‘বিচার বিভাগীয় সচিবালয়কে বিলুপ্ত করা বিচার বিভাগের ওপর চপেটাঘাত’
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৪:৩৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, বিগত সময়ে বিচার বিভাগীয় সচিবালয়কে বিলুপ্ত করার মাধ্যমে বিচার বিভাগের ওপর মূলত একটি চপেটাঘাত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয়ভাবে যে ট্রাস্ট ও কনফিডেন্স তৈরি হয়েছিল, তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। জনগণের আস্থার জায়গাটি ধ্বংস করা হয়েছে। একইসঙ্গে এই কাজের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের ভাষায়- ‘দিস ইজ আ ব্ল্যাক ডে ফর দ্য ইন্ডিপেনডেন্স অব জুডিশিয়ারি।’
বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুর পৌনে ২টায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শিশির মনির বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাকশাল ও সামরিক শাসনের কারণে আমাদের বিচার বিভাগ সেই স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। অবশেষে ১৯৯৯ সালে মাজদার হোসেন মামলার মাধ্যমে উচ্চ আদালত ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেন। সেই নির্দেশনার আলোকে ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ প্রথম ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে পৃথক করা হয়।
তিনি বলেন, একইসঙ্গে বিচারকদের নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন (বিজেএস) প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং তাদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে আমাদের দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগ রায় প্রদান করেন। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের সেই রায়ে বলা হয়, ৯০ দিনের মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর আলোকে ৩০ নভেম্বর ২০২৫ সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে এবং পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন মাননীয় প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের উদ্বোধন করা হয়। পরে ৭ এপ্রিল ২০২৬ হাইকোর্ট বিভাগের বিস্তারিত রায় প্রকাশিত হওয়ার পর ১০ এপ্রিল ২০২৬ সরকার সেই বিচার বিভাগীয় অধ্যাদেশ বাতিল ঘোষণা করে।
এডভোকেট শিশির মনির বলেন, সরকারের সেই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে আমরা ১৯ এপ্রিল আরেকটি রিট পিটিশন দায়ের করি। রিটটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় গত ৫ মে আমরা আদালত অবমাননার নোটিশ জারি করি। এরপর ১৯ মে বিচার বিভাগের সিনিয়র সচিবসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। অর্থাৎ বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে আবারও পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে- রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগই বিচারিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। বিচার বিভাগের দুটি অংশ রয়েছে- উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালত। উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিধান রয়েছে। আর নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ একসময় বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে হতো। পরে সেখান থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) নামে একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা চালু করা হয়। আপিল বিভাগের একজন বিচারকের নেতৃত্বে এ কাজটি করা হয়ে থাকে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটা স্বচ্ছভাবে মানা হয়। কিন্তু তাদের ছুটি, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার সবকিছু ছিল আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে। ফলশ্রুতিতে, আইন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বিচারকরা কোনো আদেশ দিলে তাদের বদলি করে দেওয়া হয়, পদোন্নতি দেওয়া হয় না কিংবা শৃঙ্খলাজনিত অভিযোগ আনা হয়।
এডভোকেট শিশির মনির আরও বলেন, এই সমস্যা সমাধানের জন্য এবারই প্রথম তাদের ছুটি, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার এই চারটি কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করার জন্য প্রধান বিচারপতির অধীনে একটি স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এখানে ১৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে নিয়োগও দেওয়া হয়েছিল।
শিশির মনির বলেন, আমাদের বিবেচনায় বিচার বিভাগ স্বাধীন হলে রায় যার পক্ষেই যাক না কেন তাতে কোনো আপত্তি নেই। সঠিক বিচারের মাধ্যমে আমাদের আসামি হিসেবে আদালতে দাঁড়াতে হলেও আপত্তি নেই। বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিলে সভ্য সমাজ গড়ে উঠতে পারে না।
তিনি বলেন, সরকার যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, যা সংবিধান ও আইনসম্মত নয়- বিচারকরা সেটি দেখবেন ও রায় দেবেন। আমি রায়ে অসন্তুষ্ট হলে আপিল করব। কিন্তু বিচারকদের বদলি করে দেব, তাদের পদোন্নতি দেব না, তাদের সুন্দরবন-বান্দরবান বদলি করে দেব - এটি স্বাধীন বিচার বিভাগের চরিত্র হতে পারে না।
এডভোকেট শিশির মনির বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সর্বদাই স্বাধীন বিচার বিভাগের পক্ষে। স্বাধীনভাবে বিচারকরা বিচারকার্য পরিচালনা করবেন- তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমরা মনে করি, বদলি, ছুটি, পদোন্নতি আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকা উচিত নয়, সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের কাছে থাকা উচিত। এটি লঙ্ঘন করা হলে অধস্তন আদালতের বিচারকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। রাতে কিংবা সন্ধ্যায় আদালত বসিয়ে যাকে ইচ্ছা তাকে সাজা দেওয়ার যদি অভিপ্রায় থাকে, তবেই আইন মন্ত্রণালয় এটি চাইবে। আর যদি এই অভিপ্রায় না থাকে- তাহলে সুপ্রিম কোর্ট বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ করবে। এখানে আইন মন্ত্রণালয় ও সরকারের কোনো ভূমিকা থাকার কথা নয়।
তিনি বলেন, আদালতে সরকারের বিরুদ্ধে আদেশ হলে সরকার আপিল করবে। বিচারককে বদলি করবে কেন? পদোন্নতি দেবে না কেন? পদোন্নতির সময় হলে তিনি পদোন্নতি পাবেন। তিনি অপরাধী না হলে, শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করলে তিনি আইন অনুযায়ী কাজ করবেন।
বিচারকদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, পছন্দসই রায় না হলে তাদের ওপর চড়াও হওয়ার জন্য একটি নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে রেখে দিচ্ছেন- এটির নাম হচ্ছে সচিবালয়। অর্থাৎ বদলি, পদোন্নতি, ছুটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সচিবালয় এবং শৃঙ্খলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে আইন মন্ত্রণালয়। এই আইন মন্ত্রণালয়ের করায়ত্ত থেকে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিশেষ কমিটির আলোকে এই বিধানটি করা হয়েছিল।
শিশির মনির বলেন, প্রধান বিচারপতিকে স্বাধীনভাবে ৫০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদনের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল সেই আইনটি তারা বাতিল করেছেন। এই ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অধস্তন দুই হাজার বিচারক তাদের কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। বাংলাদেশে প্রতি ৭৮ হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন বিচারক রয়েছে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সুপ্রিম কোর্ট এই ৭৮ হাজার মানুষের জন্য বিচারক বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়েছিলেন- এই ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় এখন ইচ্ছা করলে নিয়োগ দেবে বা সংখ্যা বাড়াবে বা কমাবে। প্রধান বিচারপতির আর কোনো এখতিয়ার নেই। আমরা মনে করি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় পুনর্বহাল করা অত্যন্ত জরুরি।
পরে সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির। এসময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মু. আতাউর রহমান সরকার।
