার উৎপাদন দেখে আমার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তার কাছে শিখে সার তৈরি শুরু করি। নিজেদের জমিতে ব্যবহার করে অতিরিক্ত সার স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বছরে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। এই সার ব্যবহার করে উৎপাদন করছি কীটনাশকমুক্ত ফসল।
আসমা বেগম বলেন, আমরা এখন আর শাকসবজির উচ্ছিষ্ট ফেলে দেই না। একটা গর্তের মধ্যে রেখে দেই। সেখানে কচুরিপানা, কলাগাছ কেটে তার সঙ্গে গোবর মিশ্রণ করি। এগুলো পচার পর রিং তুলে কেঁচো ছেড়ে দেই। কেঁচো খাওয়া শুরু করলে সার তৈরি হয়।
লিজা আকতার বলেন, খুব কম খরচে এ সার উৎপাদন করা যায় এবং প্রতি কেজি কেঁচো সার ১৫ টাকা দরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। জেলা বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা করা যেত তা হলে তারা আরো লাভবান হতে পারতেন। এছাড়াও উৎপাদন করতে পারছি কীটনাশকমুক্ত সব ধবনের সবজি ও মৌসুমি ফল।
গাংকুল মহিলা সিআইজি সমবায় সমিতির সভাপতি মনোয়রা বেগম জানান, প্রথমে আমরা দুই তিনজন কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করি। কৃষি বিভাগ আমাদের কাজ দেখে গ্রামের ২০ জন মহিলা নিয়ে সিআইজি সমিতি করে দেয়। বর্তমানে এই সমিতির ২০ জন সদস্য। সবাই সার তৈরি করি। পরিবারের সহযোগিতা পর আমরা কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারি। আমাদের এই সঞ্চয়কৃত টাকা দক্ষিণভাগ পূবালী ব্যাংকে স্বাধীন বিমা করে রেখেছি। প্রতি বছর আমরা টাকা জমা দিয়ে যাচ্ছি। এখন প্রায় ২ লাখ টাকা সঞ্চয় আছে।
বাজারের ব্যবসায়ী কেঁচো সার ক্রয় ও বিক্রেতা সামাদ মিয়া বলেন, কেঁচো সার উৎপাদন করে নিজেদের জমিতে ব্যবহার করছেন আবার বিক্রিও করছেন। কম খরচে এ সার উৎপাদন করা যায় এবং প্রতি কেজি কেঁচো সার ১৫ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। রাসায়নিক সারের চেয়ে কেঁচো সারের চাহিদা বেশি।
এ ব্যাপারে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামীম মিয়া বলেন, মাটিকে সুস্থ ও উর্বরতা ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ফসল ভালো হয় বলে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনে কৃষাণ-কৃষাণীদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। পচনশীল দ্রব্য দিয়ে তৈরি ভার্মি সার ব্যবহারে জমির গুণগত মান ঠিক থাকে। ৫০ কেজি সার উৎপাদন করতে সময় লাগবে এক-দেড় মাস। ৫০ কেজি ভার্মি কম্পোস্ট সার ৩০ শতক জমিতে ব্যবহার করা যায়। ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরিতে তেমন খরচ না হওয়ায় কৃষাণ-কৃষাণীরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
এ ব্যাপারে বড়লেখা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ দেবল সরকার ভোরের কাগজকে জানান, উপজেলার সব ইউনিয়নের সবখানেই ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদনে কৃষাণ-কৃষাণীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে তারা নিজেরাই কেঁচো সার উৎপাদন করছেন। এতে বড়লেখা উপজেলায় বছরে প্রায় ৫০ টন ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, কম্পোস্ট সার ব্যবহারে উৎপাদন ও ফসলের গুণাগুণ বৃদ্ধি পায়। মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর ফলে কেঁচো সার ব্যবহারে সেচের পানি কম লাগে। ফসলে রোগ ও পোকা-মাকড়ের উপদ্রব কম হয়। জমিতে আগাছার প্রকোপ কম হয়। ফসলের বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা বাড়ে। অধিক কুশি, অধিক ছড়া ও দানা গঠন হয়। পরিবেশও দূষণমুক্ত থাকে। সব ধরনের ফসলেই ব্যবহার করা যায়। কৃষক সচেতনতার ফলে রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কমেছে বহুলাংশে।
কৃষক তথা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও মাটির উর্বরতার শক্তির সহায়ক বলে কীটনাশকমুক্ত ফসল উৎপাদনে ভূমিকা পালন করছে ভার্মি কম্পোস্ট এমনটাই মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়